ভরাট, দখলে মৃত খাল

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৪ ০১:৩৭

বন্যায় দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে

বর্ষা মৌসুমে তিনবার বন্যার সম্মুখিন হতে হয়েছে সুনামগঞ্জবাসিকে। এতে মানুষের ঘরবাড়িসহ অনেক গ্রামীণ সড়কের ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, নদী থেকে হাওরে পানি নিষ্কাশনের খাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বছর বছর ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া খাল উদ্ধারে কাজ করছেন তারা।


এবার বর্ষা মৌসুমের পানি হাওরে বিলম্বে প্রবেশ করেছে। অনেক গ্রামীণ সড়ক ভেঙে পানি প্রবেশ করতে দেখা গেছে।  গেল দেড় মাসের মধ্যে তিন দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সুনামগঞ্জবাসি। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে দ্রুত সুরমা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার উপরে প্রবাহিত হয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। আবার সুরমা নদীর পানি কমে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও ঝাওয়া ও দেখার হাওরের তীরবর্তী এলাকায় জলাবদ্ধতা শিকার হয়েছেন বাসিন্দারা। 


নদী থেকে হাওরে পানি নিষ্কাশনের খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। কয়েক বছর আগেও নদীতে পানি এলে যে খালগুলো দিয়ে হাওরে পানি প্রবেশ করেছে, সেগুলো দখল হয়ে ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও সংকোচিত হয়েছে। একারণে এবছর বর্ষার শুরুতে নদীতে পানি বিপৎসীমার উপরে বইলেও হাওরে পরিপূর্ণ পানি দেখা যায় নি। এতে নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো প্রথম প্লাবিত হয়েছে। পরে অনেক গ্রামীণ সড়ক ভেঙে হাওরে পানি প্রবেশ করতে দেখা গেছে।  


জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইিডি) তথ্যমতে, গ্রামীণ সড়কের ৫৯৪ কিলোমিটার তিন দফায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সড়কগুলোর কোথাও ওয়াশআউট হয়েছে। এছাড়াও ৮৮৬ মিটার ব্রিজের ক্ষতি হয়েছে।  যা টাকার অংকে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই ক্ষয়ক্ষতির তালিকা আজ (মঙ্গলবার) উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবেন বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ এলজিইিডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন।


এদিকে তিন দফা বন্যায় ঝাওয়ার হাওর তীরবর্তী গ্রামগুলোর মানুষ দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছেন। নদীর পানি কমে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও ঝাওয়ার হাওর থেকে পানি নেমেছে ধীরগতিতে। হাওর থেকে নদীতে পানি নিষ্কাশনের খাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে দুর্ভোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে তাদের।


ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- জুগিরগাঁও খাল, ধনপুর খাল, হাজারিগাঁও খাল, গড়ারগাঁও খাল, নোয়াগাঁও খাল, আমবাড়ী এলাকায় আমআমি খাল, ব্রাহ্মণগাঁও বড়খাল, ছারাখালি খাল, গোদারগাঁও খাল, খাইমতর খাল। খালের কোনো কোনো অংশে সরু হয়েছে।


ঝাওয়ার হাওরপাড়ের মোল্লাপাড়া ও কুরবাননগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. নুরুল হক এবং বরকত আলী জানিয়েছেন, খালগুলো ভরাট হয়ে ঘরবাড়ি হয়েছে। অনেক জায়গায় খালের অস্থিত্বই নেই। যে কারণে সুরমা নদীর পানি হাওরে প্রবেশ করতে পারে না। হাওরের পানি সময়মতো নদীতে প্রবেশ করতে পারে না। এতে সড়ক  ও মানুষের ঘরবাড়ি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।


সোমবার দুপুরে কুরবাননগর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের বড়খাল সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খালের সুরমা নদীর উৎসমুখে বাঁধ দিয়ে আরসিসি ঢালাই সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। উৎসমুখ বন্ধ হওয়ায় পানি প্রবাহ একদম বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়াও পুরো খালের মধ্যে কোথাও বাঁধ, কোথাও দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এই খাল দিয়ে একসময় বড় বড় নৌকা চলাচল করেছে। সুরমা নদীর পানি ঝাওয়ার হাওরে চলাচল করেছে খাল দিয়ে। তবে পানির ¯্রােতে খালের দু’পাশের ঘরবাড়ির ক্ষতি হওয়ায় একসময় বন্ধ করে দেন খালটি। এখন বর্ষায় খালের উৎসমূখ ভরাট অংশে পানির চাপ বেশি পড়ে। আশেপাশের নদী তীরবর্তী মানুষের ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মজম্মিল মিয়া বললেন, এই খাল দিয়ে সুরমা নদীর পানি পশ্চিমে মাইজবাড়ি’র দিকে প্রবাহিত হয়ে দেখার হাওরে যেতো। নদীতে পানি এলে খালে সাঁ সাঁ করতো ¯্রােতে। নদী থেকে এই খাল দিয়ে গাছ ভাসিয়ে নিয়ে মাইজবাড়ি নৌকা বানাতে গেছি। এখন খালের মুখ ভরাট করা হয়েছে। 


কুরবাননগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মো. খলিলুর রহমান বলেন, খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতাম। পরে একসময় খালটি বন্ধ করা হয়। এখন খালের মুখের উপর দিয়ে পাকা রাস্তা গেছে। বর্ষায় পানির ধাক্কা প্রথম এই সড়কে দেয়। এজন্য সড়ক ও গ্রাম রক্ষায় নদী তীরে গ্রাম প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের দাবি করেন তিনি।


গোদারগাও গ্রামের আশরাফ আলী বলেন, খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। মৃত খালের উপর অনেক ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এই খাল দিয়ে পানি ঢুকতে পারে না হাওরে। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি খাল দিয়ে পানি হাওরে ঢুকতো, হাওরের পানি নদীতে চলাচল করে ভারসাম্য বজায় থাকতো। এখন এগুলো বন্ধ থাকায় নদীর পানি চলাচল সড়কের উপর দিয়ে যায়। অনেক সড়ক ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এতে করে আমাদের চলাচলে খুবই অসুবিধা হয়। খালগুলো চিহ্নিত করে উদ্ধার ও দ্রুত খনন করা দরকার। 


একই গ্রামের বাসিন্দা মোসাদ্দর আলী বলেন, সব খাল ভরাট হয়ে গেছে। খালের উপর বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। খালের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। এইজন্য বর্ষাকালে মেঘ- বৃষ্টি হলে নদীর পানি বেড়ে এই পানি আশপাশের সড়ক ভাঙে। বাড়ি- ঘর ভেঙে হাওরে পানি যায়। এতে প্রতি বছরেই আমাদের ক্ষয়ক্ষতি হয়।


এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বললেন, খাল ও জলাশয় প্রকল্পের আওতায় জেলার প্রত্যেক উপজেলায় একটি করে খাল খনন করা হয়েছে। সামনে প্রতিটি উপজেলায় ৫ টি করে খাল খনন করার জন্য আমরা কর্তৃপক্ষের নিকট তালিকা পাঠিয়েছি। অনুমোদন পেলে পর্যায়ক্রমে খালগুলো খনন করার কার্যক্রম শুরু করা হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার