প্রকাশিত: ২৮ এপ্রিল, ২০২৪ ০৬:৫১
দেখার হাওর, জামখলার হাওর, নাগডরা হাওর, পাখিমারা হাওরসহ ৮ ইউনিয়নে ছোট বড় মোট ১৮টি হাওর রয়েছে শান্তিগঞ্জ উপজেলায়। এসব হাওরের ২২ হাজার ৬৫৪ হেক্টর বোরো জমিতে চাষ করা হয়েছে বিভিন্ন জাতের ধান। এসব ধানের ভালো ফলন হওয়ায় খুব খুশি হাওর এলাকার কৃষকরা। ছোট বা চিকন ধান এবং মোটা বা হাইব্রিড জাতের ধান চাষ করে এমন ফলন পেয়েছেন উপজেলার প্রায় ষাট হাজার কৃষক। তবে এবছর ছোট ধানের তুলনায় বড় ধান, মোটা ধান বা হাইব্রিড জাতের ধানের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন উপজেলার প্রায় সবকয়টি হাওরের কৃষক। হাইব্রিড জাতের ধান ঝলকরাজ, হিরা—১, হিরা—২ সহ ৮ প্রকারের ধানে বেশিরভাগ কৃষকের আগ্রহ ছিলো খুব বেশি। মোট কৃষকের প্রায় ৮৫ শতাংশই হাইব্রিড জাতের ধান রোপণ করেছিলেন। এখন ফলনও পাচ্ছেন খুব ভালো। এদিকে ধান পেকে যাওয়ার পরও শ্রমিক না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন কৃষকরা। শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটতে অনেকটা বিলম্ব হচ্ছে তাদের। এতে পাকা ধান ঝড়ে পড়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা। প্রয়োজনের তুলনায় কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন কম বলেও জানিয়েছের জামখলা ও রঘুনাথপুর হাওরের কৃষকরা।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওর, জামখলার হাওর, রঘুনাথপুরের সোনামতি হাওর, পশ্চিম বীরগাঁওয়ের ঠাকুরভোগের হাওর ও খাউয়াজুরির হাওরসহ বেশ কয়েকটি হাওরের সাধারণ কৃষকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২৮ ও ২৯ জাতের ধান এ বছর কম চাষ করেছেন কৃষকরা। সকলের আগ্রহ হাইব্রিড ধানের প্রতি। বিশেষ করে ঝলকরাজ, হিরা—১, হিরা—২, বঙ্গবন্ধু, বিআর ২৯, সুবর্ণা, লালতীর, নাফকো ১০৮, এসিআই ও ইস্পাহানী—৭ জাতের ধানের প্রতি আগ্রহ বেশি। এসব ধানের ফলনও ভালো হয়। প্রতি ধানের শীষও বেশ লম্বা হয়। কিয়ার প্রতি (১ কিয়ারে ৩০ শতক) প্রায় ২২ মণ ধান উৎপাদন হয়। এতে কৃষকরা বেশ লাভবান হচ্ছেন। এছাড়াও এসব ধান কিছুটা খরা সহিষ্ণুও বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। অন্যদিকে শান্তিগঞ্জ উপজেলার লাগুয়া ছেফটির হাওরেও হাইব্রিড জাতের ধান উৎপাদন হয়েছে বেশি।
পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের ঠাকুবভোগ সংলগ্ন মৌখলা হাওরের কৃষক মোস্তাক আহমদ বলেন, ৩৫ কিয়ার জমি চাষ করেছি। এর মধ্যে ২০ কিয়ারে ঝলকরাজ, বাকী চাষ করেছে হিরা—২ ও অন্যান্য। অনেক ভালো ফলন হয়েছে। আমাদের হাওরে কৃষকদের শতকরা ষাট শতাংশই ঝলকরাজ চাষ করেছেন। অন্যান্য সব মিলিয়ে চল্লিশ শতাংশ হবে। তবে ধানের দাম একটু কম। কিছুদিন আগেও নয়শ, সাড়ে নয়শ টাকা মন বিক্রি হয়েছে। গত শুক্রবার একজনকে ফোন করেছিলাম। তিনি বলেছেন সাড়ে ৮শ’ টাকা মণ কিনতে পারবেন। ধানের দাম এতো কম হলে তো আমাদের ভীষণ ক্ষতি হবে।
একই গ্রামের কৃষকের সন্তান, শিক্ষক জামিল আহমদ বলেন, নাকফো জাতের ধানের ভালো ফলন হয়েছে। আমরা নিজেরাও চাষ করেছি। হাইব্রিডের ফলন ভালো হওয়ায় মানুষ এখন হাইব্রিডের দিকেই ঝুঁকছে বেশি।
দরগাপাশা ইউনিয়নের জামখলা হাওরের কৃষক আবদুল গফফার ও মঞ্জুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, আমাদের হাওরের বেশির ভাগ কৃষকরাই হাইব্রিড ধানের প্রতি বেশি আগ্রহী। এসব ধানের ফলন ভালো। তাড়াতাড়ি পাকে। কাটা যায় সপ্তাহ দশদির আগে। তাছাড়া পানির পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও এ ধান বাড়ে। নষ্ট হয় কম। তবে আমরা এখন ধান কাটা নিয়ে বিপাকে আছি। হারভেস্টার মেশিন এবং শ্রমিক কোনোটাই পাচ্ছি না। তাদের কথার সাথে একমত পোষণ করেন শিমুলবাক ইউনিয়নের ঠাকুরভোগ গ্রামের সোনামতি হাওরের কৃষক জিয়া উদ্দিন।
তিনি বলেন, হাইব্রিড ধানে পরিচর্যা ভালো হলে কিয়ার প্রতি ২২ মণ ধান উৎপন্ন হয়। আমি ঝলকরাজ এবং নাফকো ১০৮ জাতের ধান বেশি চাষ করেছি। এক একরের চেয়ে কিছু কম জমি চাষ করেছি বাসমতী। নিজে খাওয়ার জন্য। তবে হাইব্রিড জাতের ধানকে ইঁদুরে বেশি কাটে বলে জানিয়েছেন একই হাওরের কৃষক মুহিবুর রহমান মানিক। তিনি বলেন, হাইব্রিড জাতের ধান ইঁদুরে কাটে। আমাদের হাওরে ধান কাটার মেশিন নেই। আপনাদের কারো কাছে মেশিন থাকলে দয়াকরে আমাদের এদিকে পাঠিয়ে দিন।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সোহায়েল আহমদ বলেন, কৃষকরা ধান চাষ করে লাভবান হচ্ছেন এটা একটা সুখবর। মোটা ধান বা চিকন ধান এটা কোনো বিষয় নয়। হাইব্রিড ধান পাকতে সময় কম লাগে। সাধারণ ধানের তুলনায় সপ্তাহ দশ দিন আগে কাটা যায়। এটি উচ্চ ফলনশীল। আমরা কৃষকদের লাভের কথা চিন্তা করে তাদেরকে উচ্চ ফলনশীল ধানের প্রতি আগ্রহ দেখাতে পরামর্শ দেই। যেকোনো হাইব্রিড নতুন জাতের ধান স¤প্রসারণে আমরা কৃষকদের উৎসাহিত করি। এবছর উৎপাদনে আমাদের লক্ষমাত্রা ছাড়িয়ে যাবো।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন