বর্ষার দূত কদম ফুল 

প্রকাশিত: ১৩ জুলাই, ২০২৪ ০৮:৪২

ঋতুচক্রের আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় এদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ। প্রকৃতি মা প্রত্যেক ঋতুতে তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ফুল উপহার দিয়ে থাকে। গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমে যখন মন প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠে, তখন প্রকৃতি কদম ফুল দিয়ে প্রশান্তির হাতছানি দেয়। কদম ফুলের সুঘ্রাণ  জানান দিয়ে যায় নবযৌবনা বর্ষার আগমনী বার্তা। বর্ষা মানেই গুচ্ছ গুচ্ছ কদম ফুলের সুবাস।
বাঙালি জীবনে ঋতুকেন্দ্রিক গান ফুল ফলে ভরা। কদম ফুল দেখলে মনে পড়ে যায় কবিগুরুর
‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল, করেছ দান’
কিংবা জাতীয় কবির লেখা,
‘দোলে শিহরে কদম, বিদরে কেয়া, নামিল দেয়া’
কদম গাছের আদি নিবাস বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও মালয়। কদম হলুদ, সোনালী বা লাল রঙের হয়। লাল কদম দুর্লভ। কদম বা কদম্ব বিভিন্ন নামে পরিচিত। নারীর সৌন্দর্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে একে ললনাপ্রিয় বলা হয়। এছারা বৃত্তপুষ্প, মেঘামপ্রিয়, কর্নপূর্বক, ভৃঙবল্লভ, মঞ্জুকেশীনী, পুল্কি, সুরভি, সিন্ধুপুষ্প নামে পরিচিত। এর ইংরেজি নাম Burflower tree, laran, kadam. এর বৈজ্ঞানিক নাম Newlamarckia cadamba l  কদম Rubiaceae পরিবারের Neolamarckia গনের বৃক্ষ যা নীপ নামেও পরিচিত। 
কদম গাছ বেশ উচু, কান্ড সোজা, শাখা-প্রশাখা ছড়ানো। শাখা-প্রশাখাগুলো মাটির সমান্তরালে বিন্যস্ত থাকে। নিবিড় পত্র বিন্যাসের জন্য কদম ছায়া ঘন। শীতে পাতা ঝড়ে যায় এবং বসন্তে নতুন পাতা গজায়। সাধারণত পরিণত পাতার চেয়ে কঁচি পাতা অনেকটা বড়। কঁচি পাতার রং হালকা সবুজ এবং পরিণত পাতা গাঢ় সবুজ। পাতা সরল, তেল চকচকে এবং বিন্যাস বিপ্রতীপ। বোটা খুবই ছোট। বাকল ধূসর থেকে প্রায় কালো এবং বহু ফাটলে রুক্ষ, কর্কশ।
কদমের এক পূর্ণ মঞ্জুরিকে সাধারণত একটি ফুল বলেই মনে করা হয়। কদম ফুল দেখতে বলের মতো গোল, মাংসল। পুষ্পাধারে অজ¯্র সরু ফুল থাকে। এধরনের পুষ্পমঞ্জরির নাম  হেড। প্রতিটি ফুল খুবই ছোট, বৃতি সাদা, দল হলুদ, পরাগ চক্র সাদা এবং বহির্মুখীন, গর্ভদন্ড দীর্ঘ। 
কদম ভেষজ গুণ সম্পন্ন উদ্ভিদ। প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে এর বিবিধ ব্যবহার রয়েছে। কদম গাছের ছাল জ্বরের ঔষধ   হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কদম পাতার রস ছোটদের কৃমিনাশক হিসেবে বেশ কাজ করে। পাতার রস দিয়ে কুলকুচি করলে মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে কদম ফুল তরকারি হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়। 
কদম গাছ খুব দ্রুত বর্ধনশীল। এর কাঠ নরম প্রকৃতির হওয়ায় জ্বালানি হিসেবে এর ব্যবহার খুব বেশি। এছাড়া কদম কাঠ দিয়ে দিয়াশলাই,  পেন্সিল তৈরি হয় । কাঠের বাক্স-পেটরা ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়। কদম কাঠ দিয়ে আসবাবপত্র তৈরি হয় না। 
রূপে গুণে অনন্য কদম প্রাচীন সাহিত্যে একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে আধিপত্য।  মধ্যযুগের বৈষ্ণব সাহিত্যেও কদম ফুলের সৌরভ মাখা রাধাকৃষ্ণের বিরহ গাঁথা রয়েছে। তাইতো শোনা যায় 
‘প্রাণ সখিরে ওই শোন কদম্ব তলে বংশী বাজায় কে’
জোতিষশাস্ত্রে কদম ফুলকে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ফুল হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কদম ফুল বাড়ির প্রবেশদ্বারে তোরণের আকারে লাগালে তা বাড়ির ইতিবাচক শক্তি বাড়ায় এবং রাহুর অশুভ প্রভাব কমায়।
প্রকৃতির অনিন্দ্য সুন্দর কদম  বর্তমানে হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে কদমের ছবি দেখিয়ে চেনাতে হবে, কারণ কদম প্রেমী মানুষেরা নির্বিচারে কদম ফুল ছিড়ে ফেলছে। বর্তমানে মানুষের বিভিন্ন চাহিদা মেটাতে কদম গাছ কেটে ফেলছে। গবেষকরা বলেছেন ভাদ্র মাসে যখন গাছে গাছে ফল থাকে না, তখন পাখি, কাঠবিড়ালির প্রধান খাদ্য এই কদম ফল। আর ওরাই কদমের বীজ ছড়ানোর বাহন।
কদম ছাড়া বর্ষা ভাবা যায় না। কদম ফুল ছাড়া বর্ষা যেন একেবারেই একা, নিঃসঙ্গ। আর তাই প্রকৃতির ঐতিহ্য রক্ষায় অন্যান্য গাছের পাশাপাশি কদম গাছও রোপণ করা অত্যন্ত জরুরি। যাতে নতুন প্রজন্ম বর্ষায় এক সুরে গাইতে পারে 
‘এসো নীপবন ছায়াবিথি তলে, এসো কর স্নান নব ধারা জলে....’
 লেখক : প্রভাষক (জীব বিজ্ঞান), শাল্লা সরকারি ডিগ্রি কলেজ।


 

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার