প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৪ ২০:৪২
সুবোধ অনেক আগেই পালিয়েছে। কে এই সুবোধ না জানা গেলেও সারাদেশে এই গ্রাফিতির ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। সেখানে লেখা হতো ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা’। তবে সাম্প্রতিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরকার বদলের কারণে সুবোধকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘সুবোধ তুই ফিরে আয় সময় এখন পক্ষে’। সুবোধের দু’হাতে রয়েছে খাঁচা বন্দি রক্তিম সূর্য।
শহরের রিভারভিউ এলাকায় একজন শিক্ষার্থী গ্রাফিতি আঁকছে। ছবি. সু.খবর
সাম্প্রতিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরকার বদলের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে সুনামগঞ্জের দেয়ালগুলোর রূপও। দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে প্রতিবাদ, দেশপ্রেম, সাম্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা।
সুনামগঞ্জের রিভারভিউ, কমরেড বরুণ রায় সড়ক, এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দেয়াল, এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয়ের দেয়ালসহ বিভিন্ন এলাকার দেয়ালে শোভা পাচ্ছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আঁকা রঙিন প্রতিবাদী গ্রাফিতি। চলতি মাসের ছয় তারিখ থেকে শুরু হয় এসব গ্রাফিতি আঁকা।

সুনামগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দেয়ালে নেই আর কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুরভিত্তি বা তৈলমর্দনের স্লোগান। কিংবা দলীয় নেতাদের তোষামোদ করে সাঠানো পোস্টার। সব সড়কের গুরুত্বপূর্ণ দেয়ালে ঠাঁই করে নিয়েছে আবেগের প্রতিবাদের রঙিন গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখন। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবিক এক দেশ গড়ার আওয়াজ। পথচারি থেকে শিক্ষার্থী সবার নজর কাড়ছে এসব মর্মস্পর্শি গ্রাফিতি।

বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুলের ‘বল বীর চির উন্নত মম শির’ কারো কাছা হাতের ছুঁয়ায় বন্ধুর প্রতি আহ্বান ‘মনুষ্যত্ব হীন হইও না বন্ধু’ শাসকের শাসনে কোনঠাসা মানুষদের জানানো হয়েছে ‘নতুন বাংলায় আপনাকে স্বাগত’ ‘এ বাংলায় স্বৈরাচারের ঠাঁই নাই’ ২৮ বছর আগে গুম হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের নেত্রী ‘কল্পনা চাকমা কোথায়?’ এমন প্রশ্নও ঠাঁই পেয়েছে দেয়ালে।

মুষ্টিবদ্ধ হাত, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হাতে প্লেকার্ড, উপরে উড়ছে শাসকের হেলিকপ্টার, পাশে লেখা ‘হোক প্রতিবাদ’ এমন একটি গ্রাফিতি ঠাঁই করে নিয়েছে রিভারভিউ এলাকার দেয়ালে। শাসকের রুদ্ধদ্বার থেকে বন্দিদের আনতে লেখা হয়েছে ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ অঙ্কিত আরেকটি গ্রাফিতি একই এলাকায় জায়গা করে নিয়েছে।

সুবোধ অনেক আগেই পালিয়েছে। কে এই সুবোধ না জানা গেলেও সারাদেশে এই গ্রাফিতির ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। সেখানে লেখা হতো ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা’। তবে সাম্প্রতিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরকার বদলের কারণে সুবোধকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘সুবোধ তুই ফিরে আয় সময় এখন পক্ষে’। সুবোধের দু’হাতে রয়েছে খাঁচা বন্দি রক্তিম সূর্য। শহরের রিভার ভিউ এলাকায় এই গ্রাফিতিটি আঁকা হয়েছে। এছাড়া লাল- সবুজের পতাকা, বিকল্প কে? গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনেক গ্রাফিতি দেয়ালে দেয়ালে আঁকা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পুরাতন বাসস্টেশন এলাকার সড়ক ও জনপথ বিভাগের দেয়ালে মঙ্গলবার একদল শিক্ষার্থী গ্রাফিতি আঁকছিলো। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এই শিক্ষার্থীদের রং তুলির ছোঁয়ায় দেয়ালটিতে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। তারা আঁকছে, একটি গাছের পাঁচটি পাতা, ‘মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খিস্ট্রান ও আদিবাসি’। বলছে, এই গাছের কোনো পাতা ছেঁড়া যাবে না। স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা, দুটি হাতে পড়া শেকল ছিন্ন করার ছবিসহ আরও অনেক দৃশ্য ফুটিয়ে তুলছে তারা।
শিক্ষার্থী ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, আমরা বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী গ্রাফিতি আঁকছি। ২০২৪ এর ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন একটি স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি। এরজন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। সবকিছু স্মরনীয় করে রাখবে দেয়ালের গ্রাফিতি।
শিক্ষার্থী শুভ তালুকদার বললেন, পুরো শহরে অনেক গ্রাফিতি আঁকা হচ্ছে। সবকিছুর মধ্যে দারুণ একটা পরিবর্তন হয়েছে। সবাই নিজের মত প্রকাশ করতে পারছেন। সামনে আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চাই। একটি নিয়মতান্ত্রিক দেশ, যেখানে মানুষ ছবি আঁকতে পারবে, গান গাইতে পারবে, সিনেমা বানাতে পারবে- সেরকম দেশ চাই।
শিক্ষার্থী পূর্বা চৌধুরী বলেন, আমরা একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ দেশ চাই। যে দেশে সবাই মিলেমিশে বেঁচে থাকতে পারবো। এই বিষয়গুলোকে পুরো শহরে গ্রাফিতির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলার চেষ্টা করেছি। নিজেদের সংস্কৃতি সবার মধ্যে তুলে ধরতে কয়েকদিন ধরে কাজ করছি।
সচেতন নাগরিকদের সংগঠন সুনামগঞ্জ জনউদ্যোগের আহ্বায়ক রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু বললেন, সমাজ পরিবর্তনে ও মানুষের সমস্যা সমাধানে গ্রাফিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুনামগঞ্জ শহরে অংকিত গ্রাফিতি মানুষের মাঝে প্রতিবাদ, দেশপ্রেম, সাম্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা পৌঁচ্ছে দিচ্ছে।
টিডি/সারআ
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন