প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৪ ০৭:০৪
মধ্যনগর উপজেলা ভারত সীমান্ত ঘেঁষা দুর্গম হাওর অঞ্চল। সীমান্তের বিভিন্ন রুটে ব্যাপকভাবে সক্রিয় রয়েছে চোরাচালান চক্র। কারণ গ্রাম, পাড়া, মহল্লায় গিয়ে সীমান্তরক্ষী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে এ ব্যাপারে তৎপরতা চালানো অসম্ভব। অপরদিকে পুলিশ প্রশাসনের নড়বড়ে অবস্থা। এমন সময় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের সরিয়ে দেওয়া হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যূনতম নিরাপত্তাটুকুও আর থাকবে না— এমনটাই বলছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য, স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের জনপ্রশাসনের সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বোঝাপড়া সাবলীল বা সহজ নয়। ইউপি চেয়ারম্যানরা না থাকলে আকস্মিক ও গুরুতর কোনো ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণে কোনো অভিভাবক থাকবে না। উপজেলা পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা এখন আর নেই। সে ক্ষেত্রে সাধারণের মুখপাত্র হিসেবে প্রশাসন বা রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থানীয়দের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করার ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের সহায়তা শূন্যের কোটায় গিয়ে ঠেকবে, যা উদ্বেগজনক।
সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের অপসারণের বিষয়টি আলোচনায় আসায় এ নিয়ে আরও বেশি উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, এমনটা হলে থমকে যাবে গ্রামীণ উন্নয়ন। বাড়বে সহিংসতা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। অনেকেই মনে করছেন, দৈনন্দিন জন্ম—মৃত্যু নিবন্ধনসহ অন্য যে কাজগুলো দৈনন্দিন করতে হয়, সেগুলোতে জনদুর্ভোগ ও গ্রামীণ পর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রম থমকে যাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মধ্যনগর উপজেলা প্রশাসনে কর্মরত প্রথম শ্রেণির এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের উপজেলা প্রশাসনের সকল বিভাগের গৃহীত জনস্বার্থ সম্পর্কিত কাজের ফলাফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছানোর অন্যতম সহায়ক শক্তি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণ। তাদের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের বিভিন্ন দপ্তর বা বিভাগের কর্মকর্তাগণ স্ব—স্ব বিভাগীয় কার্যক্রম মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে নানান প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হবে। তাদের অপসারণ করলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়বে।
মধ্যনগর উপজেলার বিচার বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হয় ধর্মপাশা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। সেখানকার সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল হাই বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে চেয়ারম্যানদের। চেয়ারম্যানরা গ্রাম আদালতের বিচারিক ক্ষমতা থাকায় ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের অনেক মামলা গ্রাম আদালতে নিষ্পত্তির জন্য প্রেরণ করা হয়। চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতে এসব মামলা নিষ্পত্তির সহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন। দেশের বর্তমান অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার জন্য চেয়ারম্যানদের আবশ্যকতা রয়েছে। এ মুহূর্তে তাদের অপসারণ করা হলে স্থানীয় পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা ঘটতে পারে।
মধ্যনগর থানায় কর্মরত একজন উপ—পুলিশ পরিদর্শক জানান, প্রতিটি ইউনিয়নে আইন—শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রথমেই ইউপি চেয়ারম্যানের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে এই দুর্গম হাওর এলাকায় আইন—শৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের সহযোগিতা না থাকলে পুলিশী কার্যক্রম পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি, চোরাচালানও মাদকের অপব্যবহার হ্রাসকল্পে ইউপি চেয়ারম্যানদের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। তাই দেশের চলমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি তাদের কার্যক্রম গতিশীল রাখতে হবে।
মধ্যনগর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সঞ্জীব রঞ্জন তালুকদার টিটু জানান, প্রান্তিক লেভেলের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ। আমরা সামাজিক যেসব বিচার বৈঠক করে থাকি, তাতে বিচার বিভাগ ও পুলিশ প্রশাসনের সিংহভাগ চাপ কমে যায়। গ্রাম আদালতে পারিবারিক নানা ইস্যুর সমাধান করা হয় সহজে। এসব কার্যক্রম চলমান থাকা জরুরি। এ মুহূর্তে যদি ইউনিয়ন পরিষদ ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট ছাত্র—জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক জায়গায় ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আক্রোশের কারণে কিংবা নির্বাচনী প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার অসৎ উদ্দেশ্যে ইউপি চেয়ারম্যান বা মেম্বারকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় আসামী করার সুযোগ নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হয় সেজন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। তবে কেবলমাত্র যাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সুষ্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে তাদেরকে ছাড়া বাকিদের কাজের ক্ষেত্র সহনশীল করা আবশ্যক।
বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরনবী তালুকদার জানান, সাধারণ মানুষের যে ঘনিষ্ঠতা আমাদের সঙ্গে রয়েছে, সেটা প্রশাসনের অন্য কোনো পর্যায়ে হয় না। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি জনপদের সালিশ বিচার ও অপরাধ দমনে ইউনিয়ন পরিষদের সক্রিয়তা আবশ্যক। ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকি আমরা। এভাবে আমাদের অপসারণ করা মানে তৃণমূলের মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া।
বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব শামীম আহমেদসহ একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ সচিবদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, জন্ম—মৃত্যু নিবন্ধন সহ বিভিন্ন প্রকার সনদ প্রদান, উত্তরাধিকার সনদ, জমিসংক্রান্ত জটিল সমস্যা, স্বামী— স্ত্রীর বিবাদ, পারিবারিক বিরোধ গ্রাম্য আদালতে ও সামাজিক সালিশ বিচারে চেয়ারম্যানগণের মুখ্য ভূমিকায় নিষ্পত্তি হয়। যদি চেয়ারম্যানদের অপসারণ করা হয়, তাহলে এগুলো সামাল দেওয়া অসম্ভব।
বয়োজ্যেষ্ঠ সালিশী ব্যক্তিত্ব ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান তালুকদার জানান, বর্তমান সময়ে এলাকায় দাঙ্গা—হাঙ্গামা বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনিতেই প্রতিদিন বিচার সালিশ করেই চেয়ারম্যানদের দিন চলে যায়। এমতাবস্থায় চেয়ারম্যানদের সরিয়ে দিলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটবে।
উপজেলা রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বংশীকুন্ডা কলেজের প্রভাষক সোনিয়া খানম বলেন, স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে প্রাচীন প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ। একজন চেয়ারম্যান এই প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে তিনি একাধারে সরকারের তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসনের সকল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনকারী, আবার একই সাথে সামাজিক নেতা। তাই চেয়ারম্যানের শূন্যতা যে কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে প্রশাসক নিযুক্ত করলে পূরণ হবে না।
তিনি আরও বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের সব কাজের কেন্দ্রবিন্দু চেয়ারম্যান। এক কথায় উন্নয়ন, রাজস্ব, প্রশাসনসহ ইউনিয়নের সব ধরনের কাজ তদারক করার দায়িত্ব তাদের। এই স্থানটা আকস্মিক শূন্য হয়ে গেলে পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে পড়বে।
স্থানীয়রা বলছেন, গত সরকারের সব নির্বাচন অবৈধ হলে বর্তমান সরকারের আমলে সেই অবৈধ নির্বাচনের একজন প্রার্থীকে কীভাবে একটি সিটি করপোরেশনের বৈধ মেয়র ঘোষণা করা হয়। তাদের চেয়ে ইউপি প্রতিনিধিদের জনসম্পৃক্ততা আরও অনেক বেশি। তাদের জন্য কি আলাদা আইন করা ঠিক হবে?
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জনাশিউস এর নির্বাহী চেয়ারম্যান সাজেদা আহমেদ বলেন, এই দুর্গম অঞ্চলে উন্নয়ন ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অপসারণ করা হলে শুধু হাওরাঞ্চলে নয় সারা দেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উন্নয়ন ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন