প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:০৩
জেলার তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট পাবলিক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয় চলাকালীন শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন বহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। শ্রেণিকক্ষে কারো কাছে মোবাইল ফোন পাওয়া গেলে তাঁকে বহিষ্কারের সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন তিনি। এ বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে সুনামগঞ্জ জেলার সফলতার নিম্নগামিতার প্রেক্ষিতে কয়েকদিন আগে শিক্ষার মানোন্নয়নে যে মতবিনিময় সভা হয়েছিলো, সেখানে অন্যান্য বহুবিধ কারণের মধ্যে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তিকে খারাপ ফলাফলের জন্য দায়ী করা হয়েছিলো। এমন অবস্থায় বাদাঘাট পাবলিক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের এই নির্দেশনাকে আমরা ইতিবাচক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করি। বিদ্যালয় কেবল শিক্ষা দানের জায়গা নয়, এখানে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলাবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, নৈতিকতা এবং দায়িত্বশীলতার শিক্ষাও দেয়া হয়। নানা কারণে ইদানিং আমাদের বিদ্যালয়গুলোর অভ্যন্তরীণ পাঠদান কার্যক্রমসহ নানা বিষয়ে অবনতি লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও শৃঙ্খলা কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। বাদাঘাট পাবলিক উচ্চবিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকবৃন্দের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকগণের দায়িত্বশীল আচরণ একান্ত প্রয়োজনীয়। অভিভাবকরা কোনোকিছু চিন্তা না করেই সন্তানের আবদার রক্ষার জন্য হাতে মোবাইল ফোন তোলে দেন। অভিভাবকরা একে সন্তানের প্রতি স্নেহ—ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মনে করেন। কিন্তু এই অন্ধ ও যুিুক্তহীন স্নেহ যে সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবন নষ্ট করতে ক্ষতিকর ভূমিকা রাখছে তা তাঁরা বুঝতে পারেন না। যেকোনো প্রযুক্তি থেকে ভালো ফল পেতে হলে ব্যবহারকারীর মানসিক উৎকর্ষতার দরকার পড়ে। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সেই মানসিক পরিপক্কতা থাকে না। ফলে এরা মোবাইল ফোনের শিক্ষামূলক ব্যবহারের চাইতে গেম ও চটকদার কনটেন্টে আসক্ত হয়ে মূল কাজ— পাঠ আত্মস্ত করার জায়গায় পিছিয়ে পড়ে।
বিদ্যালয় চলাকালীন পুরো সময় যাতে শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকে সে বিষয়ে বিদ্যালয় প্রধানদের সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের অলস বসিয়ে রাখা যাবে না। অলস বসে থাকলেই শিক্ষার্থী অন্য নেশায় আসক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। এজন্য বিদ্যালয়ের রুটিন অনুসারে প্রতিটি ক্লাস যথাযথভাবে পরিচালনার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থী যখন পাঠ কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকবে তখন সে আর মোবাইলে সময় কাটানোর কোনো অবসর পাবে না। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকদের সবচাইতে বেশি নিকটজন ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। এই বয়সের শিক্ষার্থীরা বাড়ির চাইতে অনেকক্ষেত্রে বিদ্যালয়েই স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে। আমাদের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যালয়—পরিবেশ উন্নত দেশের মতো করা যায়নি। ওই পর্যায়ে যেতে আরও বহু সময় ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দরকার হবে। তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক মনোভাব ও শিক্ষাবান্ধব দায়বদ্ধতা বজায় থাকলে ধীরে হলেও এর শুভসূচনা সম্ভব।
তবে মনে রাখতে হবে স্মার্টফোনের ভালো ব্যবহার ও আসক্তি এক জিনিস নয়। বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। গ্রামীণ বিদ্যালয় যেখানে মানসম্মত শিক্ষকের অভাব রয়েছে সেখানে ভালো শিক্ষকের ক্লাস ডিজিটাল পর্দার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিকট পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা হে্চ্ছ। এর মধ্য দিয়ে গ্রাম ও শহরের মধ্যে পাঠদানের যে প্রকট বৈষম্য তা দূর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই ধরনের ডিজিটাল শিক্ষামূলক কনটেন্ট স্মার্ট মোবাইলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিকট অনায়াসে পৌঁছে দেয়া যায়। সুতরাং মোবাইল আসক্তি এবং এর সদ্ব্যবহার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জটিও একইসাথে গ্রহণ করতে হবে। সবচাইতে বড় কথা হলো, দেশের শিক্ষার ক্ষেত্রে নানামুখী বৈপ্লবিক আলোড়ন তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যখন বুঝতে পারবে, যথাযথ শিক্ষা ছাড়া তাঁরা প্রতিযোগিতামূলক বিশে^ নিজের জায়গা করে নিতে পারবে না তখন সে নিজেই নিজেকে তৈরি করার চেষ্টা করবে। তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোবাইলের খারাপ ব্যবহারের দিকটি কমে আসবে। তবে হঠাৎ করেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন পরিবর্তন জাগানো সম্ভব হবে না। মধ্যবর্তী সময়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে টেকসই জায়গায় পৌঁছানোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। শিক্ষক—শিক্ষার্থীর আন্তঃসম্পর্ক যতো ঘনিষ্ট এবং অর্থপূর্ণ হবে ততো আমরা শিক্ষার মানোন্নয়নের জায়গায় কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন করতে পারবো। বিচ্ছিন্ন চেষ্টার দ্বারা সার্বিকভাবে স্থায়ী সুফল আশা করা সমীচীন হবে না।
বাদাঘাট পাবলিক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মহৎ উদ্দেশ্যের প্রতি আমাদের সম্মান। বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ, আপনারাও প্রধান শিক্ষকের শিক্ষাব্রতী উদ্যোগের সহযোগী হয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখুন।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন