বিধ্বস্ত ঘরে অন্তঃসত্ত্বা লাভলীর বসবাস

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৪ ০৭:৩০

পানি কমলেও ঘরে ফেরাহবে না জালালের

ধীরে ধীরে হাওর থেকে নামছে বন্যার পানি। কিন্তু রেখে গেছে ভয়ংকর ক্ষতচিহ্ন। হাওরের উত্তাল ঢেউয়ে ল-ভ- হাওরপাড়ের বসতঘর। নিরুপায় হয়ে ভাঙা ঘরে মানবেতর জীবন পাড় করছেন বানভাসিরা। 
এই যেমন সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের লীলপুর লামাগাঁওয়ের লাভলী বেগম। নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা লাভলীর বাচ্চা পেটে আসার পরই ছেড়ে যায় স্বামী। লাভলীর মা ও ছোট ভাই মাটি শ্রমিকের কাজ করে চালায় সংসার। ঈদের দিন হঠাৎ বন্যার কবলে পড়ে কোলের ৩ সন্তানকে নিয়ে লাভলী ও তার পরিবার আশ্রয় নেয় সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে। গাড়ির নীচে চাপা পড়ার ভয়ে সড়কে দীর্ঘ ৭ দিন থাকার পর ফিরেছেন বাড়ি।


হাওরের আফালের তা-বে লাভলীর ঘরটি এখন লণ্ডভণ্ড হয়ে ধ্বংসস্তূপের মতো। হাওরের অংশের দুইদিকের টিনের বেড়ার টিন কাগজের মতো ছিঁড়ে উধাও হয়ে গেছে। ঘরের খাটের পায়ায় সাথে মিশে গেছে হাওরের বিশাল জলরাশি আর ভেতরে আছড়ে পড়ছে ঢেউ। ঘরের মেঝেতে কচুরিপানা বিছিয়ে কোনমতে টিকে থাকার সংগ্রাম তাদের।     
লাভলী বেগম বলেন, পানি আসার পরে সড়কে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছি। এখন ঘর থেকে পানি নেমে গেছে তাই বাড়ি ফিরে এসেছি। সড়কে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মরার চেয়ে এই ভাঙা ঘরে থাকা ভালো। আগের ঋণ এখনো শোধ হয়নি নতুন করে ঘর বানাবো কি করে। মেম্বার ছবি তুলে নিয়েছে যদি সরকার দেয় ঘর মেরামত করবো না হলে এই ভাঙা ঘরেই সন্তানদের নিয়ে থাকবো।

লাভলীর ভাই রানা বলে, কাজ কর্ম করে যা পাই তা দিয়ে বোন ভাগনি নিয়ে চলার চেষ্টা করি। ভাত খাওয়ার চিন্তায় দিন কাটাই ঘর বানাবো কি করে। 
এদিকে বুক ভরা মনোবল নিয়ে হাওর পাড়ের লাভলী বেগম বাড়ি ফিরলেও ফেরা হয়নি একই গ্রামের জেলে জালাল উদ্দিনের। ঢলের জলে ভেসে পরিবারসহ আশ্রয় নেন পাশের বাজারের দোকানের গোদাম ঘরে। এক সপ্তাহ পর দুই ছেলেকে সাথে নিয়ে এসে দেখেন ঘর থেকে সরে গেছে অন্তত ৩ ফুট মাটি। পিলারের উপর শূন্যে ঝুলে আছে বাঁশ ও বেড়া। নতুন করে ঘর মেরামতের সাধ্য নেই তার। অন্যের দোকানে আর বেশিদিন থাকতেও পারবেন না। পরের ঘর ছেড়ে কিভাবে নিজ ঘরে ফিরবেন সেই দুশ্চিন্তায় কাটছে দিন।
জালাল উদ্দিন বলেন, বাইশের বন্যার পর নতুন করে ঘরটি বানিয়েছি কিস্তি তুলে। কিস্তির টাকা এখনো শেষ হয়নি। আবার ঘর ভেঙে গেছে। আমার স্ত্রী- সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাবো জানি না। 
স্ত্রী দিলারা বেগম বলেন, কোনো কিছু নিয়ে বের হতে পারিনি। সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বন্যার পানি। এখন ঘরে যাবার মতো অবস্থাও নেই। সন্তানদের নিয়ে বড় দুশচিন্তায় আছি ।


সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় এই গ্রামের দু চারটি পাকা ঘর বাদে পুরো গ্রাম যেন এক যুদ্ধ বিধ্বস্ত উপত্যকা। কারও ঘরের বেড়া নেই, কারও ঘরের মাটি নেই। এভাবেই মাথার উপরের আশ্রয়টুকু হারিয়ে সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের হাজারো পরিবারের কেউ আছেন আশ্রয়কেন্দ্রে আর কেউ নিরুপায় হয়ে দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন এসব ভাঙা ঘরে। তাদের মুখে কেবল নতুন করে ঘর বানানোর দুশ্চিন্তার ছাপ। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে কাজ করছে প্রশাসন, ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করে সহায়তার আশ্বাস জেলা প্রশাসকের। 
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নিয়ে তালিকা তৈরির কাজ করছে উপজেলা প্রশাসন। তালিকা তৈরি শেষে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হবে। বরাদ্দ প্রাপ্তি সাপেক্ষে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
কবে আসবে বরাদ্দ কোথায় যাবে সেই বরাদ্দ। কিভাবে হবে হাজারো ক্ষতিগ্রস্ত বানভাসি পরিবারের পুনর্বাসন, সেই প্রশ্ন এখন সবার মনে। এই মুহূর্তে সরকারের সহযোগিতাই এখানকার মানুষের শেষ সম্বল।


 

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার