৯৮ বছর বয়সেও কাঁধে সংসারের বোঝা

প্রকাশিত: ১০ জুন, ২০২৪ ০০:০৮

মাটির কিছুটা উপরে বাঁশ—কাঠ দিয়ে তৈরি একটি মাচা। দূর থেকে মনে হবে হাঁস—মুরগির ঘর। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ৫ সদস্যের একটি হতদরিদ্র পরিবারের বসতঘর এটি। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, এমন মাচায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সোনাপুর গ্রামের ৯৮ বছর বয়সী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কন্টাই মিয়া ও তার পরিবার। যে বয়সে কন্টাই মিয়ার সেবা যত্নের জন্য মানুষ দরকার সে বয়সেও তাঁর কাঁধে সংসারের বোঝা। পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে থাকলেও ছেলেরা বিয়ে করে পরিবার নিয়ে আলাদা বসবাস করে। আর স্বামী পরিত্যক্ত দুই মেয়ে, এক নাতিন ও স্ত্রীকে নিয়ে এই মাচায় বসবাস করছেন কন্টাই মিয়া।
পাঁচ সদস্যের এই পরিবারের খোরাক জোগাতে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জের বাজার কিংবা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বিক্রি করেন মালা—খড়ি। বয়সের ভারে নেতিয়ে পড়া শরীর নিয়ে অচল মালা—খড়ি বিক্রি করে দিনে এক—দেড়শো টাকা আয় করতে পারলেও অর্ধেক টাকা চলে যায় আসা যাওয়ার নৌকা ও গাড়ি ভাড়ায়। বয়সের কারণে এখন হাঁটাচলায় সমস্যা হওয়ায় প্রত্যেকদিন বিক্রি করতে পারেন না মালা—খড়ি। অসুস্থতায় পার হয় দিন। তবুও আত্মসম্মানবোধের তাড়নায় ভিক্ষা না করে সৎপথে পরিশ্রম করেই উপার্জন করতে চান তিনি। শরীর নেতিয়ে গেলেও জীবনযুদ্ধে অভাব অনটন আর অসহায়ত্বের কাছে মাথা নত করেননি কন্টাই মিয়া। ভিক্ষাবৃত্তির পরিবর্তে সৎ ও হালাল পথে চলায় এলাকার মানুষের কাছেও নীতিবান মানুষ হিসেবেই পরিচিত কন্টাই মিয়া।
সোনাপুর গ্রামের খাদিজা বেগম বলেন, আমার দু:সম্পর্কে নানা হয় ইনি। উনার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। এই বয়সে গ্রামে গ্রামে হেঁটে মালাখড়ি বিক্রি করে। তবুও অসৎ কোন কাজ করে না। এই ছোট্ট ব্যবসা দিয়ে যা পায় তাই দিয়ে সংসার চলে।
মো. রবিউল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ বছর ধরে দেখতেছি উনি মালা—খড়ি বিক্রি করতেছে। এই বয়সে অভাব দেখা দিলে মানুষ ভিক্ষায় নেমে পড়ে। কিন্তু কন্টাই মিয়া ভিক্ষা করে না। কষ্ট হলেও নিজে উপার্জন করে সংসার চালায়।
প্রবীণ মুরব্বি মো আবু সৈয়দ বলেন, বয়সে আমার বড় হলেও শেষ বয়সে এসে কর্ম করে খাচ্ছে। আমি এখন ঠিক মতো দাঁড়াতে পারি না। তিনি এলাকার সবার কাছে আদর্শবান ব্যক্তি। খুবই ভালো মানুষ, কারও সাথে কোনোদিন মন কালাকালি হয়নি। এতো অভাব থাকলেও কোন আফসোস নেই তার জীবনে। তার একটা ঘর হলে শেষ দিনগুলোতে মাথার উপর আশ্রয় থাকতো।
বছরে দুইবার প্রতিবন্ধী ভাতা এবং সৎ ও হালালভাবে ছোট্ট এই ব্যবসা করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে স্ত্রী—মেয়েদের নিয়ে যেভাবেই জীবন চলুক আফসোস নেই কন্টাই মিয়ার। আফসোস শুধু একটা ঘরের, যা হয়তো কখনোই সামান্য এই রোজগার থেকে বাঁচিয়ে করতে পারবেন না তিনি।
কন্টাই মিয়া বলেন, যুবক থাকতে দু’পক্ষের মারামারি ফেরাতে গিয়ে চোখে আঘাত পেয়ে একটা চোখ নষ্ট হয়ে যায়। কে আঘাত দিয়েছে, সেটাও দেখিনি তাই কোন মামলা বা ক্ষতিপূরণও চাইনি। বয়স হয়ে গেছে শরীর চলে না। তবুও পেটের দায়ে চলতে হয়। মালা—খড়ি বিক্রি করে যা পাই অর্ধেক ভাড়াতেই চলে যায়। বাকি টাকা দিয়ে নুন পানি যা পাই খাই, তবুও ভিক্ষে করি না। ভিক্ষে করলে মানুষ খারাপ নজরে দেখে, কথা শোনায়। কেউ কেউ খারাপ আচরণও করে। আমার কোনো আফসোস নেই জীবন নিয়ে। শুধু মাথা গুজানোর একটা ঠাঁই পেয়ে গেলে মেয়ে আর নাতনিদের নিয়ে চলে যাবে জীবন। কিন্তু উপার্জনের টাকায় সংসারই চলে না, ঘর বানাবো কি দিয়ে। সরকারের কাছে টাকা পয়সা কিছু চাই না। শুনেছি মানুষরে ঘর দিচ্ছে আমাকে শুধু একটা ঘর দিক তাতেই আমি খুশী।
কন্টাই মিয়ার জীবন সংগ্রাম আর আদর্শের কথা শুনে নিজেও অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা বললেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী মান্নান। জানালেন কন্টাই মিয়ার জন্য সরকারের কাছে একটি ঘরের জন্য চিঠি লিখার কথা।
এমন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী। বললেন, এখন শুধু যাদের জমি নেই ঘর নেই তাদের ক শ্রেণীর মানুষকে ঘর দেয়া হচ্ছে। যখনি খ শ্রেণী অর্থাৎ যাদের জমি আছে ঘর নেই তাদের ঘরের বরাদ্দ আসবে, কন্টাই মিয়াও ঘর পাবেন।
জীবন যুদ্ধে সংগ্রামী এমন আদর্শবান মানুষের পাশে  প্রশাসনের পাশাপাশি চাইলে এগিয়ে আসতে পারেন বিত্তবানরাও। সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদের সহায়তায় একটা ঘর হবে বৃদ্ধ কন্টাই মিয়ার এমনটা প্রত্যাশা কন্টাই মিয়া ও তার প্রতিবেশীদের।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার