প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর, ২০২৪ ০৬:৫৯
মো. আব্দুল মালিক
সুনামগঞ্জের ছাতকে যুগ যুগ ধরে জাল সার্টিফিকেটে একটি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন মো. আব্দুল মালিক নামের এক শিক্ষক। জাল সার্টিফিকেটধারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্কুলের অভিভাবকসহ ১০৮ জন এলাকাবাসী আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্তে জাল সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রমাণিত হলেও নেয়া হয় নি কোন ব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেন বিক্ষুদ্ধ অভিভাবকেরা। চেয়ার বাঁচাতে একের পর এক জাল সার্টিফিকেট বানিয়েই বহাল তবিয়তে ছিলেন ছাতকের জাহিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মালিক। গত বৃহস্পতিবার আদালত অভিযুক্ত এই শিক্ষককে জামিন না দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করেছেন।

অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের জাল সার্টিফিকেট সহ তদন্তের কিছু কাগজ এসেছে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের কাছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কতৃক গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে এসএসসি, এইচএসসি ও বি.এ পাসের তিনটি সার্টিফিকেট জমা দেন শিক্ষক আব্দুল মালিক। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বি.এ পাসের যে সার্টিফিকেট দিয়ে ২৪ বছর ধরে ছাতক উপজেলার জাহিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন সে সার্টিফিকেট ভুয়া বলে লিখিতভাবে জানান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ শাখার উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হোসনে আরা রায়হান।
শুধু বি.এ পাস সার্টিফিকেট নয়, হাতে লেখা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঢাকার দেয়া এইচএসসি সার্টিফিকেটেও নেই কোন কলেজের নাম। রোলের জায়গায় লিখা ঢাকা। টেম্পারিং করে সাল পরিবর্তন করায় সন্দেহ আছে এসএসসি সার্টিফিকেট নিয়েও। জাল সার্টিফিকেটের বিষয়টি জানাজানি হলে অযোগ্য প্রধান শিক্ষককে সরানোর দাবিতে অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। প্রধান শিক্ষকের পক্ষ হয়ে তাদের উপর হামলা চালানো হয়, আহত হন শিক্ষার্থীরা। ভীত শিক্ষার্থীরা এখন আসছে না স্কুলে।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরান আহমেদ বলেলন, আমরা প্রধান শিক্ষকের জালিয়াতির খবর শুনে অপসারণের আন্দোলনে নামি। আন্দোলন করার সময় আমাদের উপর হামলা চালানো হয়। এতে আমাদের শিক্ষার্থীরা আহত হন। স্কুলে এখন লেখাপড়ার মতো পরিবেশ নাই। তাই ভয়ে আমরা স্কুলে যাই না।
সাবেক শিক্ষার্থী ইমন বলেন, প্রধান শিক্ষকের সার্টিফিকেট জাল এটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রমাণিত। এছাড়া এডিসি, ইউএনও স্যারের তদন্তেও প্রমাণিত হয়েছে। এরপরও কিভাবে উনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে বহাল থাকেন! একজন অযোগ্য ভুয়া প্রধান শিক্ষকের কাছে আমাদের ছোট ভাই বোনেরা শিক্ষা নিতে রাজি নয়।
ভুয়া সার্টিফিকেট ছাড়াও স্কুলে অনিয়মিত থেকে বেতন উত্তোলন, ব্যাংক একাউন্ট ছাড়া লেনদেন, পছন্দ মতো ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচনসহ নানা অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলেও স্থানীয় এমপি মহিবুর রহমান মানিকের আশীর্বাদে চেয়ারে টিকে ছিলেন বলে অভিযোগ অভিভাবক ও স্থানীয়দের ।
সাবেক পাঁচ আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিককে সম্মাননা দিচ্ছেন প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মালিক
অভিভাবক ও স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ আরজু মিয়া বলেন, এই প্রধান শিক্ষক স্কুলেই আসেন না। সিলেটে বাসা নিয়ে থাকেন। স্কুলের না খাতের টাকা ব্যাংকে না রেখে উনার পকেটে রেখে খরচ করেন। এই শিক্ষক দ্বারা স্কুল ও শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্কুলের সাবেক সভাপতি আজব আলী বলেন, আমি সভাপতি থাকাকালীন ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি করেছেন এই প্রধান শিক্ষক। আমি সভাপতি হিসেবে প্রতিবাদ করায় আমি ও আমার ছেলেকে ক্যাডার দিয়ে মারধর করা হয়। আমাদের বিরুদ্ধে মামলাও দেয়া হয়।
অভিযোগকারী ১০৮ জনের মধ্যে একজন রহিম উদ্দিন। বললেন, জাল সার্টিফিকেট সহ নানাবিধ অনিয়মের সাথে যুক্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালিক। এতো এতো অভিযোগ তদন্তের পরও কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। সাবেক এমপির ঘনিষ্ঠ হওয়ায় কেউ কিছু করতে পারছে না। আমাদের দাবি অতি দ্রুত এই ভুয়া প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
এতো অভিযোগের পরও প্রশাসনিক কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় বাধ্য হয়ে আদালতে মামলা করেন সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে আসেন প্রধান শিক্ষক। এর ভেতরে তৈরি করেন ডিগ্রি পাস ও সার্টিফিকেট কোর্সের আরও ভুয়া রেজিস্ট্রেশন, মার্কশীট ও সনদ। এসব কাজও নৈপুণ্যতার সাথে করতে পারেননি তিনি। ভুয়া সার্টিফিকেটে তার নাম মো. আব্দুল মালিকের পরিবর্তে লিখা ছিল মো. এ মালাক। এসব সনদ সহ সশরীরে বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির হলে আদালত জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠান। কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাদী পক্ষের আইনজীবী প্রদীপ কুমার নাগ।
আদালতে মামলা থাকায় এই বিষয়ে কথা বলতে চান নি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শিক্ষা ও আইসিটি। কারাগারে যাওয়ার আগে স্কুলে গিয়ে বক্তব্য ও ভিডিও নিতে চাইলে বাধা দেন প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মালিক। শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ দেখতে চাইলে আদালতকে দেখাবেন বলে জানান তিনি। অর্থ আত্মসাৎতের বিষয়ে বলেন, টাকা আমার কাছে না, অন্যদের কাছে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বেসরকারি স্কুলের সভাপতি অল ইন অল। আমাদের খুব একটা নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আগে অনলাইনে সার্টিফিকেট যাচাই করার সুবিধা ছিলো না, যেটি এখন করা যায়। সেই সুযোগে হয়তো প্রধান শিক্ষক হয়ে গেছেন। ভুয়া সার্টিফিকেটের অভিযোগের বিষয়টি আমাদের কাছে আছে। এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্থানীয় তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানোর পর শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্ত হচ্ছে। তদন্তের পর ভুয়া সার্টিফিকেট প্রমাণিত হলে এতো বছরের বেতন ভাতা ফেরত দেয়া সহ তার শাস্তি হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন