শুল্কস্টেশনের দাবি দুই যুগেও আলোর মুখ দেখছে না

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই, ২০২৪ ০৭:১৩

শুল্কস্টেশনের দাবি দুই যুগেও আলোর মুখ দেখছে না

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডলুরা শুল্ক স্টেশনের সম্ভবতা যাচাই করতে সরজমিনে পরিদর্শন করেছেন কাস্টমস ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি দল। মঙ্গলবার দুপুরে ডলুরা সীমান্তের প্রস্তাবিত জায়গা পরিদর্শন করেন তারা। গেল ২ যুগ ধরে কয়েকবার সম্ভাবতা যাচাই করলেও কেনো চালু হচ্ছে না স্টেশনটি এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান কাস্টমস বিভাগের সহকারী কমিশনার মো. ফিরুজ হোসেন বিশ্বাস। তবে জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি দ্রুত শুল্ক স্টেশন চালুর পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দিলেন ।


সুনামগঞ্জবাসির বহুল প্রস্তাবিত ডলুরা শুল্ক স্টেশন করার দাবি অনেক দিনের। প্রায় ২ যুগ ধরে দাবির প্রেক্ষিতে অনেক বার কাস্টমস বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন প্রস্তাবিত শুল্কবন্দর এলাকা। তবে স্টেশনটি চালুর ব্যাপারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নি। মঙ্গলবার কাস্টমস বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সম্ভবতা যাচাইয়ের জন্য পরিদর্শনে যান। এসময় বারবার সরজমিনে পরির্দশনে গেলেও কোন জটিলতার কারণে শুল্কস্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না গণমাধ্যমকর্মীদের এমন প্রশ্নের জবাবে কাস্টমস বিভাগের সহকারী কমিশনার মো. ফিরুজ হোসেন বিশ্বাস বলেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। মিডিয়া কভার করা উপর থেকে নিষেধ রয়েছে। আপনি আমার কমিশনার স্যারের কাছে এ বিষয়ে জানতে পারেন।’


তিনি আরও বলেন, এখানে শুল্ক স্টেশন করতে গেলে আমাদের ও ইন্ডিয়ান কাস্টমসের অবকাঠামো করতে হবে। এ বিষয়ে এখানে কোনো সমস্যা পাচ্ছি না। পরে ইন্ডিয়ান কাস্টমসের সঙ্গে আলাপ করে বিস্তারিত জানাতে পারবো। 


এসময় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দেশের ও ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিলেন। তাদের দাবি এটি চালু হলে দু’দেশের ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। পাথরের মূল্য ফুট প্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা কমে পাবেন সুনামগঞ্জবাসী। কয়লার দামও কম হবে। এছাড়াও নদী পথে যোগাযোগের সহজ লভ্যতার কারণে দ্রুত পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হবে। এই শুল্ক স্টেশনটি চালুর ব্যাপারে ভারতীয় কাস্টমসের কার্যক্রম এগিয়ে আছে বলে জানালেন আব্দুস সুলতান নামে ভারতীয় এক ব্যবসায়ী।


তিনি বলেন, ভারতীয় কাস্টমসের শুল্কস্টেশন করার ব্যপারে কাগজপত্র রেডি রয়েছে। বাংলাদেশের প্রশাসনের কার্যক্রম সম্পর্কে জানি না। আজকে সবাই সরজমিনে জায়গাটি পরিদর্শন করেছেন। মনে হচ্ছে তারাও এটি করার ব্যাপারে চেষ্টা করছেন।


বালু-পাথরের ব্যবসায়ী মো. ফয়েজ উল্লাহ বললেন, এদিকে শুল্ক স্টেশন চালু হলে পাথর সহজে নদী পথে সারাদেশে অল্প খরচে পরিবহন করা যাবে। ভারতের কয়লা ও পাথর ডলুরার কাছাকাছি। এদিক থেকে পাথর নিয়ে অন্য শুল্ক স্টেশন দিয়ে দেশে প্রবেশ করালে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দাম বেড়ে যায়। অন্যান্য শুল্ক স্টেশন দিয়ে পণ্য নামাতে অনেক খরচ হয়। তাই এদিকে শুল্ক স্টেশন চালু হলে সবাই উপকৃত হবেন। 


আরেক ব্যবসায়ী মো. স্বপন মিয়া বললেন, ২ যুগ ধরে চালু হবে শুনে আসছি। প্রকৃতপক্ষে চালু করার ব্যাপারে অগ্রগতি আমরা দেখছি না। ডলুরা শুল্ক স্টেশন হলে এই এলাকার মানুষ উপকৃত হবেন। চোরাচালানের সঙ্গে যারা জড়িত, তারাও হয়তো বৈধ পথে শুল্ক স্টেশন দিয়ে পণ্য নামাবেন। অন্য স্টেশন দিয়ে পাথর নামালে প্রতি ফুটে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পরিবহনে খরচ হয়। এদিকে চালু হলে ৫ টাকাও খরচ হবে না।


এসময় উপস্থিত অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ছাব্বির আহমেদ আকুঞ্জি বলেন, ডলুরা শুল্ক স্টেশন স্থাপনের জন্য জায়গাটি পরিদর্শন করলাম। শুল্ক স্টেশন স্থাপনের জন্য জায়গাটি দেখে মনে হয়েছে এটি একটি সম্ভবনাময় জায়গা। এখানে ইমিগ্রেসনসহ শুল্কস্টেশন এই জেলায় অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়বে। নৌপথ ও সড়কপথের কারণে শুল্কস্টেশন স্থাপনের উপযোগী জায়গা এটি। কাস্টমসের প্রতিনিধিরা আজকে জায়গাটি পরিদর্শন করে গেলেন। আশাকরি তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে খুব দ্রুত এখানে শুল্ক স্টেশন চালু হবে। 


পরিদর্শন দলের সঙ্গে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌসুমী মান্নানসহ কাস্টমস বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। পরে তারা ডলুরা বর্ডার হাট পরিদর্শন করেন।


এর আগে ১৯৯৯ সালে একবার পরীক্ষামূলকভাবে এক বছরের জন্য শুল্কবন্দর চালু করতে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হলেও সীমান্তের ওপারের আড়াই কিলোমিটার সড়ক নির্মিত না হওয়ায় আমদানী রপ্তানী হয় নি। ২০০৮ সালের পর সীমান্তের ওপারের সড়ক নির্মাণ এবং এপারে নৌ ও সড়ক পথের সুবিধা হয়েছে। 


২০১৫ সালের ২৯ নভেম্বর ভারতের মেঘালয়ের একটি শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের নেতৃবৃন্দের সাথে যৌথভাবে ডলুরা শুল্ক স্টেশন পরিদর্শন করেন। 
একই বছরের ১২ ডিসেম্বর কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন পয়েন্ট স্থাপনের সম্ভাব্যতা উল্লেখ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, পররাষ্ট্র সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আধাসরকারিপত্র দেন বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান সুনামগঞ্জ-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ড. মোহাম্মদ সাদিক। সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ও এই বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি ও সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেন ।  


শেষে ২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান সরেজমিনে ডলুরায় এসে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। 
এনবিআরের তৎকালীন চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান ওইদিন বলেছিলেন, ডলুরার সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের যোগাযোগের ক্ষেত্রসহ সবকিছু মিলিয়ে দেখা গেছে এর অবস্থান খুবই ইতিবাচক। এই এলাকায় উপযুক্ত অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলে এবং দুই দেশের মধ্যে যদি ঐক্যমত হয় শুল্কবন্দরকে সক্রিয় করার, তাহলে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করবে। চলতি নদীতে ড্রেজিং করে সারা বছর নাব্য রাখা গেলে কম খরচে পণ্য সরবরাহ করা যাবে। আমরা ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে ফিরে যাব। যত তাড়াতাড়ি এটি সক্রিয় করা যায়, সেই বিষয়ে আমরা কাজ করবো।


এরপর কয়েকদফা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধিদল এবং জেলা প্রশাসকের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা ডলুরার প্রস্থাবিত শুল্কবন্দর এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
সর্বশেষ ২০২০ সালের আট জানুয়ারি  ডলুরায় ১০ একর জমি চিহিৃত করে এর মূল্য পরিশোধের জন্য জেলা প্রশাসকের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে জমির মূল্য তিন কোটি ৪৫ লাখ ২৬ হাজার ৯৪০ টাকা উল্লেখ করে, এই টাকা দ্রুত পরিশোধ করে, পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেবার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।
দীর্ঘদিন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে এই বিষয়ে যোগাযোগ না করায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পরে আরেকদফা তাগাদাপত্রও দেওয়া হয়। তাতেও কোন অগ্রগতি হয় নি।


সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক বললেন, ২০১৪ সাল থেকে এই বিষয়ে বিভিন্নভাবে কথা বলছি এবং সংশ্লিষ্টদের অনুরোধপত্র দিয়েছি। এখন আবার কাজ শুরু করেছি। মঙ্গলবার আবারও কাস্টমসের প্রতিনিধিরা ওখানে সরেজমিনে দেখতে গেছেন। জেলা প্রশাসকও সহযোগিতা করছেন। দেখা যাক কী হয়। এটি বহুদিনের স্বপ্ন আমার। উত্তর সুনামগঞ্জসহ সুনামগঞ্জ শহরকে বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে নিতে হলে ডলুরায় ইমিগ্রেসনসহ শুল্কবন্দরের প্রয়োজনীতাই বেশি জরুরি।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার