প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৪ ০৭:৩১
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের প্রধান সংবাদ শিরোনাম ছিলো- ‘কাঁচামরিচের কেজি ৫০০ টাকা’। এই সংবাদেই সুনামগঞ্জের কাঁচাবাজারের দর বিশ্লেষণ করে জানানো হয়েছে, প্রায় প্রতিটি সবজির দামই এখন অনেক বেড়ে গেছে। বৃষ্টিপাত ও দেশের কোথাও কোথাও বন্যা পরিস্থিতির কারণে কাঁচাবাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি, এমন দাবি ব্যবসায়ীদের। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের স্থানীয় সহকারি পরিচালকও দাম বাড়ার পেছনে বন্যা পরিস্থিতির দায় দিলেন। তবে তিনি এটিও বলেছেন, বহু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা করার আশায় সরবরাহ ঘাটতির সময়টাতে দাম বাড়িয়ে দেন। ঠিক এই জায়গাটাতেই আমাদের কথা। সরবরাহ ঘাটতির সময় যাতে বাজারে পণ্যমূল্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি না ঘটে সেজন্য সরকারের বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেইসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বাজার পরিস্থিতিকে মানুষের সহনীয় ও যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার প্রতিবিধান করা। কিন্তু উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বাজারের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ তেমন শক্ত নয়। নির্দিষ্ট কোনো পণ্য যা দেশেই উৎপাদিত হয়, তার সরবরাহ ঘাটতি হলে বাজারে সেই জিনিস কম পাওয়া যাবে। ক্রেতারা কম কিনবে, নয় একেবারেই কিনবে না। কিন্তু লাফিয়ে দাম বাড়বে কেন। যে কাঁচামরিচ দিন কয়েক আগে দুই থেকে আড়াই শ’ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো সেই একই জিনিসের দাম হঠাৎ করে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার যুক্তিগ্রাহ্য কোনো কারণই থাকতে পারে না। আসল কারণ হলো ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা লোভ। সেই লোভ যেমন অতীতে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও একইভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। মানুষ তো সর্বক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিলো। বলাবাহুল্য প্রান্তিক, দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের জন্য বাজারটাই হলো আসল জায়গা, যেখানে কিছুটা কম দামে জিনিস কিনতে পারলে তার মুখে হাসি ফুটে। রাজনীতি-অর্থনীতির জটিল মারপ্যাঁচ এই সাধারণ মানুষ তেমন করে বুঝেন না। সে বুঝে কিসে তার জীবন বিপর্যস্ত হয় আর কিসে স্বস্তি নেমে আসে।
শুধু কাঁচাপণ্য নয়, বাজারের কোনো পণ্যের দামই আগের চাইতে কমেছে তা কেউ বলতে পারবেন না। চালের দাম বেড়েছে, পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকার জন্য যেসব খাদ্যদ্রব্য কিনে থাকে তার কোনোটিরই দাম কমে নি। তার অর্থ হলো সাধারণ মানুষ পরিবর্তনের সুফলটা নিজের জীবন দিয়ে তেমন করে বুঝতে পারছে না। এই যে সাধারণের উপলব্ধির জায়গা তাকে বড় করে দেখতে হবে। সেখানে কীভাবে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে সর্বাগ্রে। তবেই পরিবর্তন অর্থবহ হবে। মানুষ বুঝতে পারবে আগে ‘রাজার দোষেই রাজ্য নষ্ট ছিলো’। এখনকার রাজা প্রজার কষ্ট বুঝতে পারছেন। সরকাাির যেসব প্রতিষ্ঠান বাজার তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের কাজকর্মে সৃজনশীলতার প্রয়োগ ঘটাতে হবে। লোকদেখানো দুই/একটি অভিযানে বাজার নিয়ন্ত্রণে আসে না, এটি বহুবারের অভিজ্ঞতালব্ধ। মূল পরিবর্তনটা করতে হবে উৎসে, অর্থাৎ যেখান থেকে পণ্যাদি পাইকারি বিক্রি করা হয়। খুচরা বিক্রেতাদের বাধ্য করতে হবে নির্দিষ্ট মুনাফার ভিত্তিতে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি। বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও আমাদের দেশে উৎপাদক কৃষক সমাজ কিন্তু কখনও ন্যায্যমূল্যের দেখা পান না। ফরিয়া, পাইকার, মজুতদার, ব্যবসায়ী প্রভৃতি নানা স্তরের লোকজন বাজারের অবস্থা নিজেদের কব্জায় নিয়ে মুনাফা লুণ্ঠনের ব্যবস্থায় অতিশয় ওস্তাদি অর্জন করেছেন। এই অসৎ ব্যবসায়ীদের ওস্তাদি বন্ধ করে দিতে হবে শক্তভাবে। ব্যবসায়ীদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে তৈরি করতে হবে যে, পরিবর্তিত বাংলাদেশে অন্যায্য ব্যবসাদারি করা যাবে না। অভ্যাসের ভিতর এই পরিবর্তনের বীজ ঢুকিয়ে না দেয়া পর্যন্ত পিচ্ছিল বাঁশের মতো এক পা উপরে উঠলে দুই পা নীচে নেমে আসবেই।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন