আ.লীগের ‘সাবলিজার’  বিএনপি সমর্থকরা

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৪ ০০:০৬

ভারতীয় গরু’র হাট হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জ সীমান্ত এলাকার হাটগুলো’র অনেকগুলোতেই এখন ‘সাবলিজ’এর মওকা পেয়েছেন কিছু বিএনপি ও যুবদল নেতারা। আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সুবিধাভোগীরাও ভেতরে ভেতরে কোথাও কোথাও আছে তাদের সঙ্গে।
জেলার মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকার কাছাকাছি হাট ভোলাগঞ্জ ও মহিষখলা (দুটোই চোরাই গরু’র হাট হিসেবে পরিচিত)। এই সীমান্ত পথে বহুদিন হয় ভারতীয় গরু আসে এবং এই দুই হাটে নানা কৌশলে বিক্রয় হবার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈধ কাগজে বাজারজাত হয়।
স্থানীয় একাধিক বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেছেন, ২০১৭-১৮ ইংরেজি সনের পর থেকে ‘ধরমেলা’ (অনেকটা খোলা) এই সীমান্ত। তখনকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আজিম মাহমুদ এসব চোরাচালানের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তার চাচা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা (সর্বশেষ রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল বাতেন) হওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনও তাতে সহযোগিতা করেছেন। পাঁচ আগস্টের আগে পর্যন্ত মহেষখলা বাজারের গরু’র হাট শাসন করতেন ডিআইজি পরিবারের লোকজনই। এই বাজারের কাছাকাছি এলাকায়ও অনুমোদন ছাড়াই আরেকটি বাজার দাতিয়াপাড়া গরু’র হাট (এটিও চোরাই গরু’র হাট হিসেবে পরিচিত) সৃষ্টি করেছিলেন তারা। আজিম মাহমুদ’এর নিয়ন্ত্রণেই চলছিল এই হাটও। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে পর্যন্ত আজিম মাহমুদের চাচা আব্দুল বাতেন ছিলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি। একারণে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন এসব অন্যায় কাজে আজিম মাহমুদ ও তার লোকজনকে সহযোগিতা করতো। দাতিয়াপাড়া বাজার থেকে চোরাই গরু বৈধ করণের হাসিলও দেওয়া হতো। 
এই সীমান্তের আরেক অবৈধ গরু’র বাজার ভোলাগঞ্জ। এই বাজারে গবাদি পশুর হাট না থাকলেও সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে এ বাজার (ভোলাগঞ্জ বাজার) হয়েই চোরাই পথে আসা গরু ও মহিষ সীমান্তের বৃহৎ বাজার মহিষখলা নিয়ে আসা হয়। এরপর মহিষখলা বাজারে ক্রয়বিক্রয় রশিদ তৈরি করে এসব অবৈধ গরু মহিষ চলে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এছাড়া মধ্যনগর সীমান্তের চোরাকারবারের বড় রুটগুলো ভোলাগঞ্জ বাজার সংলগ্ন হওয়ায় মহিষখলা ও ভোলাগঞ্জ বাজারের আর্থিক গুরুত্বও অনেক বেশি। 
১৪৩১ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত বাজারগুলো ইজারা প্রদানের জন্য চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ভোলাগঞ্জ বাজারের ইজারার সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫৬ টাকা এবং মহিষখলা বাজারের ইজারা মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৮১ লাখ ২৬ হাজার ২৫০ টাকা। 
ইজারা নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে বাজারের ইজারা পান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিতোষ সরকারের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত মধ্যনগর ইউনিয়নের গলহা গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে স্থানীয় যুবলীগ নেতা মানিক মিয়া এবং মহিষখলা বাজারের ইজারা পান ডিআইজি আব্দুল বাতেন এবং আজিম মাহমুদের আত্মীয় রুবেল মিয়া। 
স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর ভোলাগঞ্জ ও মহেষখলা বাজার মানিক মিয়া এবং রুবেল মিয়া বিএনপির দুই নেতাকে সাবলিজ প্রদান করেছেন। গেল ২১ আগস্ট চারশ টাকার স্টাম্পে এই সাবলীজের চুক্তি হয়। 
ওই সময় মানিক মিয়া মোমেনের নামে ১০০ টাকা মূল্যমানের চারটি স্ট্যাম্পে লিখিতভাবে ভোলাগঞ্জ বাজারের মালিকানা হস্তান্তর করেন। একইভাবে এই সীমান্তের বড় গরু’র হাট মহিষখলা বাজারও সাবলিজ হয়েছে বলে এলাকায় প্রচার আছে।
ইজারাদার মানিক মিয়া অবশ্য মোমেন তালুকদাররা জোরপূর্বক সাবলিজ নিয়েছেন বলে দাবী করেছেন। মোমেন তালুকদার উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ূম মজনুর চাচাতো ভাই। 
ইজারাদার মানিক মিয়ার দাবি বাজারে কালেকশনের সময় বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সুজন মিয়া তার লোকজন নিয়ে আমার টাকা পয়সা ছিনিয়ে নেয়। পরে রাতে পরিতোষ সরকারের বাড়িতে এসে মামলার ভয়ভীতি দেখিয়ে আমার কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নিয়েছে। স্ট্যাম্পে কী লেখা ছিল তাও দেখি নি। এখন পর্যন্ত আমি কোনো টাকা পয়সা পাই নি। কয়েকদিন আগে ভোলাগঞ্জ বাজারে কালেকশনের জন্য আমার লোক পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তাদেরকে কালেকশন করতে দেওয়া হয় নি।
সাবলিজ গ্রহিতা মোমেন তালুকদার বললেন, মানিক আমাদের কাছে ভোলাগঞ্জ বাজারের ইজারা বিক্রি করে দিয়েছে। আমরা লিখিতভাবে স্ট্যাম্প করে নিয়ে এসেছি।
বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সুজন মিয়া বললেন, জোর করে স্বাক্ষর নেওয়ার বিষয়টি সত্য নয়। আমাকে সেখানে স্ট্যাম্প লেখার জন্য নেওয়া হয়েছিল। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়পক্ষ চূড়ান্ত মূল্য আগেই নির্ধারণ করেছিল। স্ট্যাম্পে উল্লেখিত মূল্য মানিককে তখনই দেওয়া হয়েছে। যার ভিডিও আমাদের কাছে রয়েছে।
মধ্যনগর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম মজনু বললেন, এসব বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।
বংশিকু-া দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আজিম মাহমুদ বললেন, প্রায় ৯০ লাখ টাকা ইজারামূল্য দিয়ে মহিষখলা বাজার আমরা বেশ কিছু মানুষ মিলে রুবেল মিয়ার নামে ইজারা এনেছি। এর একটি বড় অংশ মানিক মিয়ার নামে। সে অন্য আরেকজনের কাছে বিক্রয় করে দিয়েছি। আমাদের অংশও অন্য আরেক বিএনপি নেতার নামে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের কারোরই টাকা ওঠেনি। আমার দুই শতাংশ শেয়ার ছিল। আমার আসল টাকাই ওঠেনি। আমার চাচা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম কাজে অকাজে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ওঠানো হয়, এটিও দুঃখজনক। দাতিয়াপাড়ার বাজারের আয় দিয়ে একটি হাইস্কুল চলে বলে জানান তিনি। 
হাইস্কুলটিতো এমপিওভুক্ত, এটি চালানোর জন্য অবৈধ গরু’র হাট করার প্রয়োজন আছে কী-না, এমন প্রশ্নের জবাবে আজিম মাহমুদ বলেন, এখনো গরু’র হাটের আয় স্কুলের ফান্ডেই জমা হয়।
মধ্যনগর উপজেলার অতিরিক্ত দ্বায়িত্বে থাকা ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দীন বলেন, ইজারাপ্রাপ্ত হাট-বাজার সাবলিজ বা হস্তান্তরের কোনো সুযোগ নেই। বাজারটি সাবলিজ প্রদানের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কেবল এই দুই বাজার নয় সীমান্তের বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার চিনাকান্দি বাজার, বাঘবেড় বাজার, দোয়ারাবাজার সীমান্তের বাংলাবাজার, নরসিংহপুর, ভোগলা ও লিয়াকতগঞ্জ বাজারে সীমান্তের ওপার থেকে আসা গরু বিক্রয় হওয়ায় এসব বাজারের কদর অনেক আগে থেকেই বেশি সীমান্ত এলাকার কিছু রাজনীতিকের কাছে।
চীনাকান্দি বাজার ও বাঘবেড় বাজারেও একসময় রাজাপাড়া সীমান্ত দিয়ে বেশি পরিমাণে গরু আসতো। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এখন কিছুটা কমেছে। এই গরু’র হাটের ইজারাদার ঘুরে-ফিরে বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম তালুকদারের ভাই যুবলীগের সভাপতি খালেদ তালুকদার ও ধনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিলন মিয়ার ভাই মিরাস মিয়া ছিলেন। এই দুই পরিবারের বিরুদ্ধেই চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ বহুদিনের।
গেল ৩০ শে চৈত্র বিশ^ম্ভরপুরে এরা নিজেদের মধ্যে সি-িকেট করে বাজার ইজারা নেবার জন্য যথাযথ মূল্য দেয় নি। 
স্থানীয় প্রশাসন ইজারা না হওয়ায় খাস কালেকশনের জন্য দিয়েছিল বাজারগুলো। এই খাস কালেকশনের দায়িত্বেও ছিলেন খালেদ তালুকদার। ৪২ হাটবারের জন্য তাকে হাসিল আদায়ের জন্য দায়িত্ব দিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসন। পাঁচ আগস্টের পর থেকে খালেদ তালুকদার পলাতক। এখন সেখানে খাস কালেকশন আদায় করছেন যুবদলের কয়েক নেতা।
যুবদল নেতা জাহেদ মিয়া বললেন, খালেদ তালুকদার এলাকা ছাড়ার পর উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে তহশিলদারসহ আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে খাস কালেকশন করছি। এখানে অন্যায় জুলুম হচ্ছে না। আমরা কাউকে অন্যায় করতে দিচ্ছি না।
অন্যদিকে দোয়ারাবাজার সীমান্তের গরু’র বাজারগুলো কিছুটা ব্যতিক্রম। স্থানীয় একজন গণমাধ্যমকর্মী জানিয়েছেন, ওখানকার গরু’র হাটগুলো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক ইজারাব্যবসায়ীরা সি-িকেট করে কম মূল্যে ইজারা নিয়েছেন। পাঁচ আগস্টের আগে ওই বাজারগুলোতে হাসিল (গরু’র ক্রয়-বিক্রয় রশিদ) কাটতে নেতৃত্ব দিতেন আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। এখন হাসিল কাটার বিষয়গুলো ফেইস করছেন বিএনপি সমর্থকরা। 
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ছাব্বির আহমেদ আকুঞ্জি বললেন, ইজারা শর্ত অনুযায়ী ‘সাবলিজ’এর কোন বিধান নেই। এরকম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যথাযথ মূল্য না পাওয়ার কারণে বাজার ইজারা না হলে খাস কালেকশন আদায় করা হয়। এক্ষেত্রে তহশিলদারের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য লোক নিয়োগ করা হয়। কিন্তু এটি লিখিতভাবে থাকে না। বাজার ইজারা দেবার জন্য নির্দিষ্ট একটি মূল্য নির্ধারণ থাকে। এই নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কেউ উচ্চ দর দিলে, তাকে ইজারা দেওয়া ছাড়া কোন পথ থাকে না। এক্ষেত্রে বাইরে আগ্রহী ইজারাদাররা মিলে গেলেও আইনত কিছুই করার থাকে না।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার