প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর, ২০২৪ ২১:৫৭
ধর্মপাশা সরকারি ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থীদের পাওনা আদায়ের রশিদে কৃষি ব্যাংকের স্থানীয় শাখার সিল স্বাক্ষর জাল করে ২ লাখ ৪২ হাজার ২৮০ টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। কলেজের তিনজন শিক্ষকের সমন্বয়ে গঠিত এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির তদন্তে এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন কমিটির পক্ষ থেকে পুনরায় তদন্তের জন্য সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এদিকে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের কাছেও এ প্রতিবেদন জমা দিতে চায় তদন্ত কমিটি। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তা গ্রহণ করেননি। ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর এ গঠিত তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। কমিটিকে পরবর্তী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিদবেদন জমা দিতে পারেনি। তবে এতোদিন পরে কেন বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এদিকে গত রোববার বিকেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্তের জন্য এসিল্যান্ডকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহবুবুল কবির ও উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র পাল।
ধর্মপাশা সরকারি ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থীদের ভর্তি, পুনঃ ভর্তি, পরীক্ষার ফি, সেশন ফিসহ সকল পাওনা আদায়ের কার্যক্রম কৃষি ব্যাংকের ধর্মপাশা শাখায় ২৫৩০ নং একাউন্টে পরিচালিত হয়। ২০২২ সালের অক্টোবরে একাদশ শ্রেণির রেজুয়ান নামে এক শিক্ষার্থী কলেজের বকেয়া পরিশোধ না করে কলেজে বর্ষ পরিবর্তন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। ওই সময় হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন রেজুয়ানকে বকেয়া পরিশোধের জন্য বললে রেজুয়ান জানায়, সে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর সূবর্ণা আক্তারের কাছে টাকা জমা দিয়েছে। পরে সূবর্ণা আক্তার মমতাজ উদ্দিনের কাছে রেজুয়ানের রশিদ জমা দেন। কিন্তু রশিদটি দেখে মমতাজ উদ্দিনের সন্দেহ হলে তিনি রশিদটি নিয়ে স্থানীয় কৃষি ব্যাংকে যান এবং জানতে পারেন রশিদে ব্যবহৃত সিল স্বাক্ষর জাল। পরে তিনি বিষয়টি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রয়াত আব্দুল করিমকে অবগত করেন। ওই সময় ব্যাংক একাউন্টে শিক্ষার্থীদের জমাকৃত টাকা ও জমার রশিদের মধ্যে গড়মিলের বিষয়টি সামনে আসে। তখন কলেজের হিসাবরক্ষক মঞ্জিল মিয়ার কাছে জমা থাকা শিক্ষার্থীদের সন্দেহজনক ১৫৮টি রশিদ (কলেজের অংশ) সংগ্রহ করা হয়। যার মাধ্যমে ব্যাংকে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৮০ জমা হওয়ার কথা। পরে ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আব্দুল করিম বিষয়টি তদন্তের জন্য হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন, গণিত বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক বিমান কুমার তালুকদার এবং ব্যবসায় উদ্যোগ ও ব্যবস্থানা বিষয়ের প্রভাষক নীহার রঞ্চন দেবনাথকে দায়িত্ব দেন। তাদেরকে পরবর্তী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলে বলা হয়। ওই সময়ই তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে যাচাইয়ের জন্য ১৫৮টি রশিদ প্রেরণ করেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ রশিদগুলো যাচাই করে গত বছরের ১ অক্টোবর তদন্ত কমিটিকে জানায়, ১৫৮টি রশিদের মধ্যে ৭টি রশিদের মাধ্যমে ব্যাংকে ৫ হাজার ৬০০ টাকা জমা হয়েছে এবং বাকি ১৫১টি রশিদে ব্যাংকের সিল ও স্বাক্ষর জাল করা করা হয়েছে। যার মাধ্যমে ২ লাখ ৪২ হাজার ২৮০ টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় ওইসব রশিদে। ব্যাংক থেকে দেরিতে তথ্য পাওয়া, অধ্যক্ষ আব্দুল করিমের মৃত্যু ও দেশের চলমান পরিস্থিতির কারণে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে দেরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটি।
তদন্ত কমিটির প্রধান মমতাজ উদ্দিন বলেন, গত ২৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন ইউএনওর কাছে জমা দিয়েছি। রেজুয়ানের রশিদ সূবর্ণা আমাকে দিয়েছিল। তাই সন্দেহ হওয়ায় রশিদটি ব্যাংকে নিয়ে গিয়ে দেখি তা জাল করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে রশিদে উল্লেখিত নামের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছি। ওই শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, তারা কলেজের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর সূবর্ণা আক্তার, অফিস সহায়ক পারভেজ আহমেদ এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক সৈয়দ জিয়াউল হকের কাছে টাকা জমা দিয়েছে। প্রশাসনিক তদন্ত করলে ব্যাংকের সিল স্বাক্ষর কে জাল করেছেন তা বেরিয়ে আসবে।
কলেজের হিসাব রক্ষক মঞ্জিল মিয়া বলেন, একটি রশিদের তিনটি অংশ- ব্যাংকের, কলেজের এবং শিক্ষার্থীর। কলেজের বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বকেয়া আদায় করা হয়। শিক্ষার্থীরা কলেজ থেকে রশিদ সংগ্রহ করে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে শিক্ষার্থীর অংশটি তাদের কাছে রাখা ও কলেজের অংশটুকু ব্যাংক কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে সংগ্রহের নিয়ম রয়েছে। ওই ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীই বকেয়া আদায় কমিটির কাছে ব্যাংকের অংশ জমা দিতো। পরে ওই কমিটি আমাকে রশিদ বুঝিয়ে দিতো। ফলে এমনটি ঘটেছে।
সূবর্ণা আক্তার বলেন, অনেক সময় আগের কথা। শিক্ষার্থীরা টাকা জমা দিলে কলেজের অফিস সহায়ক বা অন্য কারও মাধ্যমে ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। এমনটি ঘটেছে তা আমার জানা নেই। আর পারভেজ আহমেদ বলেন, বিষয়টি আমি জানি না।
তবে প্রভাষক সৈয়দ জিয়াউল হক বলেন, আমি বরং শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করি এবং নিয়মিত কলেজে থাকি। অনিয়মিতদের নিয়ে কথা বলায় অনেকের মধ্যে জেদ আছে। তাই আমাকে সমাজে হেয় করার জন্য এমন অভিযোগ আনা হয়েছে। কোন শিক্ষার্থী কার কাছে টাকা জমা দিয়েছে তা এতোদিন মনে রাখলো কীভাবে? আর এতোদিন পর কেন বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে তা এক বিরাট প্রশ্ন। সঠিক তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসবে।
ধর্মপাশা সরকারি ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ তালুকদার বলেন, তদন্ত কমিটি ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল। সাবেক অধ্যক্ষ প্রায় ৬ মাস পর মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তদন্ত কমিটি অতিরিক্ত সময় গ্রহণ করেনি। আর বিষয়টি আমার সময়ের নয়। তাই তা গ্রহণ করিনি।
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দীন বলেন, বিষয়টি তদন্তের জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে জরুরিভিত্তিতে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন