বিপন্ন টাঙ্গুয়া 

প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট, ২০২৩ ০৭:৪২

ওয়াচ টাওয়ারে নৌকা বাঁধায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থাপনাটি

ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের কূল ঘেঁষে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের আঁধার টাঙ্গুয়ার হাওর। ১৯৯৯ সালে সরকার এই এলাকাকে ‘বিপন্ন প্রতিবেশ এলাকা’ ও ২০০০ সালে ইউনেস্কো রামসার এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। এই হাওর বিরল প্রজাতির মাছ ও অতিথি পাখির স্বগরার্জ্য হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীব্যাপী অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন ২৬ প্রজাতির প্রাণির আবাসস্থল এই হাওরে। তবে হাওরে কর্পোরেট বাণিজ্যিকীকরণ ভ্রমণের পরিকল্পনা প্রণয়ন হলেও তা বাস্তবায়নের অভাবে নষ্ট হচ্ছে টাঙ্গুয়ার জীববৈচিত্র্য।  
বেশ কয়েক বছর ধরে তাহিরপুরে টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটনের বিকাশ চোখে পড়ার মতো। প্রতিবছর বর্ষায় দেশ-বিদেশের হাজারও পর্যটক এই এলাকায় ঘুরতে আসেন। হাওরে ঘুরার সুযোগ- সুবিধাও বেড়েছে। স্থানীয় নৌকার সঙ্গে প্রায় দুইশ আধুনিক হাউসবোট যোগ হয়েছে হাওরে। এই পর্যটন বিকাশ ইতিবাচক হলেও সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন না হওয়ায় হাওরের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে।  
সরকার প্রতিবছর কৃষকদের ফসল রক্ষার জন্য হাওরে শতকোটি টাকার অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে। বর্ষায় এই বাঁধ কোথাও সামান্য পানির নিচে আবার কোথায় জেগে থাকে। স্থানীয় নৌকা ও হাউসবোট হাওরে প্রবেশ ও ঘুরার নির্দিষ্ট রোড ব্যবহার না করায় এসব বাঁধের ক্ষতি হচ্ছে। এতে সরকারের প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণের খরচ বাড়ছে।
এদিকে নিয়ন্ত্রিত পর্যটনকে আরও প্রসারিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকবাহী নৌযান, হাউসবোট ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রক্রিয়া বিঘিœত না করা, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া হাওরে প্রবেশ না করা, ট্যাকেরঘাট এলাকা ব্যতীত অন্য এলাকায় নৌকা, জলযানে রাত্রিযাপন করলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে অবহতি করা, জলযানে রান্নার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার বহন না করা, সংরক্ষিত এলাকায় বিভিন্ন প্রাণির অবাধ বিচরণ, স্বাভাবিক আচরণ, প্রজনন, বংশ বৃদ্ধি প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়া, আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো হাতিয়ার, ফাঁদ, বিষ, মাছ শিকারের সরঞ্জাম বহন না করা, নৌযান, হাউসবোটের বর্জ্য পরিবেশবান্ধব উপায়ে নির্দিষ্ট সেফটিক ট্যাংকে রাখা, স্বাভাবিক মাত্রার অধিক শব্দ সৃষ্টিকারী, কালো ধোঁয়া উদগীরণকারী বা ত্রুটিপূর্ণ কোন জলযান পর্যটক পরিবহনে ব্যবহার থেকে বিরত থাকা, নৌযানে সৌর শক্তি ব্যবহার, উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী জেনারেটর বহন থেকে বিরত থাকা, হাওরের নির্জনতা বজায় রাখতে কোনো মাইক, মাইক্রোফোন জাতীয় উচ্চ শব্দযন্ত্র বহণ না করা সহ আরও কিছু বিধি-নিষেধ দেয়া হয়েছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পর্যটকবাহী নৌকাগুলো বৌলাই নদী হয়ে মাটিয়ান হাওরের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করছে। পরে এই হাওরপাড় হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রবেশ করছে নৌকাগুলো। টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় গিয়ে নৌকাগুলো করচ গাছে বেঁধে রাখা হয়। ফলে এই এলাকায় থাকা শতাধিক হিজল করচ গাছের ডাল-পালাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ওয়াচ টাওয়ারে নৌকা বাঁধার ফলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই স্থাপনাটি। এছাড়াও পর্যটকেরা গোসল করেন এখানে। গাছে উঠে নিচে লাফিয়ে পড়া ও ডালপালাও ভাঙতে দেখা গেছে তাদের।
হাউসবোটে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন জাতীয় প্যাকেট ফেলার জন্য ঝুঁড়ি থাকলেও পানিতে প্লাস্টিকের থালা, পলেথিন ব্যাগ, ওয়ানটাইম গ্লাস ভেসে থাকা ও নৌকাতে উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
স্থানীয় দর্শণার্থী আবুল হাসনাত কাজল বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই টাঙ্গুয়ার হাওর। এটি ভ্রমণ পিপাসু মানুষের জন্য আকর্শনীয় স্থান। প্রতিবছর এখানে হাজারও পর্যটক আসেন। তবে তাদের নিয়ে তাহিরপুর থেকে যখন নৌকাগুলো আসে তখন নির্দিষ্ট কোনো রোড ধরে আসা হয় না। ফলে হাওরের জীববৈচিত্র্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি শতকোটি টাকার ফসল রক্ষা বাঁধের ক্ষতি হচ্ছে। নদী দিয়ে যদি হাওরে আসা হতো তাহলে এই ক্ষতি হতো না।
দর্শণার্থী লুৎফর রহমান বাবর বলেন, পর্যটকেরা ব্যবহারের পর বিভিন্ন বর্জ্য, প্লেট, প্লাস্টিক পানিতেই ফেলে দেন। ফলে হাওরের ক্ষতি হচ্ছে। নৌকাগুলো এসে হিজল করচ গাছে বাঁধার কারণে ভেঙে যাচ্ছে ডালপালা। সবকিছু মিলিয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ের জয়পুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, পর্যটকেরা এসে গাছে উঠার কারণে ডাল-পালা ভেঙে যাচ্ছে। গাছে বড় বড় নৌকা বাঁধার কারণেও ক্ষতি হচ্ছে গাছে।
স্থানীয় দর্শণার্থী দেলোয়ার হোসাইন বললেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো মানা হচ্ছে কি না তার তদারকি প্রয়োজন। তাহলে কিছুটা হলেও হাওরের জীববৈচিত্র রক্ষা পাবে।
এবিষয়ে জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর রামসার সাইট হিসেবে ঘোষিত এলাকা। এটি পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাও। এটিকে রক্ষার জন্য আমরা খুবই সচেতন। এজন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি নীতিমালা তৈরি করেছি। এটি বাস্তবায়িত হলে হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে পরিকল্পিত পর্যটন করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, নৌকাগুলো নির্দিষ্ট রোড মেনে চলতে একটি কমিটি করা হয়েছে। সেখানে জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার, বিআইডব্লিউটিএ, ট্যুর অপারেটর ও নৌযান মালিক সমিতির প্রতিনিধিরা রয়েছেন। সে কমিটি এই বিষয়গুলো দেখভাল করবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার