প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৪ ১০:১৩
নোয়াখালী-ভীমখালী সড়ক ভেঙে বেহাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ছবিটি নুরপুর গ্রামের সামনে থেকে তুলা ছবি।
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ এবং জামালগঞ্জ উপজেলার জনসাধারণের চলাচলের অন্যতম একটি সড়ক হচ্ছে নোয়াখালী-ভীমখালী সড়ক। সড়কটি ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লোকজন সহজেই শান্তিগঞ্জ এবং জামালগঞ্জ উপজেলায় পৌঁছাতে পারেন। কিন্তু ২০২২ সালে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার পর থেকে এই সড়কে যান চলাচল অনেকটাই কমে গেছে। বন্যার পানির ¯্রােতে প্রায় সাড়ে ৯ কি.মি. সড়কের ২৩ জায়গায় ভাঙন ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকাবাসী। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে সিএনজি, অটোরিক্সা, লেগুনা সহ বিভিন্ন যানবাহন। সড়কটি সংস্কার না করায় দিনদিন যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে এবং জনসাধারণের ভোগান্তি বাড়ছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, শান্তিগঞ্জ উপজেলার নোয়াখালী-ভীমখালী বাজার জিসি ভায়া জীবদ্বারা-মুক্তাখাই (চেইনিজ ০০.৯৭৫০ মিটার) সড়কের উন্নয়ন কাজে ৩১ কোটি ১৪ লক্ষ ১৮ হাজার ৭০৭ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নোয়াখালী বাজার পয়েন্ট থেকে সিএনজি স্টেশনে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। এরপর তেরহাল গ্রামের শুরুতেই সড়কের অনেক জায়গা বন্যার পানিতে একেবারেই ভেঙে গেছে। এখানে ৩টি ভাঙায় প্রায় ১০০ মিটার জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেরহাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আগে আরও দুইটি স্থানে সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে। তেরহাল-নুরপুর ব্রিজের দুই পাড়ে অ্যাপ্রোচ সড়কের প্রায় ১৫০ মিটার অংশে কার্পেটিং একেবারেই উঠে গেছে এবং বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। নুরপুর নয়াহাটির মসজিদের আগে ও মসজিদের সামনে দুইটি স্থানে সড়কের সিংহভাগ ভেঙে গেছে। একই সাথে জীবদ্বারা বাজার পর্যন্ত কয়েকটি জায়গার কার্পেটিং উঠে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। শিমুলবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের সামনে থেকে উকারগাঁও গ্রামের সামনের ব্রিজের দুই পাশে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। শিমুলবাঁক ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনের সামনে থেকে মুক্তাখাই আলফাত উদ্দিন ব্রিজের পূর্ব পর্যন্ত ছয়টি অংশে সড়কের কার্পেটিং উঠে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এভাবে সড়কের প্রায় ২৩ জায়গায় ছোট-বড় ভাঙা ও খানাখন্দ রয়েছে।
গত ১৭ জুন ঈদুল আজহার দিন থেকে টানা চারদিনের ভারি বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের ১২ টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয় এবং সড়কপথে পানি উঠে। নোয়াখালী-ভীমখালী সড়কেও অনেক স্থানে পানি উঠে এবং পানির ¯্রােতে আবারও ভাঙন দেখা দেয়। যত দিন যাচ্ছে সড়কটি একেবারেই চলাচল অনুপযোগী হয়ে উঠছে। ইজিবাইক, লেগুলা, সিএনজি চালিত অটোরিক্সা মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে সড়কে। প্রায় সময়ই এজন্য দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানান স্থানীয়রা।
সড়কপথে হাঁটতে হাঁটতে কিছু দূর এগুতেই অটোরিকশা চালক জামাল মিয়ার সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, আমরা এই সড়কে গাড়ি চালাই। ২০২২ সালের বন্যায় নোয়াখালী-ভীমখালী সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙন সৃষ্টি হয়। মুক্তাখাই সেতুর পাশে ৪/৫ টি ভাঙা আছে। নুরপুরের কাছে সড়কে ভাঙা, উকারগাঁও গ্রামের পাশের সড়কে অরেকটি গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। খুব খারাপ অবস্থা সড়কের। উকারগাঁওয়ে গত সপ্তাহে গাড়ি উল্টে গিয়ে গাড়িটি পানিতে পড়ে যায়। অল্পের জন্য যাত্রী এবং গাড়িচালক প্রাণে রক্ষা পান। এছাড়াও নুরপুরের চামার বাড়ির পাশের সড়কে গত কয়দিন আগে গাড়ি উল্টে গিয়ে একটি ঘরের সাথে ধাক্কা লাগে। যাত্রীরা হাতে, পায়ে, শরীরে আঘাত পায়।
তিনি আরও বলেন, আমরা গরীব মানুষ, গাড়ি চালাইয়া আয়-রুজি করে সংসার চালাই। আমি কিস্তিতে গাড়িটি লইছি। সড়কে গাড়ি চালাইতে গিয়ে কয়েকদিন পরপর গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়, ভেঙে যায়। এরমধ্যে কিস্তির টাকা দেওয়া লাগে, সংসারের খরচ আছে, নষ্ট অইলে গাড়ি ঠিক করা লাগে। গাড়ির যন্ত্রপাতি নষ্ট অইলে তো আয় রুজি করা যায় না। কবে এই সড়ক মেরামত করব আল্লাহ জানেন।
সিএনজি চালক সাইদুল ইসলাম সুনামগঞ্জ জেলা থেকে রিজার্ভ যাত্রী নিয়ে এসেছেন ভীমখালী বাজার। ফেরার পথে তার সাথে দেখা হলে তিনি বলেন, রাস্তাটির অনেক স্থানে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। গাড়ি নিয়ে চলা কঠিন। গাড়ি চালাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বেশি। আমি আজকেই প্রথম এসেছি।
আমি এই সড়ক দিয়ে গাড়ি নিয়ে আর আসব না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্যায় জেলার অন্যান্য সড়কপথে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে, মেরামত করা হয়েছে। অথচ এই সড়কটি এখনও ঠিক করা হয়নি, এটা দুঃখজনক।
নুরপুর গ্রামের বাসিন্দা হিফজুল ইসলাম বলেন, নোয়াখালী বাজার থেকে ভীমখালী বাজার পর্যন্ত সড়কের জীবদ্বারা, মুক্তাখাই গ্রামের পাশে অনেক ভাঙা আছে। ২০২২ সালে বন্যায় এই সড়কটিতে ভাঙন সৃষ্টি হয়। আমাদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। এলাকার শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে স্কুল-কলেজে যেতে হয়। এলাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করে থাকেন। প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। রাস্তাটি দ্রুত মেরামত করা দরকার।
মুক্তাখাই গ্রামের আকলুছ মিয়া বলেন, নোয়াখালী-ভীমখালী সড়কে কমপক্ষে ২০-২৫টি ভাঙা আছে। গত সপ্তাহের বন্যায়ও কিছু কিছু স্থানে নতুন করে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। এতে জনসাধারণের যাতায়াতে ভোগান্তি আরও বেড়েছে। গাড়ি চালকদের ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। দুর্ঘটনা ঘটছে। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে যাওয়া আসা করছে। সড়কটি দ্রুত মেরামত করে আমাদের জনসাধারণের যাতায়াতে ভোগান্তি দূর করে দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
সুনামগঞ্জ এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, নোয়াখালী-ভীমখালী সড়ক ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেজন্য চলাচলে যানবাহনের চালক ও জনসাধারণকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দেড় মাস আগে সেই সড়কটির টেন্ডার অনুমোদন হয়েছে। এই সিজনে বন্যা এবং অতিবৃষ্টি হয়- যে কারণে কাজ শুরু করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, শান্তিগঞ্জ উপজেলার নোয়াখালী-ভীমখালী বাজার জিসি ভায়া জীবদ্বারা- মুক্তাখা (চেইনিজ ০০.৯৭৫০ মিটার) সড়কের উন্নয়ন কাজে ৩১ কোটি ১৪ লক্ষ ১৮ হাজার ৭০৭ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে আসার পরপরই কাজ শুরু করা হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন