বেপরোয়া দুর্নীতির রমরমা বাণিজ্য

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০০:০৫

কেনাকাটার অবিশ্বাস্য ব্যয়ে বহুল আলোচিত রূপপুর বালিশ কাহিনীকেও হার মানিয়েছে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল। ২০২২—২০২৩ অর্থ বছরে কেনাকাটার নামে প্রতিষ্ঠানটিতে চলেছে হরিলুটের কারবার। ভুয়া ভাউচার দিয়ে এক বছরে হাসপাতাল থেকে লোপাট হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা।  ওই অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।


এই অনিয়ম—দুনীর্তির সঙ্গে জড়িত হাসপাতালের স্টোরকিপার সুলেমান আহমদ, হিসাবরক্ষক মো. ছমিরুল ইসলাম ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মো. আনিসুর রহমান। এদেরকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য উপদেষ্টার নিকট স্মারকলিপি দিয়েছে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা।


বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী ইমন দোজা বলেন, সদর হাসপাতালের দুর্নীতি নতুন কিছু নয়। এমন ভয়াবহ দুর্নীতি জানা ছিল না। অডিট প্রতিবেদন থেকে বিষয়টি জানতে পারি। পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে উপদেষ্টাদের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি আমরা।


আরেক শিক্ষার্থী উসমান গনি বলেন, জেনেছি এই দুর্নীতিবাজদের খবর একাধিকবার জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে । এরপরও কিভাবে একই পদে বহাল থাকে তারা সেটি আশ্চর্যের। এরকম চলতে থাকলে সুনামগঞ্জের মানুষ কখনো সুচিকিৎসা পাবে না।


হাসপাতালের অডিট প্রতিবেদনের একটি কপি হাতে এসেছে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের । প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স এবং অন্যান্য পদের ২৫১ জন স্টাফ থাকলেও ২০২২—২৩ অর্থ বছরে রাবারস্টাম্প তৈরি হয়েছে ৩৭২০ টি। প্রতিটি রাবারস্টাম্পের মূল্য ধরা হয়েছে ৩০৯ টাকা।


এমন অস্বাভাবিক খরচের বিষয়ে নিরীক্ষক দল মন্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, এ—৪ কাগজে কাঁচা ভাউচার তৈরি করে ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন হয়েছে। এতো সংখ্যক রাবারস্টাম্প বানানো হলেও বাস্তব যাচাইয়ে অধিকাংশ রাবারস্টাম্প পাওয়া যায় নি।
রাবারস্টাম্প বানানো বাবদ এতো টাকা খরচ দেখানো হলেও নার্সরা নিরীক্ষা দলকে জানিয়েছেন, অফিস থেকে তাদেরকে কোন সিল দেওয়া হয় নি। তাদের ব্যবহৃত সিল তারা নিজেরাই টাকা খরচ করে বানিয়েছেন।


নিরীক্ষা দল ২০২২—২৩ ইংরেজির নিরীক্ষা করলেও তারা পরের অর্থাৎ ২০২৩—২৪ অর্থ বছরের জন্য স্টাম্প ও সিল কোডে ১২ লাখ ৪২ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ২৩ মার্চ ২০২৪ তারিখ পর্যন্ত ১০ লাখ টাকা সিল বানানো বাবদ উত্তোলনের প্রমাণ পেয়েছেন। নিরীক্ষা কমিটির মন্তব্যে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, স্টাম্প’এর বরাদ্দ যথাযথ নিয়মে উত্তোলন হয় নি।


এছাড়া নিরীক্ষা কমিটির মন্তব্যে বলা হয়েছে, যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানের নামে সিল তৈরির খরচ দেখানো হয়েছে। ভাউচারগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের নয়। অডিট কমিটি সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এই টাকা আদায়পূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেন।
রাবারস্টাম্প (সিল) তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে শহরের পৌর বিপণি’র পিনাক আর্ট ও শফিক আর্টের ভাউচার দেখানো হলেও এই দুই প্রতিষ্ঠানের মালিকই বলেছেন, তাদের কাছ থেকে চার—পাঁচ হাজার টাকার বেশি সিল নেওয়া হয় নি। এই ভাউচারও তাদের নয়। একটি সিলের সবোর্চ্চ মূল্য ৪০—৫০ টাকার চেয়ে বেশি নয়।


নির্দেশনা অমান্য করে ওষুধ সহ অন্যান্য ক্রয়ের নামে অর্থ লোপাট 
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে সরকার নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান হতে ওষুধ ক্রয় না করে অন্য কোম্পানি থেকে ওষুধ ক্রয় করে এক বছরে এক কোটি ৮০ লাখ টাকা’র ক্ষতি করা হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আপত্তি দেয়া হয়েছে।
নিরীক্ষক দল উল্লেখ করেছেন, হাসপাতালে ওষুধ ক্রয়ের জন্য তিনটি বিলের মাধ্যমে ফরচুন কর্পোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে চার কোটি ৪৩ হাজার ৬৪ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ. পর্যালোচনায় দেখা গেছে এই ওষুধ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মোতাবেক ইডিসিএল’এর কাছ থেকে ক্রয় করা হলে ৪৫ লাখ ৬০ হাজার ১৬৮ টাকা সাশ্রয় হতো।
এছাড়া হাসপাতালের জন্য লিলেন সামগ্রী যেমন কম্বল, বালিশ, বালিশ কাভার, বিছানার চাদর, রাবার ক্লথ, রেক্সিন ও মশারি ক্রয় করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফরচুন কর্পোরশেন’কে ষোল লাখ ৮৩ হাজার পাঁচ’শ টাকার বেশি দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বাইরে অথার্ৎ ইডিসিএল থেকে না কিনে বিভিন্ন সরবরাহকারীর নিকট থেকে এক কোটি ৩৪ লাখ ৮৮ হাজার ৭৩ টাকার ওষুধ কেনা হয়েছে দেখিয়ে বিল উত্তোলন হলেও এ বিষয়ে কোন প্রমাণাদি পায় নি নিরীক্ষা কমিটি।
অন্যদিকে আসবাবপত্র ও অফিস সরঞ্জামাদি সরবরাহ না করলেও মেসার্স সামিয়া এন্টারপ্রাইজ ও আরকে ট্রেডিং নামের দুটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ১৫ লাখ ২৯ হাজার ৭৫০ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে নিরীক্ষা দল উল্লেখ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোন প্রকার অনুমোদন এবং ব্যয় মঞ্জুরি গ্রহণ না করে পূর্বের বকেয়া দেখিয়ে ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ১২৭ টাকা পরিশোধ দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষা দল উল্লেখ করেছে।


স্টোর থেকে লিলেন সামগ্রী বিতরণের প্রমাণ নেই
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফরচুন কর্পোরেশন হতে লিলেন সামগ্রী যেমন ৫০০ টি কম্বল. ১০০০ টি বালিশ, ১০০০ বালিশ কভার, ২০০০ বিছানার চাদর, ২৫২৫ মিটার রাবার ক্লথ, ৫০০ মশারী, ৫০০ এবডোমিনাল শিট, ২০০ ফোম ম্যাট্রেস, ২০০ ফোম ম্যাট্রেস কাভার ক্রয় করা হয়েছে উল্লেখ আছে ২১ নভেম্বর ২০২২ তারিখে। ক্রয়কৃত এসব লিলেন সামগ্রী প্রধান স্টোর থেকে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিতরণ করার কোন প্রমাণ ১০ দিন সময় দেবার পরও নার্সিং সুপারভাইজার বা ওয়ার্ড ইনচার্জগণ দেখাতে পারে নি। এই অবস্থায় নিরীক্ষক দল তাদের মন্তব্যে বলেছেন, ‘আদৌ লিলেন সামগ্রী গ্রহণ করা হয়েছে কি না কিংবা ১০ ওয়ার্ড কতৃর্ক আত্মসাত করা হয়েছে কি না এই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায় নি। প্রমাণ না পাওয়ায় ৪৬ লাখ ৯৯ হাজার ৮৭৫ টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে মর্মে মন্তব্য করেছে অডিট টিম।
এসব বিষয়ে অভিযুক্ত সুলেমান মিয়া বলেন, অডিট আপত্তি সকল অফিসেই আছে। অডিট আপত্তিতে কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে কার্যকর নয়। এগুলোরও আপত্তি দেওয়া হয়েছে। নথিপত্র যাচাই করে ব্রডশিটে এসবের জবাব দেব আমরা। এখানে কোন অনিয়ম হয় নি। 
হিসাব রক্ষক ছমিরুল বলেন, আমি কর্মচারি মাত্র। অবৈধভাবে কিছু করার ক্ষমতা নেই। যা আদেশ দেয়া হয় তা পালন করি।
হাসপাতালের তৎকালীন উপপরিচালক ডা. মো. আনিসুর রহমানও বলেছেন, তিনি কোনো অনিয়ম করেন নি। অডিট প্রতিবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি যা করেছি রোগীদের স্বার্থে করেছি। অডিট আপত্তি হতেই পারে। আমরা প্রতিটি আপত্তির জবাব দেব। তবে অডিট আপিত্তর জবাবই গেল না এর আগেই এটা বাইরে কীভাবে গেল এটি জানতে চাইবো আমি। আমার মনে হয়েছে কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমাকে বিতর্কিত করতে চাইছে।
হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক মো. মাহবুবুর রহমান বলেছেন, সুলেমান ও ছমিরুলই এখন হাসপাতালের বড় সমস্যা। মূলত এরাই সব অনিয়ম—দুনীতির সঙ্গে যুক্ত। আমাকেও তারা নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি দিচ্ছে। আমি প্রশাসন ও পুলিশকে সব অবহিত করেছি। 
জেলার প্রধান এই চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের ভয়াবহ দুর্নীতির খবর পাঠকদের ধারাবাহিকভাবে জানানোর চেষ্টা করবে সুনামগঞ্জের খবর। আরও অনিয়মের বিস্তারিত থাকছে পরের পর্বে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার