উন্নয়ন হোক, উচ্ছেদ হোক মানবিক

প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৭

সুনামগঞ্জ—হবিগঞ্জ সড়কটি জেলার বহু মানুষের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। সড়কটি নির্মিত হলে দিরাই, শাল্লাসহ পুরো সুনামগঞ্জ এবং হবিগঞ্জের মানুষের জন্য বিকল্প সড়ক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে এ অঞ্চলের উৎপাদন, বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে— এমন প্রত্যাশা স্বাভাবিক। সুতরাং এই সড়কের প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ বা সরকারি জমি উন্নয়নকাজে ব্যবহার করার বিষয়ে মানুষের আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু উন্নয়নের স্বার্থে জমি নেওয়ার প্রক্রিয়াটি অবশ্যই মানবিক, আইনসংগত ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ মোতাবেক, শাল্লা উপজেলার কালনিরচরে সড়ক স¤প্রসারণের জন্য আটটি পরিবারের বসতভিটা উচ্ছেদের ঘটনাটি এ কারণেই উদ্বেগের। গত ৬ আগস্ট কোনো সুযোগ না দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে জায়গাটি খালি করে দেওয়া হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। এতে তাঁদের বসতঘর ভেঙে ফেলা এবং রোপিত বৃক্ষাদি কেটে ফেলার পাশাপাশি গৃহস্থালি সামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময়ও দেওয়া হয়নি। ফলে আটটি পরিবার আকস্মিকভাবে আশ্রয়হীন হয়ে মানবেতর পরিস্থিতিতে পড়েছে।

 


সরকারি প্রয়োজনে জমি নেওয়া আইনসম্মত হতে পারে; কিন্তু আইনসম্মত উচ্ছেদ মানেই মানবিকতাবিবর্জিত উচ্ছেদ নয়। বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগে দেওয়া নোটিশে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি উল্লেখ ছিল। পরে অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হাসিবুল হাসান সুনামগঞ্জের খবরকে জানিয়েছেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারি জমি থেকে ভূমিহীন পরিবার বাস্তুচ্যুত হলে পুনর্বাসনের বিধান রয়েছে। তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে কোনো পুনর্বাসন প্রকল্প না দেওয়ায় তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আগের নোটিশে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি উল্লেখ করাকে তিনি ভুল হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। সরকারি কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দেওয়া নোটিশে ক্ষতিপূরণের কথা উল্লেখ করা হলো, পরে সেটিকে ভুল বলা হলো— এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যাখ্যা কী? ভুল হয়ে থাকলে সেই ভুলের দায় কার এবং এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার প্রতিকার কী?

 

বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট করা উচিত। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো পুনর্বাসন। অধিগ্রহণ কর্মকর্তা নিজেই যখন পুনর্বাসনের বিধানের কথা স্বীকার করেছেন, তখন উচ্ছেদের আগে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় করে একটি পুনর্বাসন পরিকল্পনা করা হলো না কেন? সওজের পক্ষ থেকে পুনর্বাসন প্রকল্প না পাওয়াই যদি সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে উচ্ছেদের আগে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রয়োজনীয় আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া কি সম্ভব ছিল না? এ বিষয়ে হবিগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেনের বক্তব্যও বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব না পাওয়ায় বরাদ্দ রাখা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন। কিন্তু জেলা প্রশাসন ও সড়ক বিভাগ, উভয়ই রাষ্ট্রের পক্ষে দায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠান। একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যখন একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকে, তখন তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করাও দায়িত্বের অংশ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো নিজেরাই সড়ক নির্মাণের বিরোধিতা করছে না। লুৎফর রহমান নামের এক ভুক্তভোগী সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছেন, “সড়ক হোক, এটি আমরাও চাই।” তাঁদের আপত্তি উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়; তাঁদের কষ্ট হলো প্রতিশ্রম্নত ক্ষতিপূরণ বা আইনানুগ পুনর্বাসনের বিষয়ে কোনো স্পষ্টতা না থাকা এবং পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে ঘরবাড়ি, গৃহস্থালি সামগ্রী ও বৃক্ষাদি নষ্ট করে উচ্ছেদ করা।

 


শাল্লার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের প্রতিশ্রম্নতি দিয়েছেন— এটি আশাব্যঞ্জক। এখন সেই প্রতিশ্রম্নতির দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু সেই উন্নয়নের পথে মানুষ যেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে মানবিক বিপর্যয়ের শিকার না হয়। ধনী—গরিব নির্বিশেষে রাষ্ট্র সব নাগরিকের প্রতি দায়বদ্ধ; তবে ক্ষমতা ও সম্পদের দিক থেকে পিছিয়ে থাকা মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেশি। উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর আইনসংগত প্রতিকার ও যথাযথ পুনর্বাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। উন্নয়ন হোক অবশ্যই। তবে সেই উন্নয়ন মানুষের জন্য; মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে নয়।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার