প্রকাশিত: ০৬ জুলাই, ২০২৪ ০০:৫০
ছবিটি শুক্রবার বিকালে মহাসিং নদীর পাড় থেকে তোলা। এই জায়গাতেই নির্মাণ হবে সেতু।
চীনের দুঃখ হোয়াংহো নদী। শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের আসামপুর, পশ্চিম পাগলার কাদিপুর ও শরীয়তপুর গ্রামের সবচেয়ে বড় দুঃখের নাম মহাসিং নদী। নদীটি শান্তিগঞ্জ উপজেলার ‘শস্য ভাণ্ডার’ খ্যাত দেখার হাওরের উথারিয়া নামক স্থান থেকে উৎপত্তি হয়ে সুরমা ও কামারখাল নদীতে গিয়ে মিশেছে। ৩৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও গড়ে ১১৬ মিটার স্থের এ নদীর উত্তর পাড়ে তিন গ্রামের আট থেকে দশ হাজার মানুষের বসবাস। অনাদিকাল ধরে এসব গ্রামের মানুষেরা নৌকায় করে পারাপার হচ্ছেন। একবিংশ শতাব্দীর অত্যাধুনিক যুগে এসেও তাদের প্রধান বাহন নৌকা। নৌকায় করে পাগলা বাজারে আসার পর দেখা মিলে গাড়ির। এমন পরিস্থিতিতে এলাকাবাসীর দাবি উঠে নদীর উপরে একটি সেতু নির্মাণের। নদীর এপাড়—ওপারের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও নির্বাচনী ইশতেহারের কারণে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ঘোষণা দেন এ সেতু দেখতে চান তিনিও। সাবেক মন্ত্রী মান্নানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গত বছরের নভেম্বর মাসে সেতু নির্মাণের জন্য ৫০ কোটি টাকার অনুমোদনও দেয় সরকার। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহুর্তে ১৪ নভেম্বর হাজার হাজার জনতার উপস্থিতিতে শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা বাজারের সেতুর পূর্ব পাড়ে এই সেতুর কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন সাবেক মন্ত্রী মান্নান।
বিশ্বস্ত একাধিক সূত্রে জানা যায়, সেতু নির্মাণের জন্য বর্তমানে ঢাকা এবং সুনামগঞ্জে চলছে কাগুজে কাজ (পেপার ওয়ার্ক)। বিশেষজ্ঞ দল প্রায় সময়ই সেতু নির্মাণের জায়গা পরিদর্শন করছেন। অস্থায়ীভাবে একজন প্রকল্প পরিচালকও (পিডি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বাজার দর বৃদ্ধি পাওয়া পণ্যের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ৫০ কোটি টাকায় সেতুর কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রকল্প ব্যয় রিভিশনে (ব্যয় বৃদ্ধি) পুনরায় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে আরও ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছেন, প্রকল্প ব্যয় আরও ৩০ কোটি টাকা বাড়ানো হতে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কাজ করছেন। সূত্র জানায়, পেপার ওয়ার্ক সব শেষ হলে আগামী শীতেই মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করবে সুনামগঞ্জ এলজিইডি। সে অনুপাতেই এগুচ্ছে কাজ।
সেতুর অবস্থান ও সম্ভাবনা
মহাসিং নদীর উপর নির্মিত হতে যাওয়া এ সেতু পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের রায়পুর এবং কাদিপুর গ্রামকে সংযুক্ত করবে। মহাসিং নদীর দক্ষিণে পাগলা বাজারের সেতুর পূর্বপাড় থেকে সরাসরি উত্তরের কাদিপুর পর্যন্ত যাবে নতুন সেতুটি। এতে সরাসরি উপকৃত হবে কাদিপুর, আসামপুর, শরীয়তপুর গ্রাম। যদি নদীর দক্ষিণ পাড়ের বেড়িবাঁধকে রাস্তায় রূপান্তর করে পূর্ব কাদিপুর থেকে পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের পঞ্চগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত সংযুক্ত করা যায় তাহলে চিকারকান্দি, খাড়ারাই, রনসী, খুদিরাই ও বাদুল্লাপুরসহ পঞ্চগ্রামের মানুষের সরাসরি সড়ক পথ হবে পাগলা বাজারের সাথে। এতে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে, বাঁচবে সময়। তৈরি হবে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা।
এলাকাবাসী জানান, সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এমপির দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিলো মহাসিং নদীর উপর সেতু নির্মাণ করবেন। তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান নূরুল হকও এই বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন। সব মিলিয়ে গত নভেম্বরে সেতুর অনুমোদন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়।
আসামপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহ আলম, প্রবাসী শহিব মিয়া ও কাদিপুর গ্রামের বাসিন্দা, ইউপি সদস্য আজাদুল হক আজাদ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, এম এ মান্নান মহোদয়ের প্রতি আমাদের আস্থা এবং বিশ্বাস আগেও ছিলো এখনো আছে। তিনি আমাদের স্বপ্নের সেতু নির্মাণে ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। আমরা তাঁর কাছে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চির কৃতজ্ঞ। কাগজের সকল কাজ এগিয়ে যাচ্ছে, আগামী শীতে সেতুর কাজ শুরু হবে এই ভেবেই ভালো লাগছে। আমরা সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়।
সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, মহাসিং নদীর উপর সেতু নির্মাণের পেপার ওয়ার্ক চলছে। ব্যয় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন পেলেই আমরা কাজ শুরু করবো। ইতোমধ্যে অস্থায়ীভাবে একজন পিডি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি বলেন, কিছু কিছু মানুষ এই সেতু নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। তারা চান না, মহাসিং নদীর উপর এ সেতু নির্মাণ হোক। কিন্তু সেতুটি তৈরি করতে আমি নিজেই চেষ্টা করে যাচ্ছি। এই সেতু অবশ্যই হবে, এ নিয়ে আমার মনে কোনো সংশয় নেই। অবশ্যই সেতু হবে। আমি যদি নাও থাকি, হয়তো কিছু সময় দেরি হতে পারে তবে সেতুটি হবে। ইতোমধ্যে ৫০ কোটি টাকা অনুমোদন হয়েছে। এ টাকাতে সেতুর কাজ শেষ হবে না। অর্থনৈতিক রিভিশন করা হয়েছে। আরও ৩০ কোটি টাকা বাড়াতে আবেদন করা হয়েছে। রিভিশন রিফিউজ হওয়ার নজির খুবই কম। আশা করছি অনুমোদন হয়ে যাবে। মোটামুটি ৮০ কোটি টাকা লাগতে পারে। আমি আশা করছি আগামী শীতে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয়ে যাবে। আর আগামী দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আমার ধারণা। তিনি বলেন, এ মাসে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর সাথে এই সেতু সম্পর্কে আমি কথা বলবো। সেতুটি নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী এবং আগ্রহী।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন