প্রকাশিত: ২৫ মে, ২০২৪ ০৭:০৬
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের কৃষক মো. বজলুল হক। সবাই তাকে আদর করে ডাকতেন বইজুল ভাই। বয়সে মধ্যবয়সী হলেও ছোট বড় সবাইকে নিয়ে ছিল চলাফেরা। তার চলনে-বলনে আপন করে নিয়েছিলেন দুই গ্রামের সবাইকে। আর্থিক সচ্ছলতা খুব একটা না থাকলেও ছিলেন পরোপকারী। গত রবিবার ভোরে নিজ বাড়ির কাছে সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পেছন থেকে একটি সিএনজি অটোরিকশা এসে ধাক্কা দেয় বজলুলকে। আহত অবস্থায় উদ্ধার করে তাকে প্রথমে সুনামগঞ্জ হাসপাতালে নিলে আশঙ্কাজনক হওয়ায় সিলেটে পাঠান কর্তব্যরত চিকিৎসক। চারদিন সিলেটের একটি হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিটে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বৃহস্পতিবার (২৩ মে) সকালে মারা যান বজলুল।
বজলুলের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে তার নিজ গ্রাম ও আশপাশের গ্রামে। বিকেলে জানাজার নামাজে উপস্থিত হন সহ¯্রাধিক গ্রামের মানুষ। শহর ও জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকেও শেষ দেখা দেখতে আসেন তার শুভাকাক্সিক্ষরা। জানাজার নামাজের সময় দেখা মিলে একটি অন্যরকম পরিবেশের। মুসলমান ধর্মের মানুষ যখন মৃতদেহ সামনে নিয়ে জানাজার নামাজ পড়ছিলেন তখন বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অঝোরে চোখের পানি ফেলছিলেন দুই গ্রামের অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ। জানাজার নামাজ শেষে মৃতদেহ নিয়ে কবরস্থান পর্যন্ত যেতে দেখা যায় অনেককে। এমন আবেগঘন পরিবেশ জানান দিচ্ছিল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা প্রিয় ছিলেন নিহত বজলুল।
জানাজার নামাজ চলাকালীন সময়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা সুবল দেবনাথের সঙ্গে। কান্না জড়িত তিনি বলেন, বজলুল ভাই মুসলিম হলেও আপন ভাইয়ের মতো চলাফেরা করেছেন আমাদের সাথে। হিন্দু-মুসলিম সবার সাথে ছিল তার ভালো সম্পর্ক। দুই তিন গ্রামের মধ্যে একজন সাব্যস্ত মানুষ ছিলেন তিনি। বয়স বেশী না হলে ছোট থেকে মুরব্বি সবাই তার কথা মানতো।
কাঞ্চন দাস বলেন, গ্রামের কয়েকজন ভালো মানুষের মধ্যে একজন ছিলেন বজলুল চাচা। এরকম মানুষের অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুতে আমাদের গ্রামে শোক নেমে এসেছে। বজলুল চাচার শূন্যস্থান অপূরণীয়।
শাহ আরিফ বলেন, বজলুল ভাই নারী পুরুষ সকলের প্রিয় মানুষ ছিলেন। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিকে হারিয়ে তার স্ত্রী সন্তানেরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। এমন মৃত্যু যেন আর কারো না হয় সেই ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবি জানাই।
বৃহস্পতিবার বিকেলে দাফন শেষে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালককে গ্রেফতার করে বিচারের দাবিতে দুর্ঘটনাস্থল সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন করেন হোসেনপুর ও মনমতেচরের বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী।
মানববন্ধনে বক্তারা জানান, একটি অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক বাচ্চা চালাচ্ছিল গাড়ি। ঘাতক চালকের ছিল না ড্রাইভিং লাইসেন্স। অপ্রাপ্তবয়স্ক লাইসেন্সবিহীন এই কিশোর চালকের হাতে যারা গাড়ি তুলে দিয়েছে তারাও অপরাধী। বজলুল নিহতের ঘটনায় কোন অপরাধী যেন পার না পায়। ঘাতক চালক সহ জড়িত সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন তারা। মানববন্ধন শেষে সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ (সাচনা) সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টি নেতা মো এরশাদ, মাও রফিকুল ইসলাম আলাল, জোনাব আলী, জেলা স্বেচ্ছাসেবক পার্টির যুগ্ম আহবায়ক আলী হোসেন, মো আব্দুল কাইয়ুম, স্বাস্থ্যকর্মী হূমায়ন ফারুক আলমগীর, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী দেবেন্দ্র দাস, শামীম আহমদ সহ হোসেনপুর ও মনমতেরচর গ্রামবাসী।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন