প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৪ ০৭:১২
ছোটগল্পে যিনি সমাজের কুসংস্কার, ধর্মীয় ভন্ডামি, মানসিক ও চারিত্রিক স্থলন ইত্যাদিকে তুলে ধরেছেন নিপুণভাবে তিনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ।
জগদীশ গুপ্ত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অগ্রজদের কাছ থেকে পাঠ গ্রহণ করলেও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বিষয়, কাঠামো ও ভাষা—ভঙ্গিতে নতুন এক ধরনের জন্ম দিয়েছেন আপন বৈশিষ্ট্যে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ শুধু ঔপন্যাসিক হিসেবেই নন, ছোটগল্প রচয়িতা হিসেবে রেখেছেন অসামান্য অবদান ।
বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ হলেন এমনই এক অনন্য স্থপতি, যাঁর স্থাপত্যকর্ম যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনই স্থাপন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত উপভোগ্য। তাঁর ছোটগল্প একইসাথে দাবি করে মনোযোগ। কোনও একটিকে বাদ দিলে ঠিক আস্বাদ মেলে না। তাই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গল্পের পুনঃকথন সম্ভব হয় না। সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায় না, প্রতিটি শব্দ পড়তে হয়। গল্পের ভেতরের মূল অংশকে তেমন করে আলাদা করা যায় না। আবার নির্মাণভঙ্গিমাটিকে আলাদাভাবে দেখতে চাইলেও গল্পের প্রাণটি নষ্ট হয়। ওয়ালীউল্লাহর গল্প মানে তাই আগাগোড়া পাঠ এবং সচেতন পাঠ।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামের ষোলশহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা নাসিম আরা খাতুন ছিলেন চট্টগ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী বংশের সন্তান এবং পিতা সৈয়দ আহমদউল্লাহ ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। মৃত্যুবরণ করেন ১০ অক্টোবর ১৯৭১ সালে।
বাংলা ছোটগল্প নদীর ে¯্রাতের মতো বহমান। সেই চলমান ধারায় বিকশিত হয়েই এক একজন ¯্রষ্টা ে¯্রাতপথকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন সামনের দিকে। ভাষা নির্মাণশৈলীর পরীক্ষা নিরীক্ষায় কখনও বা বাঁক নিয়েছেন, কিন্তু আসল ে¯্রাতে ভাটা পড়েনি কখনও। শুধু পরিমাণে পরিসরে নয়, বৈচিত্র্যে গভীরতায় সর্বদা ব্যাপ্ত যে সৃষ্টি, মাঝেমধ্যেই স্বকীয়তায় অনন্য হয়ে উঠেছেন তার ¯্রষ্টা লেখকগণ। গঠনবিন্যাস পদ্ধতির সঙ্গে মিলেমিশে যায় নির্মাণ বা সৃষ্টি। গাঁথুনি যেমন দর্শনীয় হয়ে ওঠে, কেমন করে গাঁথছেন সেই অভাবিত সৌন্দর্যেও মগ্ন হতে হয়।
মাত্র পঞ্চাশ বছরের জীবন এবং প্রায় তিন দশকের লেখালেখি। গল্প দিয়ে শুরু করলেও পরে লিখেছেন উপন্যাস, নাটক। সাহিত্যজীবনের প্রথম দেড় দশকই মূলত তাঁর গল্প লেখার কাল। পরবর্তীতে মগ্ন হয়েছেন উপন্যাসে দারুনভাবে। সব মিলিয়ে ৫৩টি গল্প লিখেছেন। জীবনের প্রথম গ্রন্থটিই ছিল গল্পগ্রন্থ ‘নয়নচারা’। প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে পূর্বাশা প্রকাশনী থেকে। লেখকের “দুই তীর ও অন্যান্য গল্প” প্রকাশিত হয় দু’দশক পরে ১৯৬৫ সালে। দুটি গল্পগ্রন্থে সংকলিত গল্পের সংখ্যা ৮ ও ৯ মিলিয়ে মোট ১৭। বাদবাকি সব গল্পই অগ্রন্থিত থেকে যায় দীর্ঘকাল। ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ গ্রন্থাবলী। পূর্ববর্তী ১৭টি গল্প ছাড়াও এ গ্রন্থাবলীতে আরও ৩২টি গল্প সংকলিত হয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত আরও ৪টি গল্প পরে পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ‘গল্পসমগ্র আপাতত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গল্পের এক পূর্ণাঙ্গ সংকলন বলা যায়।’ ওয়ালীউল্লাহ্—র প্রথম গল্প ‘নয়নচারা’ প্রকাশিত হয় পূর্বাশা পত্রিকায়। সে—সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পঞ্চাশের মন্বন্তরের কালো ছায়া সারা বাংলা জুড়ে। যুদ্ধ অনাহার ও মৃত্যুর পটভূমিকায় ‘নয়নচারা’ ছাড়াও তিনি পরপর লিখেছেন ‘মৃত্যু—যাত্রা’, ‘রক্ত’। সমকালীন পটভূমিতে তরুণ ওয়ালীউল্লাহর অন্তর্গত রক্তক্ষরণই অনুভবের অনন্য কোমল ছোঁয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। ভিটেছাড়া ঘরছাড়া মানুষের বুকের ভেতরের সবটুকু ‘জমিন’ কেড়ে নিয়ে তাকে ছিবড়ে হাভাতে ভিখিরি করে তোলে যুদ্ধ ও মন্বন্তর। আর কিছু নয়, চেয়েচিন্তে যে কোনওভাবে উদরপূর্তিই যার একমাত্র চাহিদা বলে সাধারণের বিশ্বাস, সেখানে ওয়ালীউল্লাহ্ শুরু করেন এভাবে ———
“ঘনায়মান কালো রাতে জনশূন্য প্রশস্ত রাস্তাটাকে ময়ুরাক্ষী নদী বলে কল্পনা করতে বেশ লাগে।”
খিদে নয়, খিদের তাড়নে হা—অন্ন মানুষটির অন্তর্দেশ জুড়ে হারানো মাটি হারানো জীবনের হাহাকার। এও এক খিদে, যার তৃপ্তি নেই দু’মুঠো ভাতে। ফ্যানভাতের সন্ধানী মানুষটির আকাঙক্ষা আসলে সেই মাটি এবং মা টি। ময়ূরাক্ষী নদীকে ছুঁয়ে যে গ্রাম ‘নয়নচারা’, মাটিলগ্ন যে জীবন, পায়ে পায়ে তারই নিরন্তর অনুসন্ধান। খিদে নয়, তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় স্মৃতি। “সুড়ঙ্গের মতো গলা বেয়ে তীক্ষ তীব্র আর্তনাদের পর আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে লাগল, আর সে থরথর করে কাঁপতে লাগল আপাদমস্তক।” অবশেষে “কে একটা মেয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল, এসে অতি আস্তে—আস্তে অতি শান্ত গলায় শুধু বলল: নাও।” ভাত পেল সে। “ত্রস্ত ভঙ্গিতে ময়লা কাপড়ের প্রান্ত মেলে ধরে সে ভাতটুকু নিল, নিয়ে মুখ তুলে কয়েক মুহূর্ত নিম্পলক চোখে চেয়ে রইলো মেয়েটির পানে।” যেন বহুকালের চেনা এই মুখ। নয়নচারা গ্রামে ভাতের থালা সাজিয়ে অপেক্ষা করে যে জন, এ তো সেই মুখ। চকিতে কি ভেসে ওঠে মা—র ভাত বেড়ে দেওয়ার চিরকালীন অমৃত বৈভবাদৃশ্য? রান্নাঘর আসনপিড়ি আস্ত সেই উঠোন? আচলে ভাতটুকু নিয়ে মাটি—সন্ধানী সে সন্তান কাঙ্গালের আকুতিতে বলে ওঠে : “নয়নচারা গায়ে কী মায়ের বাড়ি?
বহির্বাস্তব পরিবেশ পরিস্থিতি সময়ের সঙ্গে পা ফেলে ওয়ালীউল্লাহ্ খনন করে চলেন মানবভূমি।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ যখন কলম ধরেন, তখন বাংলা গল্প অতিক্রম করেছে প্রায় পাঁচ দশকের পথ। ভাব—ভাষা ও নির্মাণশৈলীতে ক্রমশ ফুটে উঠছে তার বৈচিত্র্য। ততদিনে কল্লোল যুগের লেখকজনেরা তাঁদের কথা—বৈচিত্র্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। কলম ধরেছেন ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। দ্রুত বদল ঘটে চলেছে গল্পের চেহারায় আঙ্গিকে এবং অবশ্যই বিষয়ে ও ভাবে—ভাষায়। বাংলা ছোটগল্পে উঠে আসতে থাকে সাধারণ প্রান্তিক মানুষ ও তার মানসভূমি। এই অনুসন্ধানেই একে একে নিয়োজিত হলেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, বিমল কর, সমরেশ বসু, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সন্তোষকুমার ঘোষ এবং আরও অনেকের সঙ্গে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। ‘নয়নচারা ' গল্পে যে—সূচনা, তাতে জগদীশ ও মানিকের ধারা—প্রভাব কিছুটা স্পষ্ট হলেও অল্প কয়েকটি রচনাতেই নিজস্ব স্বতন্ত্রতার প্রমাণ রাখলেন ওয়ালীউল্লাহ্। “সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সর্বসময়ের এক শ্রেষ্ঠ বাঙালি লেখক— গল্পকার ঔপন্যাসিক ও নাট্যরচয়িতা। এর মধ্যে তাঁর গল্পকার ও ঔপন্যাসিক পরিচয় বিশেষ মহত্ত্ব ও স্বাতন্তে্র্য চিহ্নিত..।” গল্প তো নয়, যেন আত্মজ। প্রকাশের পরও চলতে থাকে অদলবদল পুনর্লিখন। একটি লেখা নিয়ে কত অতৃপ্তি। লেখার প্রতি কতখানি ভালোবাসা, নিয়ত পূর্ণাঙ্গভাবে ধরবার চেষ্টা। লেখার প্রতি পরম মমতা ও নিষ্ঠাই লেখক ওয়ালীউল্লাহ্র মূল সাফল্য । লেখক নিজেই তাঁর গল্পের পাঠক এবং চুলছেড়া বিশ্লেষক । ‘নয়নচারা’ প্রকাশের কয়েক বছর পর মোটামুটি ১৯৪৯ সাল থেকেই গল্প রচনায় লেখকের মনোযোগ কমে আসে। লেখক মন দাবি করে আরও পরিসর ও ব্যাপ্তি। মনোযোগী হয়ে ওঠেন উপন্যাসে ও নাটকে। প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশের প্রায় দু—দশক পরে সংকলিত হয় দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘দুই তীর ও অন্যান্য গল্প’। এ গ্রন্থের ভূমিকাতেই প্রকাশিত হয় নিজের গল্প নিয়ে লেখকের অতৃপ্তি ও পরিচর্যার দৃষ্টিভঙ্গি: “পূর্ব—প্রকাশিত গল্পগুলি এ সঙ্কলনের জন্য ঘষামাজা করেছি, নাম বদলেছি, স্থানে স্থানে লেখকের অধিকার সূত্রে বেশ অদল—বদলও করেছি।” এ অদল বদল ওয়ালীউল্লাহ্—র মতো গল্প—নির্মাতারাই কেবল করতে পারেন। তার
গল্পের চরিত্র গল্পের কাহিনির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে অবলীলায়।
সমকালীন অন্যান্য লেখকদের মতো এই লেখককেও ব্যতিব্যস্ত রেখেছিল সমকালীন বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ধরতে চেয়েছেন মনোবাস্তবের প্রেক্ষিতে। ‘নয়নচারা’য় মাটি সন্ধানী আমুর শেষ উচ্চারণ: “নয়নচারা গাঁয়ে কি মা’র বাড়ি?” খিদের সমস্ত চাহিদা আকাক্সক্ষা গ্লানিকে ছাপিয়ে এ অনুসন্ধান স্পষ্ট করে তোলে এক গ্রাম উঠোনের মনোভূমি। ‘জাহাজি’ গল্পে তো সমুদ্রযাত্রা জাহাজ পরিবার ছেড়ে বাড়ি চলে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়ে যায় ছাত্তার। করিম সারেঙও ভাবে “এবার শেষ হবে তার সামুদ্রিক জীবন, এবার এ—অশান্ত জীবন থেকে সে মুক্তি পাবে।” জাহাজ বন্দরে পৌছবার পর করিম সারেঙ ছাত্তারের হাতে ধরিয়ে দেয় ঘরে ফেরার অসম্ভব আকুতিভরা ছাড়পত্র ‘তুই বারিৎ যা গই, আর ন আইছ্’, আর বদলে নেয় নিজের সিদ্ধান্ত ‘আবার সে জাহাজে চুক্তি নেবে, এবং যদি পারে আমৃত্যু সমুদ্রের বুকেই বাস করবে।’ ওয়ালীউল্লাহকে শ্রদ্ধা জানিয়ে শওকত ওসমান বলেছিলেন, ——“ওয়ালীউল্লাহর নিসর্গবন্দনা কিন্তু উপন্যাসের পটভূমি রচনার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত নয়। বরং তা উপন্যাসের অলংকারবিশেষ। কথকতার বিবৃতি না দিয়ে যেন পাঠকের দৃষ্টি কিছুক্ষণের জন্য অন্য দিকে ফিরিয়ে রাখা। কিন্তু প্ৰায় একই ধরনের বিষয়বস্তু—উপন্যাসে নয়, গল্পে নিসর্গ কথকতার মেটিভ বা উদ্দেশ্যের সঙ্গে বিধৃত।”একের পর এক তুলনাহীন স্বতন্ত্র নির্মাণ করে গেছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। একটি তুলসীগাছের কাহিনী, খুনি, দুই তীর, নিস্ফল জীবন, নিস্ফল যাত্রা, মালেকা, খণ্ড চাঁদের বক্রতায়, সেই পৃথিবী, পাগড়ি, কেরায়া, সতীন প্রতিটি গল্পকেই ওয়ালীউল্লাহ স্থপতির মতো নির্মাণ করেছেন পরম মমতায় আপন বৈশিষ্ট্যে র আলতো ছোঁয়ায়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গল্প মানে এক অনন্য স্বকীয়তার অপূর্ব শিল্পরুপ ।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন