প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল, ২০২৪ ০৭:৩৬
শনির হাওর পাড়ের খলায় কাজ করছেন কয়েকজন নারী
হাওর ধান কাটতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক। বছরের এই সময়ে অবসর বা দম ফেলার ফুসরত নেই তাদের। ২ লক্ষাধিক পুরুষ শ্রমিক ও এক হাজার হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটলেও খলায় ধান শুকানোসহ গোলায় তোলার জন্য ধান প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করছেন নারীরাই বেশি। আর নারী পুরুষের শ্রমেই হাওরে এবার ৪ হাজার তিনশ কোটি টাকার ধান উৎপাদন হয়েছে।
জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৪০৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। যা গত বারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৬২ হেক্টর বেশি। এবার ১৩ লক্ষ ৭ হাজার ২০০ মে.টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ পর্যন্ত (শুক্রবার পর্যন্ত) পুরো জেলায় ৬৮ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। এবার ৯ লক্ষ ১৩ হাজার ৪০০ মে.টন চাল উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে। যার বাজার মূল্য ৪ হাজার একশ দশ কোটি টাকা।
জেলায় প্রায় চার লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে। এই পরিবারগুলো সরাসরি হাওরে ধান চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা জমিতে বীজ বপন, রোপন ও ধান কাটার কাজ করেন। অপরদিকে পরিবারের নারী সদস্যরা, গবাদিপশুর জন্য খড় শুকানো, খলায় ধান শুকানো, উড়ানোর (ছাটা হওয়া ধান আলাদাকরণ) কাজসহ গোলায় তোলার প্রক্রিয়াজাত করণের কাজ করেন। এভাবেই নারী পুরুষের সম্মিলিত শ্রমে মজবুত হচ্ছে হাওরের অর্থনীতি।
শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর, খরচার হাওর, ঝাউয়ার হাওর ও দেখার হাওরের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, হাওরে ধান কাটতে পুরুষ এবং মাঠে কাজ করছেন নারী। পুরুষরা ধান কাটলেও নারীরা মেশিনে মাড়াই, খড় নাড়াচাড়া, ধানখলা তৈরি, ধান শুকানোসহ নানা কাজ করছেন। তাদের সঙ্গ দিচ্ছে স্কুল—কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীরা। শুধু চাষী পরিবারের নারীরাই নন শ্রমজীবী নারীরাও কাজে নেমেছেন হাওরে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈশাখী মওসুমে ধান কাটার সময় হাওরের চাষী পরিবারের নারী পুরুষ সাধারণত বাড়িতে থাকেন না। পুরুষরা হাওরে ধান কাটার কাজ করেন। নারীরা সেই ধান মাড়াই, গবাদিপশুর জন্য খড় সংগ্রহ, ধান শুকানো, খলাঘর তৈরিসহ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেন। অনেক নারী পরিবারের পুরুষের সঙ্গে হাওরের কান্দায় সাময়িক তৈরি খলাঘরেও অবস্থান করেন। কৃষক পরিবারের পাশাপাশি দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারের নারীরাও শ্রমিক হিসেবে হাওরে নেমে কাজ করতে দেখা গেছে।
তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের বাসিন্দা আজমিলা বেগম। এই গ্রামের হারিছ আলীর সঙ্গে ৪৭ বছর আগে বিয়ে হয় তার। বিয়ের পর থেকেই বৈশাখ মাসে খলায় ধান শুকানো, উড়ানো খড় শুকানো ও ধান গোলায় তোলার প্রক্রিয়াজাতকরণের সকল কাজ করছেন তিনি।
তিনি বলেন, বৈশাখ মাসে কাজ বাড়ে। সকালে রান্না শেষ করে পরিবারের সবাইকে খাওয়াই। এরপর খলায় যাই। বাড়ির পুরুষেরা জমি থেকে খলায় ধান এনেই কাজ শেষ তাদের। পরে আমরা ধান শুকানো, উড়ানোর কাজ করে গোলায় তুলি। একেই সঙ্গে গরুর খড় শুকিয়ে বাড়িতে নেওয়ার কাজও আমরা নারীরাই করতে হয়।
একই গ্রামের বাসিন্দা মোছাম্মদ শাহেনারা বেগম বললেন, ‘প্রায় ২৫ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। ধান কাটা শুরু হবার প্রথম দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রতিদিনই খলায় আছি। বেপারি দিয়ে জমি থেকে ধান কেটে খলায় আনা হচ্ছে। পরে সেগুলো মাড়াই করে খলায় শুকাইছি। গরুর লাগি খড় শুকাইতাছি। ধান শুকাইয়া বাড়ীতে নেওয়াও আমাদের কাজ’।
উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের কলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা নাছিমা বেগম বলেন, ‘রোদের তেজ বেশি, তবুও মনে আনন্দ। কারণ এবার সোনার বৈশাখ হয়েছে। ধান শুকিয়ে, উড়িয়ে বাড়ি তুলছি। গরুর খড়ও শুকিয়ে বাড়িতে নিচ্ছি। কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।’
একই গ্রামের কৃষক মো. নাইম বললেন, বৈশাখ মাসে আমাদের মা—চাচিরা বেশি কাজ করেন। তাদের ঘর ও খলা সামলাতে হয়। আমরা ক্ষেত থেকে ধান কেটে খলায় আনি। এরপরের কাজ করেন নারীরাই।
ধুতমা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক তনু মিয়া বললেন, নারীরা বেশি কাজ করে। বাড়িতে রান্না—বান্না করা লাগে। খলায়ও গেরস্তি কাজ করা লাগে। আমরাতো আসরের আজান হলে বাড়ি চলে যাবো। তখন কোনো কাম নাই। আর নারীদের বাড়িত গিয়েও বিশ্রাম নাই।
সুনামগঞ্জ কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, ২ লাখ শ্রমিকের পাশাপাশি এবছর ১ হাজার ৫০টি হারভেস্টার মেশিনের মাধ্যমে ধান কাটা হচ্ছে। সত্তর ভাগেরও বেশি ধান কাটা শেষ হয়ে গেছে। ধান মাড়াইয়ের পর শুকানোর কাজে ৪ লাখ কৃষক পরিবারের নারী সদস্যরা কাজ করছেন। এবছর রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া থাকায় প্রত্যেকে খুশি মনে কাজ করছেন। আমরা আশা করছি বাম্পার ফলনে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ফলন পাবো।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন