প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৪
পুলিশের উদ্যোগে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানে ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা বসানো হয়েছিলো ৫ বছর আগে, ২০২১ সনে। তখন প্রায় দেড় শ’র মতো ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিলো। এতে শহরের ভিতরে চুরি, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধ নজরদারির সক্ষমতা বেড়েছিলো, ফলত তখন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অপরাধ নিয়ন্ত্রিত ছিলো বলে অনেকেই বলে থাকেন। ৫ বছরের মাথায় এসে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেলো ্ওই ক্যামেরাগুলোর একটিও এখন আর সচল নেই। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সবগুলো ক্যামেরাই এখন নিষ্ক্রিয়। ক্যামেরাগুলো স্থাপনের পর এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে কোনো চিন্তা করা হয়নি, এজন্য কোনো কাঠামোও দাঁড় করানো হয়নি। ফলে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে স্থাপিত সিসি ক্যামেরার সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন শহরবাসী। শহরে সাম্প্রতিক সময়ে চুরি বেড়ে গেছে। সিসি ক্যামেরা না থাকা চোরচক্রের বেপরোয়াত্ব বাড়াতে সাহায্য করে বলে মনে করেন আইন—শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা। সিসি ক্যামেরাকে নিরব পাহারাদার আখ্যায়িত করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ক্যামেরায় আছে স্বয়ংক্রিয় সতর্কসংকেত বাজানোর ব্যবস্থা। কিছুদিন আগে শহরের কালীবাড়ির একটি জুয়েলারি দোকানে যখন চুরি হয় তখন বাসায় থাকা মালিক মোবাইলে সতর্কসংকেত পেয়ে দ্রুত দোকানে চলে আসায় ওই চুরি আটকানো সম্ভব হয়েছিলো। শহিদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবরিক লাইব্রেরিতেও সিসি ক্যামেরা ছিলো। ধুরন্ধর চোর তাই প্রথমেই ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার (ডিভিআর) নষ্ট করে ফেলে। এই ক্যামেরায় অবশ্য সতর্কসংকেত ব্যবস্থা ছিলো না। ফলে পাঠাগারের ভিতর থেকে মূল্যবান সামগ্রী চুরি হলেও পাঠাগারের ক্যামেরা থেকে কোনো ক্লু পাওয়া সম্ভব হয়নি। শহরের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের স্থাপিত দেড় শ’ সিসি ক্যামেরার দৃশ্য নজরদারি ব্যবস্থা ছিলো সুরক্ষিত স্থানে। ওই জায়গা থেকে ক্যামেরার ভিডিও মুছে ফেলা বা ডিভিআর মেশিন নিষ্ক্রিয় করা চোরদের দ্বারা কস্মিনকালেও সম্ভব হতো না। তাছাড়া সিসি ক্যামেরা সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে রাখা হতো। চোররা যখন জানতো তাদের গতিবিধি রয়েছে পুলিশের নজরদারিতে, তখন নিশ্চয়ই তারা নির্ভীক চিত্তে চৌর্যবৃত্তিতে লিপ্ত হতে দশবার ভাবতো। এখন শহরের সিসি ক্যামেরাগুলোর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। প্রযুক্তি তৈরি হয় মানবকল্যাণের জন্য। কিন্তু আমরা যদি প্রযুক্তির এই সহায়তা গ্রহণ করতে অপরাগ হই তাহলে দিনশেষে নিজের চুল নিজে ছিড়া ছাড়া করার আর কিছু থাকে না।
আমাদের জাতীয় ব্যাধি হলো, উন্নয়ন কাজের রক্ষণাবেক্ষণ, তদারকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা। শহরের সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি যদি এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের নিয়মিত ব্যবস্থা থাকতো তাহলে এখন শহরকে প্রাযুক্তিক পাহারাদারির বাইরে থাকতে হতো না। কেবল এই সিসি ক্যামেরার ক্ষেত্রে নয়, প্রতিটি উন্নয়ন কাজের দিকে নজর দিলেই এই সীমাবদ্ধতা বুঝা যায়। অথচ রক্ষণাবেক্ষণ কাজ খুব বেশি খরচের বিষয়ও নয়। সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক থাকলে এই ক্যামেরাগুলো সচল রাখা কঠিন ছিলো না। এখন যখন সবগুলো ক্যামেরা অচল হয়ে গেছে, তখন শহরে অপরাধ বাড়ার পিছনে এই বিষয়টিকে কাজে লাগানো হচ্ছে। আমাদের প্রশ্ন হলো, গত ৫ বছর যাবৎ ধীরে ধীরে যে ক্যামেরাগুলো নষ্ট হওয়া শুরু করেছে তা নজরে আসলো না কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ?
তবে মূল কথা হলো শহরকে আধুনিক প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতাসম্পন্ন সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে আনা প্রয়োজন। নতুন করে এই কাজটি দ্রুত শুরু করতে হবে। এক্ষেত্রে পুলিশ, সুনামগঞ্জ পৌরসভাসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বহু এনজিও আছে যারা এরকম জনকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত। শহরের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সহায়তাও নেয়া যেতে পারে। আমাদের মনে হয়, সমন্বিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে পুনরায় পুরো শহরকে সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না। তবে আসল সমস্যা হবে এগুলোর নিয়মিত তদারক, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জায়গায়। এই কাজের জন্য প্রতিষ্ঠানবিশেষকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। সুনামগঞ্জ পৌরসভাকে এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণের জন্য আমরা অনুরোধ জানাই। শহরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এ কাজ শুরু করতে হবে। অপরাধী যখন বুঝবে সে কোনো না কোনোভাবে সতর্ক প্রহরায় রয়েছে তখন সে অপরাধ করার দুঃসাহস দেখাবে না। অপরাধীকে অপরাধকর্ম থেকে নিবৃত্ত রাখার আগাম ব্যবস্থা সর্বাবস্থায় উত্তম। এই সিসি ক্যামেরাকে কেবল অপরাধ দমন নয় বরং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, যানজট অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণসহ নানাবিধ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন