নীরবে কাটলো বাউল সম্রাট আব্দুল করিমের প্রয়াণ দিবস 

প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ০৭:৩৬

“তুমি—আমি দুইজন ছিলাম, এখন আমি একেলা, আর জ্বালা সয়না গো সরলা। একেলা, আর জ্বালা সয়না গো সরলা। দুনিয়া কঠিন ঠাঁই, দুঃখ কইবার জায়গা নাই, মনের দুঃখ কারে জানাই বসে কাঁদি নিরালা, আর জ্বালা সয়না গো সরলা।”
প্রিয়তমা স্ত্রী সরলাকে হারিয়ে এভাবেই শোকে কাতর বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম করুণ সুরে তার মনের দুঃখ প্রকাশ করেছেন সংগীত সৃষ্টির মাধ্যমে। শুধু স্ত্রীর জন্যই নয়, স্বশিক্ষিত এই বাউল ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ—দুঃখ, প্রেম—ভালোবাসার পাশাপাশি গানে গানে লিখে গেছেন সকল অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সা¤প্রদায়িকতার বিরূদ্ধে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের গান গেয়ে গেয়ে তিনি মানুষকে করেছেন সুসংগঠিত। যদিও দারিদ্রতা তাকে বাধ্য করেছিলো কৃষিকাজে শ্রম ব্যয় করতে কিন্তু কোনো বাঁধাই তাকে গান সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। ১২ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) ভাটির এই মহান বীর পুরুষের ১৫ তম প্রয়াণ দিবস ছিল। 
১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রয়ারির জেলার দিরাই উপজেলার হাওরের মধ্যবর্তী ধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিম। তার বাবা ইব্রাহিম আলী ও মা নাইওরজান। বাউল স¤্রাটের প্রেরণা তাঁর স্ত্রী আফতাবুন্নেসা। যাকে তিনি আদর করে ‘সরলা’ নামে ডাকতেন। 
জীবদ্দশায় আব্দুল করিম সহ¯্রাধিক গান লেখাসহ সুর করেছেন। বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে তার লেখা ১০টি গান ইংরেজিতে অনুবাদিত হয়েছে। কিশোর বয়স থেকে শরীয়তী, মারফতি, দেহতত্ত্ব, গণসংগীত, বাউল গান সহ অন্যান্য গান লিখলেও এসব গান শুধুমাত্র ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছেই জনপ্রিয় ছিল। 
মৃত্যুর কয়েক বছর আগে বেশ কয়েকজন তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা বাউল শাহ আব্দুল করিমের গানগুলো নতুন করে গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলে তিনি দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন। মৃত্যুর আগেই ২০০১ সালে সংগীত শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় বাংলাদেশ সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ২১শে পদক প্রদান করে। এছাড়াও সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক ও মেরিল প্রথম আলো পুরষ্কারসহ বিভিন্ন পুরষ্কার অর্জন করেন তিনি।  ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৯৩ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। 
কিংবদন্তি বাউলের জন্ম ও মৃত্যু দিবসকে কেন্দ্র করে আগে বড় পরিসরে সাংস্কৃতিক উৎসব পালন হলেও কয়েকবছর যাবৎ নীরবেই কেটে যায় প্রয়াণ দিবস। সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে বিভিন্ন উপজেলার বাউল শিল্পীদের নিয়ে ভার্চুয়ালি কিংবা সরাসরি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও এবছর নেই তেমন কোন আয়োজন। গ্রামের বাড়ি দিরাইয়ে প্রত্যেক বছরের মতো ছোট পরিসরে বিকালে দোয়া মাহফিল ও রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে ক্ষোভ জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের সংস্কৃতি প্রেমিরা। তাদের দাবী দেশরত্নকে শুধু দিরাই কিংবা সুনামগঞ্জের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রত্যেকবছর যেভাবে করিম, রাধারমণ, হাসন রাজাকে বড় পরিসরে স্মরণ করা হতো, সেই রীতি যেন আবারো চালু হয়। সেই সাথে করিমের গানের প্রত্যেকটি শব্দ যেন ঠিক রেখে চর্চা করা হয়। 
সংস্কৃতি কর্মী রিপন চন্দ বলেন, বিশ্ব দরবারে যে কয়জন লোককবির জন্য আমরা পরিচিত হয়েছি, তার মধ্যে অন্যতম আব্দুল করিম। আমরা প্রতিনিয়ত তার গানের চর্চা করি। আমাদের দাবি ছিলো করিমের নামে একটি মুক্তমঞ্চ করার, সেটি এখনো হয়নি। একই সাথে আব্দুল করিমের গানগুলোকে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হলে, যারা গান গাইবে তারাও সঠিক ও শুদ্ধ ভাবে চর্চা করতে পারবে। 
সংগীত শিল্পী সুহেল রানা বলেন, বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিম শুধু সুনামগঞ্জের না উনি দেশের সম্পদ। অন্তত উনার জন্ম, মৃত্যু দিবসে আগে অনেক আয়োজন দেখতাম। কিন্তু এবার দিরাইয়ে তার গ্রাম ছাড়া সুনামগঞ্জে তেমন কোনো আয়োজন নেই। তার নামে একটা একাডেমি প্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা থাকলেও এখনো সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। 
সন্তোষ কুমার চন্দ মন্তোষ বলেন, করিম বৈশ্বিক সম্পদ। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। করিমকে নিয়ে প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় অনুষ্ঠান আয়োজন করার দাবি জানাই। 
জেলা কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল বললেন, বাংলা লোক শিল্পের অমৃত ভূবনের জ্যোতির্ময় পুরুষ বাউল স¤্রাট আব্দুল করিমের প্রয়াণ দিবসে শিল্পকলা একাডেমি বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকলেও দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবছর কিছু করা যায় নি। তবে শিল্পকলার সংগীত বিভাগের প্রশিক্ষণার্থীদের করিমের গান চর্চার মাধ্যমে স্মরণ করা হয়েছে। 

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার