অনিয়ন্ত্রিত এলপিজি গ্যাসের বাজার

প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৪১

বাংলাদেশের অতিশয় মুনাফামুখী বাজার ব্যবস্থা ভোক্তাদের নিত্যদুর্ভোগ বাড়ানোর একটি কাঠামো হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এই বাজারে উৎসে কোনো পণ্যের দাম বাড়ার ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথেই ভোক্তার নিকট থেকে অতিরিক্ত দাম নেওয়া শুরু হয়। তখন আগের কম দামের মজুদকৃত পণ্য বেশি দামে বিক্রি করতে ব্যবসায়ীদের বিবেকে বাঁধে না। কোনো জিনিসের দাম বাড়ার আভাস পাওয়া মাত্রই ব্যবসায়ীরা বাজারে নির্দিষ্ট পণ্যটির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখেন। কিন্তু যখন কোনো পণ্যের দাম কমানো হয় তখন বাজারে এর প্রভাব প্রায় পড়েই না। মূল্য কমানোর প্রথম কয়েকদিন আগের মজুদের দোহাই দিয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করা হয়। কিন্তু কখনো ওই পণ্যটি আর হ্রাসকৃত যথার্থ মূল্যে ফিরে আসতে দেখা যায় না। যেমন এখন এলপিজি গ্যাসের বাজারে এমন অবস্থা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, সরকার এলপিজি গ্যাসের দাম প্রতি কেজিতে এক টাকা তিন পয়সা করে কমালেও সুনামগঞ্জ ও বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার কোথাও হ্রাসকৃত মূল্যে এলপিজি কিনতে পারছেন না বলে অভিযোগ সাধারণ ভোক্তাদের। গত ২ সেপ্টেম্বর সরকার গ্যাসের মূল্য হ্রাসের এই সিদ্ধান্ত দেন। দেখা যাচ্ছে সরকার কর্তৃক দাম কমানোর ৪/৫ দিনের মাথায় এসেও কোনো ব্যবসায়ী হ্রাসকৃত মূল্যে গ্যাস তো দিচ্ছেনই না উপরন্তু গলাকাটা মূল্য ছাড়া কোনো গ্রাহক তা কিনতে পারছেন না। বাসাবাড়ির কাজে অধিক ব্যবহৃত হয় ১২ কেজির এলপিজি গ্যাস। বর্তমানে সরকার নির্ধারিত হারে ১২ কেজি গ্যাসের দাম এক হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু সংবাদতথ্য জানাচ্ছে, বাজারে এখনও ব্যবসায়ীরা এক হাজার ছয়শত ৫০ টাকা থেকে এক হাজার সাতশ’ বা তার চাইতেও বেশি দাম নিচ্ছেন। অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে এক থেকে দেড়শ’ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে ভোক্তাদের। বাজারের এই অনিয়ন্ত্রিত অবস্থা ঠেকানোর জন্য সরকারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

 

বাজার নিয়ন্ত্রণ তথা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠান ভোক্তা অধিদপ্তরও এক্ষেত্রে দায়সারা জবাব দিচ্ছে। সুনামগঞ্জের খবরকে ওই প্রতিষ্ঠানের সহকারি পরিচালক আমিরুল ইসলাম মাসুদ জানিয়েছেন, ‘ভাউচারসহ বেশি বিক্রয়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে’। অর্থাৎ তিনিও অপেক্ষা করছেন ভোক্তারা এসে অভিযোগ করবেন, এরপর তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অধিদপ্তরটির বাজার তদারকিতে স্বয়ংক্রিয় এবং নিয়মিত নজরদারির দুর্বলতাই এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়। বাজারের বাস্তব অবস্থা হলো, কোনো খুচরা বিক্রেতাই ভোক্তাকে কোনো ভাউচার বা রশিদ দেন না। ভোক্তা রশিদ চাইলে হয়তো তিনি তাঁর নিকট গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রিই করবেন না। তাহলে একজন ভোক্তা প্রমাণ হিসেবে রশিদ দাখিল করবেন কীভাবে ? 

 


এলপিজি গ্যাস এখন অপরিহার্য নিত্যপণ্য। মানুষের রান্না—বান্নার সনাতনি অভ্যাস কর্পোরেট আগ্রাসনের ফলে ইতোমধ্যে বিনষ্ট হয়ে গেছে। গ্রাম—শহরের কেউই এখন লাকড়ির চুলায় রান্না করেন না। এলপিজি গ্যাসের বাজার দেশের বড় একটি মুনাফা আহরণকারী খাত। রান্নার কাজে একসময় জ¦ালানি সাশ্রয়ী চুলার ব্যবহারও প্রচলিত ছিলো। আরও অনেক প্রকার দেশজ উপকরণ ব্যবহার করে রান্নার ব্যবস্থা ছিলো। আমাদের সেই অভ্যাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করে মুনাফা আহরণের উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। এই খাতের নিয়ন্ত্রণ নিতে বহু অসাধু তৎপরতার খবর অতীত এবং বর্তমান সময়েও বহুলশ্রম্নত। ঠিক এক বছর আগে অর্থাৎ আগস্ট ২০২৫ মাসে ১২ কেজি এলপিজি’র মূল্য ছিলো এক হাজার ২৭০ টাকা। ঠিক এক বছরের মাথায় এসে সেই ১২ কেজি গ্যাসের সরকারি মূল্য বেড়েছে ৩১৫ টাকা। মূল্যবৃদ্ধির হার প্রায় শতকরা ২৫ ভাগ। মাঝখানে এই পরিমাণ গ্যাসের দাম আরও বেশি ছিলো। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ কারিগরি ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে গ্যাসের দাম বাড়ছে। কিন্তু ভোক্তা পর্যায়ে যাতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সহনীয় পর্যায়ে থাকে, সরকারের সেই ব্যবস্থা গ্রহণ প্রত্যাশিত ছিলো। কিন্তু তা তো নেই—ই। উল্টো অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার কারণে ভোক্তাকে আরও বেশি দাম দিয়ে তা কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের নাগরিকবান্ধব নীতির প্রশ্নটি জোরালোভাবে সামনে আসে।

 
একদিকে এলপিজি গ্যাসের বাজার নিয়ন্ত্রণ যেমন জরুরি অন্যদিকে নাগরিকের জ¦ালানি ব্যবহারের এই কর্পোরেট—সৃষ্ট অভ্যাস থেকে বেরিয়ে সনাতনি এবং সাশ্রয়ী ব্যবস্থায় ফিরে যেতে সরকারকে অধিকতর তৎপরতা চালাতে হবে। সাধারণ মানুষের আয় গত এক বছরে বাড়েনি। তাহলে এলপিজি গ্যাসসহ বহুবিধ পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ মানুষ কীভাবে সামলাবেন ? এই প্রশ্নে রাষ্ট্র ও সরকারকে মানুষের পাশেই থাকতে হবে।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার