প্রকাশিত: ০৯ অক্টোবর, ২০২৪ ০৭:২৬
আজ মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। আগামী পাঁচদিন ঢাক, ঢুল, কাঁসর, ঘণ্টা, উলুধ্বনি আর পুজাচারের মধ্য দিয়ে শত্রুবিনাশিনী কল্যাণময়ী দেবী দুর্গার আরাধনা করবেন বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়। সমগ্র মানবজাতির শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দেবীর বর প্রার্থনা করবেন ভক্তবৃন্দ। মহাদশমীতে দেবী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই সামাজিক-ধর্মীয় উৎসব। দেবী দুর্গাকে অশুভ শক্তির বিনাশক ও শুভ শক্তির রক্ষক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মূলত মানব সমাজ সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই শুভ আর অশুভ এই দুই পরষ্পরবিরোধী শক্তির অবস্থানকে নিয়েই অগ্রসর হয়েছে। শুভবোধসম্পন্ন মানব জাতি অশুভ প্রবণতাকে দূর করেই সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছে। শুভ ও অশুভের এই দ্বন্দ্ব আজও চলমান। তাই পৌরাণিক দেবী দুর্গার নিকট দেশের সকল হিন্দু সম্প্রদায় সব ধরনের অমঙ্গল, অকল্যাণ আর অনাচারের পরাভব ঘটিয়ে সত্য, সুন্দর ও শুভবোধের বিজয় কামনা করবেন। শ^াশ^ত এই কামনা মূলত সমগ্র মানবজাতির অন্তর্গত আকাক্সক্ষাকেই ধারণ করে। বিশ^ব্যাপী আজ যে অশান্তির আগুন, যুদ্ধের দামামা, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই; তা সে প্যালেস্টাইন হোক বা ইউক্রেন অথবা লেবানন হয়ে ইরান, সর্বত্র শান্তির বাতাবরণ তৈরি হওয়ার সর্বমানবিক আকাক্সক্ষার প্রেক্ষিতে হিন্দুসম্প্রদায়ের আরাধনা আজ এক কাতারে এসে মিলে গেছে। শ^াশ^ত শুভবোধের জয় হোক। সকলকে আমাদের শারদীয় শুভেচ্ছা।
বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকার এই প্রথমবারের মতো দুর্গাপূজা উপলক্ষে একদিন ছুটি বাড়িয়েছেন। বৃহস্পতিবার ছুটি ঘোষণার বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার কথা শুনেছি আমরা। বৃহস্পতিবার থেকে রবিবার পর্যন্ত টানা চারদিন এবার সরকারি ছুটি। সুতরাং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য এবারকার দুর্গোৎসব অনেক বেশি আনন্দময় ও উৎসবমুখর এবং অংশগ্রহণমূলক হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে। বরাবরই হিন্দুরা দুর্গাপূজা উপলক্ষে ছুটি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু অতীতের কোনো সরকারই এই দাবি আমলে নেন নি। অন্তবর্তী সরকার এই দাবিতে সাড়া দিয়ে নিশ্চিতভাবেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিকট সবিশেষ কৃতজ্ঞতাভাজন হলেন। আমরাও এমন সুন্দর সিদ্ধান্তের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। মূলত মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান প্রভৃতি ধর্মের লোকজন, পাহাড়ি-বাঙালি-আদিবাসী মিলেই এই অনুপম বাংলাদেশ। বৈচিত্রের মধ্যে যে অপার সৌন্দর্যবোধ তার সকল উপাদান বাংলাদেশে বিদ্যমান। বৈচিত্রময় এই সৌন্দর্যকে অমলিন মাধুর্যে রাঙিয়ে তুলাটাই এই দেশের আপামর মানুষের চাহিদা। মাঝে-মধ্যে এই জায়গায় বিভেদ-বিভাজন, হিংসা ও দ্বেষের যে বৈসাদৃশ্য আমরা দেখতে পাই তা মূলত উদার বাংলাদেশের আসল চেহারা নয়। এই বাংলাদেশের আসল চেহারা হলো বহুর মধ্যে ঐক্য স্থাপন এবং সব মত ও পথের মানুষকে নিয়ে একসাথে চলা। আমরা এই গণআকাক্সক্ষার জয়যুক্তি কামনা করি সর্বাবস্থায়।
প্রশাসন থেকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যেমন নামাজের সময় বাদ্যবাজনা ও মাইক বন্ধ রাখা, উচ্চশব্দ তৈরিকারী যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ রাখা, বিজাতীয় সঙ্গীতের পরিবর্তে ভক্তিমূলক সঙ্গীত পরিবেশন, আতশবাজি ও পটকা ফুটানো থেকে বিরত থাকা; পূজার সাত্ত্বিক পরিবেশের জন্য এইসব বিধি-বিধান অবশ্যই মেনে চলা উচিৎ। আমরা আশা করবো কোনো পূজাম-পেই প্রশাসন নির্দেশিত নিয়মের বাইরে যেয়ে এমন কিছু করা হবে না যা পূজার পবিত্রতা বিনষ্ট করে। আমরা বিশ^াস করি ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। এর নিহিতার্থ হলো যেকোনো আয়োজনের ধর্মীয় অনুষঙ্গ বাদ দিয়ে অন্য যে আনন্দ-আয়োজন তা মন ভরে উপভোগ করা। পূজায় দল বেঁধে কারুম-িত ম-প ও প্রতিমা দর্শন, ঘুড়ে বেড়ানো, ভাব-বিনিময় এমনসব সামাজিক অনুষঙ্গ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সহায়তা করে। আর নতুন বাংলাদেশে এখন সকল নাগরিকের মধ্যে ঐক্য স্থাপনেরই নিরন্তর চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সকল নাগরিকের কল্যাণ হোক, শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে আমাদের এই কামনা।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন