প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর, ২০২৪ ০৭:০০
মহিষখলা বাজার
মাঝে মধ্যে বিভিন্ন কারণে দুই/চার দিন বন্ধ থাকলেও মধ্যনগর সীমান্তের বিভিন্ন চোরাই পথ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে অবাধে প্রবেশ করে গরু—মহিষের চালান। আর এসব অবৈধ গরু ও মহিষের বৈধতা দিচ্ছে স্থানীয় পশুর হাট মহিষখলা বাজারের অসাধু ইজারাদাররা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অবৈধভাবে সীমান্তের ওপার থেকে আসা গরু—মহিষ এপারে এনে মহিষখলা বাজারের ইজারদারের নিকট থেকে গরু প্রতি ১ হাজার ৫০০ টাকা ও প্রতিটি মহিষের জন্য দুই হাজার টাকা দিয়ে গবাদিপশু ক্রয় বিক্রয়ের হাসিল রশিদ সংগ্রহ করলেই এসব গরু মহিষ বৈধতা পায়। আর এই কাগজের বলেই ভারতীয় গরু—মহিষ বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমের পাঠিয়ে দেয়া হয় পাশের বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে অনুমোদন বিহীন গবাদিপশুর হাট দাতিয়াপাড়া নতুন বাজার ও বারহাট্টা উপজেলার নৈহাটী বাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
সুনামগঞ্জের সাথে ভারতের সীমান্ত রয়েছে ১২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে মধ্যনগর উপজেলার অন্তত৬টি সীমান্ত স্পটে চোরাকারবারের সাথে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় পাঁচ শতাধিক চোরাকারবারি।
এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্য মতে, মধ্যনগর উপজেলার এসব স্পটগুলো হচ্ছে— বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের মহেষখলা, কাইটাকোনা, কড়ইবাড়ী (কড়ই চড়া), আমতলা, ঘিলাগড়া, বাঙ্গালভিটা। এসব স্পট দিয়ে গরু—মহিষসহ ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে নিয়ে আসছে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্র।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সীমান্তের কাঁটাতারের গোপন পথ দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নামানো হয় গরু ও মহিষের চালান। নিরাপদে পশু নিয়ে আসতে চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন চোরাই শ্রমিক এজেন্টরা। গরু, মহিষ বাংলাদেশে প্রবেশ করালে পশুপ্রতি ১০০০—১২০০ টাকা পান শ্রমিকরা।
উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের মো. আলম মিয়া বলেন, মাঝে মধ্যে দুই/চার দিন বন্ধ থাকলেও সারা বছরেই চোরাইপথে ব্যাপক হারে ভারতীয় গরু আনা হচ্ছে। আনুমানিক পাঁচশতাধিক চোরাকারবারি এতে জড়িত আছে। অবৈধ এসব ভারতীয় পশু সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদশে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মহিষখলা বাজারের গরু হাটের হাসিল রশিদ পেয়ে যান চোরাকারবারি সিন্ডিকেট। আবার অনেক সময় ভারতীয় গরু এনে দাতিয়াপাড়া সহ বিভিন্ন গ্রামে রাখা হয়। এরপর মহিষখলা বাজারের গরুর হাটের হাসিল রশিদ সংগ্রহ করেন চোরাকারবারিরা। এই হাসিল রশিদের বলে গরু বাজারে তুলে কেনাবেচার মাধ্যমে এর বৈধতা পেয়ে যান চোরাই গরু সিন্ডিকেটের ব্যবসায়ীরা। আর এই কাজটি নিয়ন্ত্রণ করেন মহিষখলা বাজারের ইজারাদার সিণ্ডিকেট ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, মহিষখলা বাজারের গবাদিপশুর হাটকে কেন্দ্র করেই মূলত চোরাকারবারি চক্রটি সক্রিয় রয়েছে। গরু ও মহিষ চোরাকারবারের সাথে মহিষখলা বাজার ইজারাদার সিন্ডিকেট জড়িত। তারা আরও বলেন, মহিষখলা বাজারের ইজারদার সিন্ডিকেট সদস্যরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা। তাই এ নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে চায় না।
এ বিষয়ে কথা বলতে মহিষখলা বাজার ব্যাবস্থাপনা কমিটির সভাপতি (পদাধিকার বলে) বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরনবী তালুকদারের সাথে মুঠোফোনে বার বার চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
এদিকে মহিষখলা বাজারের ইজারাদার রুবেল মিয়া স্থানীয় একটি মামলার আসামী তাই তিনি আত্মগোপন করে থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে ইজারাদার সিণ্ডিকেটের নিযুক্ত খাজনা আদায় ও গবাদিপশু ক্রয় বিক্রয়ের হাসিল রশিদ প্রদানের দ্বায়িত্বে থাকা দাতিয়াপাড়া গ্রামের হক মিয়ার সাথে কথা হলে তিনি স্বীকার করেন, মহিষখলা বাজারের হাসিল রশিদ নিয়েই চোরাইপথে আনা ভারতীয় গরু মহিষের বৈধতা দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে মহিষখলা বাজার ইজারদার সিণ্ডিকেট সদস্য ছিলেন বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহবায়ক মো. শফিকুল ইসলাম। তার কাছে জানা যায়, মহিষখলা বাজার ও দাতিয়াপাড়া নতুন বাজার দুইটি থেকেই অবৈধ পথে আনা ভারতীয় গরু মহিষের হাসিল রশিদ দেওয়া হয়। তিনি স্বীকার করেন মহিষখলা ও দাতিয়াপাড়া নতুন বাজার থেকে অবৈধ পথে আনা ভারতীয় গরু মহিষের হাসিল রশিদ না পেলে মধ্যনগর সীমান্তে গরু মহিষের চোরাকারবার বন্ধ হয়ে যাবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মধ্যনগর উপজেলা প্রশাসনের হাটবাজার ব্যাবস্থাপনা কমিটি টেন্ডারের মাধ্যমে মহিষখলা বাজারটি ১৪৩১ বাংলা ১বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত একসনা ইজারা প্রদান করেছে। প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে একমাত্র দরদাতা হিসেবে বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিম মাহমুদের আপন মামাতো ভাই রুবেল মিয়া মহিষখলা বাজারটি ৮১ লাখ ২৬ হাজার ২৫০ টাকায় ইজারা পান। আজিম মাহমুূদ রংপুর রেঞ্জের সাবেক (বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত) ডিআইজি আব্দুল বাতেনের আপন ভাতিজা।
জানা গেছে, গত ১৪৩০ বাংলা সনে মহিষখলা বাজারের ইজারামূল্য এক কোটি টাকার উপরে ছিলো কিন্তু চলতি বছরে ডিআইজি আব্দুল বাতেনের প্রভাব খাটিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের যোগসাজশে পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে কম ইজারামূল্যে মহিষখলা বাজারটি ইজারা প্রদান করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের এক ব্যক্তি ও বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্যের সাথে মধ্যনগর সীমান্তের চোরাকারবার নিয়ে ফোনালাপে যে বিষয়গুলো জানা গেছে তাহলো, মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে সীমান্তের মহিষখলা বাজারটি গত কয়েকবছর ধরে ইজারা নিয়ে আসে বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের সাবেক ডিআইজি আব্দুল বাতেনের পরিবারের সদস্যরা। ব্যবসায়িক স্বার্থে তারা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় ও উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কিছু নেতাদের নিয়ে ইজারাদার সিন্ডিকেট তৈরি করতো। এ বছরের শুরুতে তাই করেছিল। কিন্তু পাঁচ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ নেতা—কর্মীদের তাড়িয়ে দিয়ে স্থানীয় বিএনপি’র কয়েকজন নেতাকে সিন্ডিকেট ভূক্ত করা হয়েছে।
তারা বলেন, মহিষখলা বাজার উপজেলার একমাত্র বাজার, যেখানে গবাদিপশুর হাটের অনুমোদন রয়েছে। তাই মহিষখলা বাজারের ইজারদার যদি অবৈধ পথে আনা ভারতীয় গরু মহিষের হাসিল রশিদ না দেন, তাহলে সীমান্তের গরু মহিষ চোরাকারবারিরা অবৈধ এ ব্যবসা করতে পারবেনা। এতে করে মধ্যনগর সীমান্তের চোরাকারবার একেবারেই বন্ধ হতে পারে।
তারা আরও বলেন, মহিষখলা বাজারের ইজারদার সিন্ডিকেট গবাদিপশুর বেচা—কেনার রশিদ ও হাসিলের মাধ্যমে ভারতীয় গরুর বৈধতা দিয়ে আয় করেন বিপুল পরিমান টাকা। এটি এখন ওপেন সিক্রেট।
সীমান্তের চোরাকারবার প্রসঙ্গে মধ্যনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সজীব রহমান বলেন, আমি নতুন এসেছি। সীমান্তের চোরাকারবার বন্ধের জন্য বিজিবি কাজ করছে। আর আমার থানা এলাকায় কোনো চোরাকারবারের পণ্য প্রবেশ করলে তার বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। যে কোনো অন্যায় ও অবৈধ কর্মকাণ্ড চলতে না দেওয়ার বিষয়ে আমি কঠোর অবস্থানে রয়েছি।
মধ্যনগর সীমান্তের চোরাকারবার বন্ধে বিজিবি’র বিশেষ কোনো পদক্ষেপ রয়েছে কি—না, তা জানতে সুনামগঞ্জ—২৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল একে এম জাকারিয়া কাদির এর সঙ্গে মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করে, এবং ক্ষুদে বার্তা পাঠানোর পরেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে সুনামগঞ্জ—২৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল একে এম জাকারিয়া কাদির স¤প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, চোরাকারবার প্রতিরোধে আমরা আগের চেয়ে আরও তৎপর। সীমান্তে জনবল বাড়ানো হয়েছে। সার্বক্ষণিক নজরদারিতে কাজ করছে টহল টিম। বিশেষ করে সীমান্তের ১৫০ গজ কড়াকড়িতে রয়েছে। প্রতিনিয়ত অভিযানে অবৈধ পণ্য জব্দ হচ্ছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন