প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৪ ০৬:৩৫
প্রাককথন
এই লেখার প্রসঙ্গটি বারকিশ্রমিক ও তাঁদের জীবন—সংগ্রাম, সে—বিবেচনায় শিরোনামটি করা হয়েছে ‘বারকিশ্রমিকদের জীবনযুদ্ধ’। সুনামগঞ্জের সুরমার উত্তরপাড় (মধ্যনগর, তাহিরপুর, বিশ^ম্ভরপুর, দোয়ারবাজার, ছাতক ও সুনামগঞ্জ সদরের অংশ বিশেষ) এবং সিলেট জেলার কীছু অংশে অবস্থিত বালু—পাথর মহালের শ্রমিক যাঁরা তাঁরাই বারকিশ্রমিক। নদীতে বালু—পাথর পরিবহণের কাজে বারকিনৌকা ব্যবহার করেন বলে তাঁরা বারকিশ্রমিক। অনুমিত হয় তাঁরা সংখ্যায় পাঁচ লক্ষাধিক। একজন শ্রমিকের পরিবারে সদস্য সংখ্যা গড়ে চার অথবা পাঁচজন ধরে নিয়ে হিসেব করলে সংখ্যাটা দাঁড়ায় বিশ অথবা পঁচিশ লক্ষ। সংখ্যাটা এমনিতেই এতো বড় হয়ে যায় না, স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকা থেকেও অনেক শ্র্রমিক আসেন এখানকার বালু—পাথর মহালে কাজ করতে।
দেশের রাস্তাঘাট, সেতু, ঘরবাড়ি, দালানকোঠা ইত্যকার স্থাপনা অর্থাৎ যাবতীয় অবকাঠামোগত বিনির্মাণ সম্পন্ন হয় এখানকার বালু ও পাথর দিয়ে। তাই অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিনিয়মেই এখানে সৃষ্টি হয়েছে প্রকৃতিনির্ভর একটি কর্মসংস্থানের এবং প্রকারান্তরে বালু—পাথর উত্তোলনের কাজে অপরিহার্য বারকিশ্রমিকদের আবির্ভাবকে সম্ভব করেছে। একদা এই বালু—পাথর উত্তোলনের সমগ্র প্রক্রিয়াটি ছিল বারকিনৌকা, বেলচা ও বালতি নির্ভর। তখন বালু—পাথর মহালে পুঁজির বিনিয়োগ ও পুঁজির মুনাফা অর্জন ঠিকই ছিল কিন্তু তখনও পুঁজিপতির অধিক মুনাফালাভের লোভ বারকিশ্রমিকদের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হয়ে উঠে নি, এখনকার মতো। অর্থাৎ পুঁজি তখনও বালু—পাথর মহাল থেকে শ্রমিক ছাটাই—নির্মূলের শক্তিচরিত্র অর্জন করে নি। কিন্তু অর্থনীতির নিময়নুসারে ক্রমে পুঁজির চরিত্র বদলে গিয়ে যথারীতি বালু—পাথর মহালগুলোতে পুঁজির অন্তর্গত নিয়মে পুঁজির আধিপত্য বৃদ্ধির সঙ্গে মুনাফা বাড়ানোর প্রক্রিয়া বেড়ে গিয়ে, বা যাকে বলে, প্রবল হয়ে উঠে ক্রমে বালু—পাথর উত্তোলনের কর্মপরিসর থেকে বারকিশ্রমিক উৎখাতের প্রবণতা—প্রক্রিয়ার বিস্তার ঘটে এবং যথারীতি কার্যক্ষেত্রে বালু—পাথর উত্তোলন—পরিবহণের কাজে যথাক্রমে ড্রেজার, বোমা মেশিন ইত্যাদি শক্তিশালী খননযন্ত্র ও স্টিলবডি নৌকার মতো বহরে বড় নৌকার ব্যবহার শুরু হয়। অর্থাৎ সামগ্রিক আর্থসামাজিক ব্যবস্থার পরিসরে পুঁজির আধিপত্য বিস্তারের অনিবার্য প্রক্রিয়ার প্রভাবে পুঁজিপতির মালিকানাধীন হাতিয়ার (স্টিলবডির বড় নৌকা ও ড্রেজার—বোমা মেশিন) বারকিশ্রমিকের মালিকানাধীন হাতিয়ারকে (বারকিনৌকা, বেলচা ও বালতি) হটিয়ে দিতে শুরু করে এবং এই নির্দিষ্ট কর্মসংস্থানের পরিসরে ক্রমে আগ্রাসী পুঁজির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে শেষ পর্যন্ত কাঠামোগত সহিংসতাকে বেপরোয়া করে তোলে দৃশ্যমান সন্ত্রাসে পর্যবসিত করে। যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী সুরমার উত্তরপাড়ের মানুষ।
একটি স্মৃতিচারণ \বারকিশ্রমিকদের সঙ্গে সামন্তযুগীয় আচরণ
নব্বই দশকের একটি ঘটনা নিয়ে একজনের স্মৃতিচারণ উদ্ধৃত করে শুরু করছি। স্মৃতিচারক নিজে একজন একটি প্রগতিশীল রাজনীতিক সংগঠনের কর্মী। তাঁর অনুরোধে এখানে তাঁর নাম সন্নিবেশন করা গেলো না। তিনি বলেছেন : আমরা তখন এসএসসি পরিক্ষার্থী। পশ্চিমবাজার নদীরপাড়ে মানিক লাল রায় তখন মাস্টারি করেন। অর্থাৎ প্রাইভেট পড়ান। একটি ঘরের পেছনের অংশে থাকেন সপরিবারে, সামনে একটি বইয়ের দোকান। দোকানের নাম ‘সুরমা বইঘর’। এখানেই তিনি ছাত্র পড়ান। এই বইঘরেই দেখতাম মাঝে মধ্যে সংগঠনের সভা হত। মানিক স্যার ঐ সময় বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি, সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আমরা সবাই বুঝতাম মানিক স্যার রাজনীতি করেন। স্যার আমাদের সবাইকে ছাত্র রাজনীতিতে যোগদানের লক্ষ্য নিয়ে আমাদের সাথে বন্ধুর মত আচরণ করতেন। আমরাও সবাই খোলামেলা বন্ধুর মত আচরণ করতাম। আমাদের সাথেই পড়াশোনা করতেন আমাদের বড়ভাই ভাদেরটেক গ্রামের বিল্লাল মিয়া।
বিল্লাল ভাই একদিন মানিক স্যারের সাথে চলতি নদীর বারকিশ্রমিকদের দুঃখ কষ্টের কথা নিয়ে আলাপ করেন।তাঁদের আলাপের প্রেক্ষিতে আমরা ছাত্ররা বুঝতে পারি যে, সুরমার উত্তর পাড়ের বারকিশ্রমিকদের অবস্থা ভালো নয়, সেখানে তাদেরকে মজুরি কম দেওয়া হচ্ছে। এটা যে একধরণের শোষণ ও সেটা রাষ্ট্রকর্তৃক আইনিপ্রকরণে সংঘটিত একটি ব্যাপারÑ এখন পরিণত বয়সে এসে যেমন বুঝিÑ তখন সেটা বুঝতাম না।রাষ্ট্র নির্বিকার হলে বারকিশ্রমিকরা নিয়মিত উপেক্ষা, তাচ্ছিল্য, নিগ্রহ ও শোষণের শিকার হবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক এবং বাস্তবে হচ্ছেও তাই। এবং আমরা নদীর পাড়ের এই বইঘরে পড়াশোনা করি, কিন্তু জানি না নদীর ঐ পাড়ে বারকিশ্রমিকরা কেমন আছেন।
বিল্লাল ভাইয়ের সবকথা শোনে ভাদেরটেক বাজারে সভার তারিখ দেয়া হল। তারিখ মতো আমাদের সবাইকে নিয়ে স্যার ভাদেরটেক বাজেরে গেলেন। ঐ দিনের সভায় ছাত্রদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ছাত্র নেতা আমির উদ্দিন, মিজানুর রহমান মামুন, মাসুম আক্তার জামিল, ভাদেরটেক গ্রামের মুজিবুর রহমান, সফর আলীসহ মণিপুর হাটির আব্দুস সত্তার ও অন্যান্যরা। অনেকের নাম মনে নেই। মোহন মিয়া মোড়লের সভাপতিত্বে ভাদেরটেক বাজারে ঐদিন এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এলাকার বারকিশ্রমিকগণ তাঁদের বারকি—বালি—পাথরের সঙ্গে সম্পৃক্ত শ্রমিকজীবনের দুঃখ, কষ্ট ও বঞ্চনার কথা প্রকাশ করেন। শ্রমিকরা এক এক করে বলে চলেন তাঁদের জীবনের কথা। তার সারসংকলন অনেকেটা এরকম : আমরা ভোর বেলা নদীতে যাই। কনকনে পাহাড়ি ঠাণ্ডা পানির সাথে যুদ্ধ করে পাথর নিয়ে পূর্বসদরগড় ঘাটে এসে সারাদিন রোদে শুকাই আর মালিকরা কেউবা কেরাম খেলে, আবার কেউবা নদীর পাড়ে বসে তাস খেলে। মাঝেমধ্যে এসে আমাদের বারকি নৌকার সংখ্যাবহর কতবড় হলো দেখে যায়। কিন্তু পাথর কেনার নাম করে না। বেলা গড়িয়ে সন্ধার কিছু আগে দুই অথবা তিনজন মিলে যার যা ইচ্ছা হয় দাম ধরে স্লিপ আমাদের হাতে ধরিয়ে দেয়। ওদের ইচ্ছার বেশি দাম চাইলে বলে, ‘তোর পাত্থর রাখতাম না। ইচ্ছা অইলে দে, না অইলে পাত্থর নিয়া বাড়িৎ যা।’ পাথর বিক্রির একটি মাত্র ঘাট, আমরা চাইলেও অন্য জায়গায় পাথর বিক্রির সুযোগ নাই। আর এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী দাম দেয়, কোনও কথার সুযোগ নাই। পাথর বিক্রি করে আমরা যে টাকা পাই, এই সামন্য টাকা দিয়ে আমাদের সংসার চলে না। তবু নিরুপায় হয়ে আমরা তাদের নিকট পাথর বিক্রি করতে বাধ্য হই। আমরা পড়ালেখা জানি না। সরকারের কাছে কীভাবে নালিশ করব সেটাও বুঝি না। আপনারা এসেছেন আমাদের কথা শোনতে, আমরা সুন্দরভাবে আমাদের দুঃখের কথা বুঝিয়ে বলতে পারব না। ব্যবসায়ীরা ৫ টাকা থেকে বড়জোর ৭ টাকা পাথরের দাম দিয়ে আমাদের চোখের সামনে ১৫ টাকা থেকে ১৮ টাকা, কোনও কোনও ক্ষেত্রে ২০ টাকা দামে প্রতি ঘনফুট পাথর বিক্রি করে। আমাদের কীছু করার নেই। ব্যবসা করে টাকার মালিক বড় বড় মহাজন, আমরা শ্রমিকরা ন্যায্য দাম পাই না। আমাদের কথা একটাই, এই লুণ্ঠনের প্রতিকার চাই। ঐ দিনের সভায় অনুমান ৫০০ থেকে ৭০০ শত লোক জমায়েত হয়েছিলেন। সভায় সিদ্ধান্ত হল শ্রমিকদের সমস্যার উল্লেখ করে নদীতে কাজ বন্ধ রেখে জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি দেয়া হবে। এই খবর ব্যবসায়ীরা জানতে পারল। তারা শ্রমিকদের ভয় দেখাতে প্রচার করতে লাগল যে, যদি প্রশাসনের নিকট স্মারকলিপি দিতে যাওয়া হয় তা হলে তারা ঘাটে পাথর ক্রয় বন্ধ রাখবে। ভয়ভীতি উপেক্ষা করে দুই দিন পর নদীতে সকল শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে নৌকাযোগে সুনামগঞ্জ শহরের পশ্চিম বাজারে এলেন এবং সেখান থেকে মিছিলসহকারে শহর প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি দিলেন। স্মারকলিপির প্রধান দাবি ছিল : ১. পাথর ক্রয়ের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। ২. সরকারিভাবে ক্রয়কেন্দ্র চালু করতে হবে। ৩. সকাল থেকে পাথর ক্রয় করতে হবে। সিন্ডিকেট করে পাথর ক্রয় বন্ধ করতে হবে। ৪. প্রতি ঘনফুট পাথরের দাম ১৫ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। ৬. শ্রমিকদের সাথে অশোভন আচরণ বন্ধ করতে হবে। স্মারকলিপি জমা দেয়ার পর ছাত্রনেতারা এবং আমাদের স্যার কৃষকনেতা মানিক লাল রায় সংক্ষিপ্ত সভায় বললেন, কীছু দিন অপেক্ষা করে দেখা যাক প্রশাসন কী ভূমিকা নেয়। আপনারা কাল থেকে কাজে যান । আমরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।
পরদিন শ্রমিকরা পাথর বালি নিয়ে ঘাটে আসলে মালিকরা শ্রমিকদের জানিয়ে দিল, ‘তোরা প্রশাসনের ঠাঁইন নালিশ খর্ছছ্, তোরার পাত্থর আমরা রাখতাম না।’ এতে শ্রমিকরা বিপাকে পড়ে গেল। কয়েকজন শ্রমিক পশ্চিম বাজারে এসে আমাদের বিষয়টি অবিহিত করলে সাথে সাথে আমরা কয়েজন ছাত্র নদীতে যাই এবং শ্রমিকদের সান্ত্বনা দিয়ে বলি যে, আপাতত আজকের পাথর যে—কোনও এক জায়গায় জমা রাখা হোক এবং প্রশাসন কী ভূমিকা গ্রহণ করে তার জন্যে অপেক্ষা করা যাক। শ্রমিকরা ক্ষোভে—দুঃখে সদরগড়ে এক জায়গায় ঐ দিনের সব পাথর জমা করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন, জমাকৃত এই পাথর বিক্রির টাকা দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। ঐ দিনের পর থেকে শ্রমিকরা স্বেচ্ছায় নদীতে কাজ বন্ধ করে দিলেন এবং এর প্রেক্ষিতে ১৮ দিন নদীতে বালিপাথর উত্তোলনের কাজ বন্ধ ছিল। নদীতে কাজ বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের রোজগার ছিল না বলে নিত্যদিনের সাংসারিক প্রয়োজন চালাতে কষ্ট হলেও ধর্মঘট চলতে থাকায় ব্যবসায়ীরা পড়ল আরও বড় বিপদে। নদীতে জাহাজ (পাথর—বালি পরিবহণের বড় নৌযান) এসে বসে আছে, ব্যবসায়ীরা পাথর দিতে পারছে না। তারা গোপনে প্রশাসনের সহিত যোগাযোগ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ত্রিপক্ষীয় সভার আয়োজন করল। সভায় শ্রমিকরা নিজেদের মতো করে সকল কাণ্ডকারখানার বর্ণনা দিলেন । কেচ্ছা সব শোনে জেলা প্রশাসক বিস্ময়ে হতবাক। শেষে জেলা প্রশাসক ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা শ্রমিকদের সাথে যে আচরণ করছেন, এই ধরণের আচরণ সামন্তযুগীয় আচরণ, এই ধরণের আচরণ আর শ্রমিকদের সাথে করবেন না। এই রকম অভিযোগ পেলে আগামীতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাল সকাল হতে আপনারা ব্যবসায়ীরা পাথর ক্রয় করবেন। আপরদিকে বারকিশ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘যদি কেউ আপনাদের জিম্মা করতে চায় আমার নিকট অভিযোগ জানাবেন।’ ব্যবসায়ীরা অপমানিত হয়ে মাথা নিচু করে সভা হতে চলে এলেন। ঐ দিনের সভায় ব্যবসায়ীদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ পাথর—বালি সমিতির সভাপতি কামরুজ্জামান দারা (আওয়ামী লীগ), সাধারণ সম্পাদক আতর আলী (বিএনপি) সহ অন্যান্য ব্যবসায়ীরা। স্মারকলিপিতে উল্লেখিত দাবিগুলোকে পাশকাটিয়ে সে—দিনের সভা শেষ হয় এবং এর মাধ্যমে এইভাবেই বারকিশ্রমিকদের আন্দোলনের প্রাথমিক বিজয় সূচিত হয়। বারকিশ্রমিকরা উল্লসিতভাবে মিছিল করে বাড়িতে যায়। এ সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ছিল পুরাতন কোর্টে (বর্তমান যাদুঘরে)।
তারপর সময় গড়িয়ে গেছে। ভাসানপানি আন্দোলনে কৃষক সংগ্রাম সমিতি সক্রিয় থাকায় কর্মীসংকটের কারণে চলতি নদীর বারকিশ্রমিকদের সাথে সাংগঠনিকভাবে ২০০০ খ্রি. পর্যন্ত আর কোনও যোগাযোগ রক্ষা করা যায় নি।
একচেটিয়ার প্রতিফল :‘ফাত্থর তোর বাফের নি’
বিগত শতকের আশির দশকে একবার ফাজিলপুর যাদুকাটা মহালে নিয়ম করা হয়েছিল যে, সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত ফাজিলপুর পাথর ব্যবসায়ী সমিতির বিভিন্ন সদস্যরা পাথর ক্রয় করবেন। এই নির্দিষ্ট সময়ের পর কেবল জয়নাল মিয়া পাথর ক্রয় করার অধিকারী থাকবেন। তিনি তখন একাধারে মহালের ইজারাদার ও বালুপাথর ব্যবসায়ীও বটে। সার্বিক বিচেনায় নদীর সর্বেসর্বা হর্তাকর্তা—বিধাতা, এলাকায় তার প্রবল একক আধিপত্য। পাথরক্রয়ের এই অভিনব আইনটির প্রণেতা ও প্রতিষ্ঠাতা তিনি নিজেই। এই আইন করার পেছনে তাঁর সা¤্রাজ্যবাদী সুলভ ব্যবাসাবুদ্ধি কাজ করেছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
নদীতে বারকিশ্রমিকরা কাজে নামতে শুরু করেন কাকডাকা ভোরে। দুপুর ১/২টা থেকে একের পর এক পাথর দিয়ে বুঝাই করা বারকি ফাজিলপুর ঘাটে ভিড়তে শুরু করে। ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় যতো সংখ্যক বারকি ঘাটে ভিড়ে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বারকি ভিড়ে ৪টার পরবর্তী সময়ে। কোনও কোনও বারকি সূর্যাস্তের পরে বুঝাই নিয়ে ঘাটে ভিড়ে। গভীর রাত পর্যন্ত পাথর বিকিকিনি চলে, হ্যাজাক লাইট জ¦ালিয়ে। বিক্রিকরা পাথর পাহাড় সমান পাথরের স্তূপে ফেলে তবে বারকিশ্রমিকরা বাড়ি যায়। যারা এই সুযোটা নিতে পারে না তারা পরের দিন সকালে বুঝাই নিয়ে ঘাটে এসে পাথর বিক্রি করে। উক্ত ‘অভিনব আইন’ প্রণয়ণের কারণে ফাজিলপুর পাথরব্যবসার পরিসরে এরকম অবস্থার সৃষ্টি হলে আইন প্রণেতার কারবারি লাভের পরিমাণটা বাড়ে। এর নিহিতার্থ এই যে, পাথরব্যবসার ক্ষেত্রে জয়নাল মিয়ার একচেটিয়া সুনিশ্চিত হয়, অবাধ প্রতিযোগিতার স্থলে একচেটিয়া বা কারবারে একক প্রভুত্বের বিস্তার ঘটে এবং বলা যায়, সামগ্রিক বিবেচনায় কারবারটা পুরোপুরি সা¤্রাজ্যবাদী অর্থনীতিক ব্যবস্থার মতো একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য অর্জন করে।
একটি ঘটনাপ্রসঙ্গ এখানে উল্লেখ করা বোধ করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না। পাথর বেচাকেনার ক্ষেত্রে এমন শত শত ঘটনা হররোজ ঘটে ঘাটে এবং ঘটতেই থাকে। মূলত বিষয়টা কী এবং বারকিশ্রমিকের প্রতি ঘাটরাটের আচরণগত নিষ্ঠুরতা কতো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে তার প্রমাণ পেশ করার জন্যে ঘটনাটির উল্লেখ অবশ্যই আবশ্যক। ঘটনাটি বলে বলে ছিলেন বারকিশ্রমিক সংঘ যাদুকাটা নদী শাখার সভাপতি ফরিদ মিয়া।
একদিন একজন বারকিশ্রমিকের পাথর ক্রয় করতে গিয়ে ক্রেতা ব্যবসায়ীরা ২৪০ টাকা পর্যন্ত দাম দিতে চেয়েছে, যেখানে বারকিশ্রমিক তাঁর বুঝাইয়ের দাম ২৫০ টাকা চেয়েছেন। দরাদরির ফাঁকে ঘড়ির কাঁটা ৪টা অতিক্রম করায় নিয়মমাফিক ঘাটমালিক জয়নাল মিয়ার লোক পাথর কেনা শুরু করে। দ্বিতীয় ধাপের ক্রেতা ওই শ্রমিকের পাথরের দাম ২২০ টাকার বেশি এক পয়সাও দেবে না বলে জানিয়ে দেয়। ঘাটে এখন ক্রেতা মাত্র একজন, প্রতিযোগিতা অনুপস্থিত। পরিস্থিতিটা এমন যে, ক্রেতার নির্দিষ্ট করা দামে পাথর বিক্রি করতে বারকিশ্রমিকরা বাধ্য। নিরুপায় হয়ে বেচারা বারবিশ্রমিক বুঝাই নিয়ে ঘাট ছেড়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। জয়নাল মিয়া আড়তে বসে বুঝাই নিয়ে ঘাট ছেড়ে যেতে দেখে, যে—লোকটি মাল ক্রয়ে ব্যস্ত তাকে ডেকে প্রশ্ন করে, ‘এ কোয়াই যায় ?’
‘বাড়িৎ।’
‘মাল বেছতো না।’
‘২৫০ টেখা চায়। আমি কইছি ২২০ টেখা।’
‘ডাইক্যা আন।’
বারকিশ্রমিকের আর বাড়ি যাওয়া হলো না। তাকে ডেকে আনা হলো। জয়নাল মিয়া তাকে বলল, ‘ফাত্তর তোর বাপের নি। বাড়িৎ লইয়া যাছ।’ নিজের লোকদের বললো, ‘এই, এর বারকি বুরাইলা।’ এবং এই গল্পটা শেষ হয়েছিলো জয়নাল মিয়ার নির্ধারিত দামে পাথর বিক্রি না করায় একজন বারকিশ্রমিকের পাথর বুঝাই বারকি নদীতে ডুবিয়ে দিয়ে।
চিচিং ফাঁক :‘এটা কী ! এটা কী !’
নব্বইয়ের দশকে কৃষকদের দাবির সঙ্গে যুক্ত হলো বারকিশ্রমিকদের দাবি, প্রতি ঘনফুট বালি ১ টাকা। জেলা প্রশাসকের নিকট, স্মারকলিপি প্রদান করা হলো। পর্যায়ক্রমে যোগাযোগ হয় বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সঙ্গে। এই প্রেক্ষিতে বারকিশ্রমিকদের মধ্যে একটু সাংগঠনিক শৃঙ্খলা অর্জিত হলেদাবি আদায়ের আন্দোলন জোরদার হলো এবং ভূমিকম্পের মতো ঝাঁকুনি খেলো অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট।বারকিশ্রমিকদের আন্দোলনের স্পন্দন যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ব্যবসায়ীদের কাছে বালিবিক্রির লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি আত্মসাতের ফাঁকি ধরা পড়ে। যাদুকাটা মহালেব্যবসায়ীরা সাধারণত বারকিশ্রমিকদের আহরিত প্রতিঘনফুট বালির দাম দেয় পঁচিশ পয়সা এবং এই পঁচিশ পয়সাই বারকিশ্রমিকে দেয় মজুরির রূপ পরিগ্রহ করে বা মজুরি রূপে গণ্য হয়। অথচ আগত ব্যবসাযীদের থেকে এই বাবদে অর্থাৎপ্রতিঘনফুট বালির দাম যেখানে পঁচিশ পয়সা করে আদায় করার কথা সেখানে দেড়টাকা করে আদায় করে। দামের এই আকাশপাতাল ব্যবধানের বিষয়ে জানতে পেরে আগত ব্যবসায়ীরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়ে কেবল‘এটা কী! এটা কী!’ এইটুকু উচ্চরণ করতে পারেন। লাভরহস্যের চিচিং ফাঁক দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়েতাঁরা বুঝতে পারে যে, প্রকৃত তথ্য গোপন করে সুনামগঞ্জের ব্যবসায়ীরা এতোদিন তাঁদেরকে ঠকিয়েছে। এইভাবে বারকিশ্রমিকদেরকে পঁচিশ পয়সা মুজুরি দিয়ে আগত ব্যবসায়ীদের নিকট হতে সেই শ্রমিকমজুরি বাবত দেড়টাকা থেকে ক্ষেত্রবিশেষে দুইটাকা করে নেওয়াটা আত্মসাতের চূড়ান্ত তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এতে করে যাদুকাটা নদীর অসাধু ব্যবসায়ীদের থলের বিড়াল বেড়িয়ে পড়ে তাদের চৌর্যবৃত্তির মুখোশ খোলে পড়ে। লোক বুঝতে পারে একেই বলে চুরি এবং এইভাবেই বাকরিশ্রমকরা প্রায় দুইযুগ পরে জানতে পারল কী পরিমাণ শোষণ করছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট! মেহনতি মানুষের শ্রমে তাঁরা সসম্পদ—সুখ কিনেছে, অতি সহজে। অবাক বিষয় এই যে, এই আত্মসাতের কোনও বিচার হয় না কোনও আদালতে। কোনও মামলা করে না।
এই ঘটনার পূর্বাপর সময়ে বারিক শ্রমিকদের মধ্যে কীছু লুম্পেন চরিত্রের লোকজন ঢুকে পড়ে। তাদের মধ্যে একজনের নাম আব্দুসাত্তার। ফলে আন্দোলন শতভাগ সফল না হলেও কিঞ্চিৎ মজুরি বৃদ্ধি পায় শ্রমিকদের।তবে আন্দোলনের ফল হয় সুদূরপ্রসারী। এই সময়েই বারকিশ্রমিকদের আন্দোলনের ফলে উপরে উক্ত ব্যবসায়ীদের দ্বারাকারচুপি করে বালির বিক্রিয়মূল্য পঁচিশ পয়সা থেকে দেড়—দুই টাকা করার প্রতরণার চিচিং ফাঁক ঘটে। এমনকি আন্দোলনের ফলেও ব্যবসায়ীদের ভেতরের দ্বন্দ্ব প্রবল হয়ে গিয়ে জামালগঞ্জের দুর্লভপুরে নুরুল হক আফিন্দির নেতৃত্বে গড়ে উঠে জামালগঞ্জের ব্যবসায়ীদের নতুন সমিতি। আর তখন দেশীয় স্টিলবডি নৌকাতে বালিবুঝাই করা নিয়ে বারকিশ্রমিকদের নতুন সংগ্রাম শুরু হয়। বালিপরিবহণের সীমানা নির্ধারণ, বালিবুঝাইয়ের মুল্য নির্ধারণসহ বেশ কিছু দাবি সমানে আসে ও অগ্রাধিকার পায়। বরাকিশ্রমিকদের সংগঠন আন্দোলনের ডাক দেয়। শ্রমিকদের এই জীবন সংগ্রাম নিয়ে কয়েকজন শ্রমিকের সাথে কথা হয়, নিচে তা উদ্ধৃত হল ।
কয়েকটি সাক্ষাৎকার
০১ \জাহের মিয়া
জরুরি প্রয়োজন হলে বাজারের দোকান থেকে চাল নিয়ে যাও
কথা হয় বারকি শ্রমিক সংঘ যাদুকাটা শাখার প্রবীণ সদস্য জাহের মিয়ার সাথে। তাঁর বয়স ৬০/৬৫ হবে। কথায় আঞ্চলিকতার সুরছন্দটান।বলছিলেন বারকিশ্রমিকদের করুন কাহিনী।কথাবার্তার শেষে তাঁর কথার সংক্ষিপ্তসার যা দাঁড়ালো ভাষার প্রমিতপ্রকরণে তা নিম্নরূপ।
দেশ স্বাধীনের পর সেই ৭৪/৭৫সালের কথা।জাহাজে বারকি দিয়ে বালি বুঝাই করতেন। ১০ পয়সা দর দেয়া হত। কিন্তু জাহাজ বুঝাই করার পর পরিমাপ করার অধিকার শ্রমিকদের ছিল না। ১০/১২হাজার ঘনফুটের জাহাজ বুঝাই করলেওবলা হতো,৬/৭হাজার ঘনফুটবালি বুঝাই হয়েছে জাহাজে। সেই মোতাবেক টাকা পরিশোধ করা হতো। নীরবে মেনে নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না। শ্রমিকদের কাজের সর্দাররা ছিল মালিকদের বিশ্বস্ত। কাজ করা ছাড়া বারকিশ্রমিকদের কথা বলার কোনও অধিকা ছিল না।
সরকার নির্ধারিত রয়্যালটি ছিল ১০পয়াসা। বালি বিক্রির দর শ্রমিকরা জানতনা। কাক ডাকা ভোর হতে জাহাজ বুঝাই শুরু সন্ধায় শেষ। তারপর রাত১০/১১টা পর্যন্ত টাকার আপেক্ষা। বিক্রির দর জানার সময় তাদের নেই। বালিপাথর বিক্রির কাজ বড় বড় সাহেবদে। শ্রমিকদের কোয়ারির ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ছিলেন হক সাহেব, সম্পাদক আবাদুল হান্নান। তাঁদের কাছে যাওযার সাহস কারও ছিলো না। হক সাহেবের নাম শুনলে সবাই আতঙ্কগ্রত হয়ে পড়তো। তিনি এলাকার বিরাট প্রভাবশালী পরিবারের লোক।
কোনও কোনও দিন কাজের টাকা দেওয়া হতো না। বলতো একসপ্তাহ পরে দেয়া হবে, বেশী জরুরি হলে বাজারের দোকান থেকে চাল নিয়ে যাও। শ্রমিকরা আভাবের তাড়নায় কাজ করতো। তাই চাল নিয়েই চুপচাপ বাড়ি ফিরতো।
০২ \ ফরিদ ভাই
ছোট জাহাজ সাড়ে ছয় হাজার, বড় জাহাজও সাড়ে ছয় হাজার
ফরিদ ভাই। মিয়ারচর বাড়ি। বর্তমানে বারকি শ্রমিক সংঘ যাদুকাটা নদী শাখার সভাপতি। বারকিশ্রমিকদের বিষয়ে তাঁর কাছে জানতে চাই। স্মৃতির জানালা খুলে ফরিদ ভাই অনেক কথাই বললেন। আমরা এখানে তাঁর ভাষ্যের একটি বিশেষ অংশের সারার্থ নিচ উল্লেখ করছি।
একদিন একটি জাহাজ বালি বুঝাই করি কিন্তু টাকা পাই নি। জাহাজটা দশ/বারো হাজারের হবে। পরের দিন ছোট আর একটি জাহাজ বুঝাই করি। সেটা ছয়/সাত হাজারের হবে। তারপর আমাদের সর্দারের নিকট দুই ব্যবসায়ী টাকা দিলেন । শোনে আমরা সবাই হতবাক । বড় জাহাজটা সাড়ে ছয় হাজার ছোট জাহাজটাও সাড়ে ছয় হাজার। অথচ ব্যবসায়ী দুই জন ! পরদিন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে রাগীও সাহসী জাহের মিয়া (মিয়ারচর), সিরাজ মিয়া (পাঠানপাড়া), ইদ্রিসমিয়া(মিয়ারচর), মুসা মিয়া (মিয়ারচর)হাতের বেইলচ্চা নিয়ে সবাইকে চিৎকার করে বলতে লাগলো, ‘আজ নদীতে কাজ বন্ধ। কেউ নদীতে কাজ করতে পারবে না। সবাই ডাঙ্গায় চলো। মিয়ারচর মাঠে সভা হবে। আন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে।’ যেই কথা সে—ই কাজ। সবাই কাজ বন্ধ করে মিয়ারচর বাজারে জড় হলো। সবার দীর্ঘ দিনের চাপা ক্ষোভ, সব একসাথে ফুঁসে উঠলো। সভায় সিদ্ধান্ত হলো্্ পরিমাপ ঠিক না হওয়া পর্যন্ত নদীতে কাজ বন্ধ থাকবে।
ঘটনাটা আশির দশকের। ওই দনি সভায় বড়দল, পাতারী, বালিজুরি, চিকসা, বারংকাসহ এলাকার সকল বারকিশ্রমিক মাঠে জমায়েত হল।সবার মধ্যে টান টান উত্তেজনা।সভা শেষে যারা মহালের পাশ দিয়ে বাড়ি যাবে তাদের ব্যবসায়ীদের লোকজন আটকাতে পারে, আটকানো হলে কী করা হবে সেই বিষয়ে করণীয় ঠিক করা হলো এবং সভায় উপস্থিত সকলে লিখিতভাবে অঙ্গীকার করল, দাবি আদায় করে ছাড়তে হবে।ব্যবসায়ীদের নিকট অনতিবিলম্বে সংবাদ পৌঁছে গেলো।বাড়ি ফেরার পথে ভাটির শ্রমিকদের সবাইকে ফাজিলপুর নৌকা ভিড়িয়ে সভার বিস্তারিত বলে যেতে বাধ্য করা হলো এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ছেড়ে দেয়া হলো। আন্দোলনের যারা নেতৃত্বে ছিলো তাদের সকলের নামে সাজানো মিথ্যা মামলা দেয়া হলো। ওই সময় সিরাজ ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলো, বাকিরা মামলার কারণে পলাতক।
নদীতে কাজ বন্ধ থাকায় একদিন ব্যবসায়ীরা আমাদের ডেকে নিয়ে গেলো তাদের সমিতির অফিস ফাজিলপুর বাজারে। সমিতির ব্যবসাযীরা আমাদের কোনও কথা শুনতে রাজি নয়। বলে দিলো, যারা দলসর্দারের অধীন দলের মধ্যে অবাধ্য তারা কেউ কাল থেকে নদীতে কাজ করতে পারবে না। দলের মধ্যে আমাদের মতো অবাধ্যদের পক্ষে তখন ওই মতের বিরুদ্ধে যাওয়া ছিলো অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যপার। নিরুপায় হয়ে আমরা কয়েকজন বল্লাম,‘আমরা কাজে যাবনা’। কিন্তু ধূর্ত হান্নান মিয়া হঠাৎ বল্ল, ‘ওদের কাজে নিষেধ দেয়ার দরকার নাই। ওরা আমাদেরই কাজের লোক। ভুল করছে, ক্ষমা করে দিন।’ আরও বল্ল, ‘কাল থেকে তোমরা কাজে যাও’। আমাকে বল্ল, ‘দাঁড়িয়ে সবাইকে কাল থেকে কাজে যাওয়ার জন্য বলে দাও’। ওদের ভয়ে দাঁড়িয়ে সবাইকে বল্লাম, ‘তোমরা কাল থেকেই কাজে যাও’।কিন্তু পরদিন কেউ নদীতে কাজে গেলো না। নদী ফাঁকা। আমাদের লোকদের কাছে জানলাম, ওই দিন যারা ফাজিলপুর যায় নাই তারা খবর পেয়েছে যে, আমাদের কাজে যেতে নিষেধ দেওয়া হয়েছে। এই সংবাদে তারাও নদীতে কাজে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমাদের ছাড়া তারা কাজে যাবে না।
ফরিদ ভাই আরও বল্লেন, ব্যবসায়ীদের অন্যায়—অত্যাচার, লুন্ঠনের আধিপত্য সহজে মানতে পারছিলাম না। গোপনে গোপনে ভালো নেতার খুঁজ করছিলাম। একদিন জানতেপারি, সিলেটের ভোলাগঞ্জ কোয়ারিতে বারকিশ্রমিকদের সভাপতি খুব সাহসী এবং দক্ষ। আমরা তার সাথে যোগাযোগ করি এবংএলাকায়এনে গোপনে সভা করি, কিন্তু কাজ হয়নি। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কেউ নদীতে রুখে দাঁড়াতে সাহস পেতনা এবং আজ পর্যন্তসিন্ডিকেটের মাধ্যমেই নদীতে কাজ চলে।
০৩ \ হানিফ মিয়া
ওরা আমাদের লেবার ডাকে, শ্রমিক মনে করে না
নব্বই দশকের পাথর আহরণ ও বিক্রির বিষয়ে জানতে কথা হয় হানিফ মিয়ার সঙ্গে। বয়সে পঞ্চাশোর্ধ অসুস্থ শরীরের মানুষ। বাড়ি মিয়ারচর। আমানুষিক পরিশ্রমে গত তিন চার বছর আগে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে হাঁটাচলা বন্ধ ছিল অনেক দিন। এখন হাঁটাচলা করতে পালেও, শারীরিক দুর্বলতার কারণে নদীতে কাজ করতে পারছে না। অর্ধাহারে অনাহারে দিন যাপন করছেন। পাথর বিক্রির কথা জানতে চাইলে বালুপাথর ব্যবসায়ীদের দুষ্ট আচরণের কথা স্মরণ করে বললেন, ‘ভাই! ওরা আমাদের লেবার ডাকে, শ্রমিক মনে করে না’। (অর্থাৎ হানিফ ভাই ‘লেবার’ অর্থে শ্রমিক বুঝেন না। তিনি মনে করেন,‘লেবার’নিকৃষ্টতা প্রকাশক একটি শব্দ। বারকিশ্রমিকদেরকে তুচ্ছ করার জন্য বালুপাথরখেকোরা এই শব্দটি ব্যবহার করে।)
অসুস্থ হানিফ মিয়া ভালভাবে কথা বলতে পারেন না। তারপরও কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে যা বলেন, তার মর্মার্থটা মনের মধ্যে সত্যিকার অর্থেই নিষ্ঠুরতার চেয়েও অধিক একটা কীছুর চিত্র মুদ্রিত করে চলে। গল্পটি আপাদমস্তক করুণ তো বটেই।
অনেক কষ্ট করে কাকডাকা ভোর থেকে কনকনে পাহাড়ি ঠাণ্ডায় পানির নিচ থেকে পাথর আহরণ করেবারকি বুঝাই করা যে—কোনও মানুষের পক্ষে কঠিন একটি কর্ম, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বারকি বুঝাই হলে বিক্রির জন্য ফাজিলপুর ঘাটে এলেই মাল (বালু বা পাথর যে—টিই হোক) তৎক্ষণাৎ বিক্রি করা যায় না, বসে থাকতে হয় সন্ধ্যা পর্যন্ত। ব্যবসাযীরা মতলব করেই সন্ধ্যার আগে আগে তড়িঘড়ি করে মাল ক্রয় করে। এই কারণে মাল নিয়ে সকালে এলেওঘাটে বসে থাকতে হয় সন্ধ্যা পর্যন্ত। ব্যবসাযীরা এমনটা করে মালের মূল্য কম দেয়ার জন্য। প্রতিদিন একজন ঠিকাদার মালক্রয়ের সুযোগ পায়। সে তার ইচ্ছামতো দাম দিয়ে বালুপাথর ক্রয় করে, বারকিওয়ালার কীছু বলার কোনও সুযোগ থাকে না। আর থাকবেই বা কী করে, বাজারে ক্রেতা তো একজনই। তিনি যে দামে মাল কিনবেন সেটাই মালের দাম। এই পদ্ধতিতে ঠকাদামে মাল বিক্রয় করে পাহাড়ের মত উঁচু স্তূপে পাথর ফেলে বারকি খালি করতে করতে রাত হয়ে গেলে প্রায়ই টাকা ছাড়া আমাদের বিদায় দিয়ে দিতো। পরে পাওনা টাকা পাওয়া একটি বাড়তি বিড়ম্বনা হয়ে উঠতো। অনেক শ্রমিকের টাকা শেষ পর্যন্ত বিচার শালিশ করেও পাওয়া যেতো না বা যায় নি।
০৪ \ ওমর আলী
তোমাদের মজুরি বাড়ানো যাবে না
মজুরি বৃদ্ধির দাবি করলে ব্যবসায়ীরা বলে, ‘তোমাদের ছড়ার রয়েলিটি ৪টাকা, আমাদের রয়েলিটি ১২টাকা, মোট১৬টাকা রয়্যালিটি দিতে হয়। তোমাদের মজুরি কী করে বাড়াব ?’ এই কথাগুলো বল্লেন বাদাঘাট দক্ষিণ ইউনিয়ন মিয়ারচরের ওমর আলী।
কথাগুলো নিতান্তই সাদামাটা বটে,বালুমহালে লুঠেরা অর্থনীতির হালচালের যথাযথ বর্ণনা। কিন্তু তারমধ্যে আর্থসামাজিক পরিমণ্ডলে পুঁজির প্রভুত্ব থেকে উঠে আসা আধিপত্যের দানবের ভয়ঙ্কর মূর্তি লুকিয়ে থাকে, সহজে বোধগম্য হয় না। লুঠেরা অধিপতি শ্রেণির শ্রেণিস্বার্থ উদ্ধারের অর্থাৎ অধিক মুনাফা লাভের জন্যে প্রশ্নহীন পরিসরে কার্যকর করতে যা প্রতিনিয়ত জনসমাজের আদর্শিক, নৈতিক ও মূল্যবোধ সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালায়। যেমন দিনে দিনে রয়ালিটি বাড়ে কিন্তু মজুরি বাড়ে না। ওমর আলীরা এই প্রবঞ্চনা মেনে নিত বাধ্য হন। তাঁঁরা ভাবতে বাধ্য হন জগতোর নিময়নীতি তো এমনই, এমনটাই হবে ও হবার কথা।এটাই তো স্বাভাবিক যে, রয়ালিটি বাড়বে কিন্তু মজুরি বাড়বে না।
তিন বৎসর আগে রয়েলিটি ছিল ১টাকা আর হঠাৎ করে একলাফে রয়েলিটি হয়ে গেল ১৬ টাকা! কেবল রয়ালিটি বাড়ে না, দফায় দফায় বাড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। শুধু বারকিশ্রমিকের মজুরি বাড়ে না।বরং রয়েলিটির কারণে আমাদের মজুরি আরও কমে, আগে আমরা মজুরি পেতাম ১১ টাকা, এখন রয়েলিটি বাদে পাই ৭ টাকা। এই হিসাবে আমাদের মজুরি আরও কমল ৪ টাকা।আক্ষেপ করে দুঃখের জ¦লেপুড়ে কথাগুলো বলছিলেন ওমর আলী ভাই।
০৫ \ সালাম ভাই
কয়দিন পর নদীর পাড়ে আইয়া দেখি খালি পানি আর পানি
সালাম ভাই কয়লাশ্রমিক সংঘের সভাপতি। বাড়ি তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের বড়গোপটিলা (বারিক্যার টিলা) বাজারে। বয়স ৬৯/৭০—এর মতো। ২০২৩—এর ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। কথা বলে জানা যায়, যাদুকাটায় বর্তমানে কয়লাশ্রমিকদের কাজের (কয়লা কুড়ানোর) তেমন কোনও সুযোগ নেই।
কীছুদিন আগেও একসময় তাঁরা নদীতে বাংলাকয়লা কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন সেটা সম্ভব হচ্ছে না। কয়লা কুড়ানোর জন্যে নদীর নব্যতা কম অর্থাৎ হাঁটপিানির কীছু কমবেশি হতে হয়। তার বেশি হয়ে গেলে নদীতে নেমে গভীর পানির তল থেকে কয়লা কুড়ানো হয়ে উঠে না।
তিনি বলেন, ‘ভাই! যাদুকাটা নদীতে কয়লাশ্রমিকরা এখন আর কাজ করতে পারছেন না। নদীর অবস্থা এমন হয়ে গেছে যে, সেখানে কাজের কোনও সুযোগ নাই। এখন নদী হয়ে গেছে ১০০—১৫০ ফুট গভীর।’ কান্না কান্না ভাব নিয়ে বল্লেন, ‘সারাদিন কষ্ট করে এক বস্তা বাংলাকয়লা (গিলাইন পাথর) পাওয়া যায়, মালিকরা তার উচিৎ মূল্য দেয় না, নানা টালবাহানা করে শেষ পর্যন্ত দাম কমই দেয়। তাই আমরা ইচ্ছাকৃত কিছুদিন বাংলাকয়লা কুড়ানোর কাজ বন্ধ রাখি, অন্য কাজ করি। তাই কীছুদিন নদীতে আর যাওয়া হয় না। এরপর একদিন নদীর পাড়ে এসে দেখি খালি পানি আর পানি। কয়লা—বালি—পাথর সব ড্রেজার মেশিন দিয়ে তোলে নিয়ে গেছে। নদী এখন নদী নেই, সাগর হয়ে গেছে। কয়লাশ্রমিকরা এখন ভীষণ কষ্টে আছে।’
৬ \ সিদ্দিক মিয়া
নিয়মিতই স্লিপে কাটাকাটি করত
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার অন্তর্গত ধোপাজান বালিপাথর মহালের পাথর—বালি বিক্রির হাট ছিল সদরগড় ও পূর্বসদরগড়। সারাদিন পাথর আহরণের পর বারকিশ্রমিকরা পাথর বুঝাই করে বিক্রয়ের জন্য ঘাটে নিয়ে আসত। বালিপাথর বিক্রির বিষয়ে কথা হয় বারকিশ্রমিক সংঘের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিনারপুর গ্রামের সিদ্দিক মিয়ার সঙ্গে। তিনি অনেক কথাই বললেন। বালিপাথরের দাম কমিয়ে দেওয়ার দুরভিসন্ধিতে যে অপকৌশল ব্যবসায়ীরা অবলম্বন করতো সে—বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁর বিস্তৃত বক্তব্যের নির্বাচিত সারৎসার নিম্নে উদ্ধৃত হলো। ব্যবসায়ীরা কীভাবে বালিপাথরের দাম কমিয়ে দিতো তার বর্ণানা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এতোকষ্ট করে ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাথর আহরণ করে ঘাটে এসে কোনওদিন উচিৎ মূল্য পাই নাই। বরংব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে নিয়মিতই স্লিপে কাটাকাটি করতো। পাথর কেনার সময় স্লিপে ৪০০/— টাকা লিখে দিলেও পাথর ঘাটে ফেলে দেওয়ার পর আমাদের হাত থেকে স্লিপ নিয়ে গিয়ে ১০০/— কিংবা ১৫০/— টাকা কেটে দিয়ে ৩০০/— কিংবা ২৫০/— করে দিয়ে ফিরত দিতো। স্লিস্নপে কাটাকাটি নিয়ে যে—বারকিওয়ালা আপত্তি করতো তাকে বলতো কাল থেকে তোমার আর ঘাটে আসতে হবেনা।’
০৭ \ কাদির মিয়া
‘চলতি নদী দেখলে এখন সাগর মনে হয়’
কাদির মিয়া বারকিশ্রমিক সংঘ সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক।বাড়িসুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামে,বয়স ৫৫/৫৭ বৎসর। বালকবেলা থেকেই ধোপাজান চলতি নদীতে বারকিশ্রমকের কাজ করেন। বারকিশ্রমকদের কাজের কথা জানতে চাইলে, ‘প্রায় তিন যুগ হল ধোপাজান চলতি নদীতে বারকিশ্রমিকের কাজ করি।’ এই বাক্য দিয়ে তিনি কথা শুরুর করেন। তারপর তিনি দীর্ঘ বক্তব্য দেন। আমরা ৫/৬ জন শ্রোতা। তার বক্তব্যে সারার্থ নিম্নে উদ্ধৃত হলো।
৩০/৩৫ বছর আগে দেখতাম সরকারের লোক রয়েলিটি নিত।কিন্তু যখন থেকে ব্যবসায়ীরা নদীর ইজারা গ্রহণ করে, তখন থেকে চলতি নদীতে স্টিলবডির ইঞ্জিন নৌকা ঢুকানো শুরু হয়। আন্দোলন সংগ্রাম করেও স্টিলবডির আক্রমণ থেকে নদী রক্ষা করতে পারি নাই। ২০১২ সালের পর থেকে ড্রেজার বোমাসহ বিভিন্ন নামের খননযন্ত্র দিয়ে বালি—পাথর উত্তোলন শুরু হয় ধোপাজান চলতি নদীতে।চলতিনদী হতে দৈনিক পাঁচ/ছয়লক্ষ ঘনফুট বালি উত্তোলন করা হয়েছে। ড্রেজার বোমার তাণ্ডবে বিলীন হয়েছে রাস্তাঘাট—হাট—বাজার, ফসলি জমি, বসত ভিটা। চলতি নদী দেখলে এখন সাগর মনে হয়। এলাকার ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে অল্প কিছু লোক কয়েক দিনে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে। আর আমরা হাজার হাজার বারকিশ্রমিক আজ বেকার । অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাই। ইজারাদারি প্রথা বাতিল করে সরকারিভাবে ক্রয়কন্দ্রে চালু হলে এবং নদীর ভিতরে স্টিলবডি ইঞ্জিন নৌকা প্রবেশ বন্ধ এবং সকল প্রকার খননযন্ত্র ব্যবহার বন্ধ হলে বারকিশ্রমিকরা যুগ যুগ ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেও বালিপাথর আহরণ করে শেষ করতে পারবে না। আমরা বারকিশ্রমিকগণ হাতের সাহায্যে যে—পরিমাণ বালি—পাথর উত্তোলন করি প্রতি বছর পাহাড়ি ঢলে উজান থেকে সেই পরিমাণ বালি পাথর এসে ভরাট হয়ে যায় । ২০১৮ থেকে ইজারা বন্ধ থাকায় আবার বালি জমে জমে নদী ভরাট হতে শুরু করেছে। দু:খের বিষয় আমরা বারকিশ্রমিকরা কাজ করতে পারিনা। অথচ রাতের অঁাধাে ড্রেজার বোমার সিন্ডিকেট বালি—পাথর ঠিকই উত্তোলন করে।
০৮\ নাসির মিয়া
ন্যায্য মজুরির আশায় শ্রম অধিদপ্তর থেকে রেজিস্ট্রেশন গ্রহণ
সুরমার উত্তরপাড়ের সার্বিক আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, বারকিশ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম ও আর্থনীতিক অবস্থা, যাদুকাটা—ধোপাজান—চলতি নদীর বালুমহালে বালুপাথরখেকো ব্যবসায়ী ও বারকিশ্রমিকদের মধ্যে জায়মান দ্বন্দ্ব—রাজনীতি ইত্যাদিসহ তাঁদের ভালোমন্দ নিয়ে সুনামগঞ্জ জেলা বারকিশ্রমিক সংঘের বর্তমান সভাপতি নাসির মিয়ার সঙ্গে আলাপ হলো।তার সারাৎসার নিচে তুলে দিলাম।
তিনি যা বলেন,তার মর্মার্থ অনেকটা এরকম : এই দেশে আমাদের মতো যাদের শ্রম বেচা ছাড়া অন্য কোনও আয়—উপার্জনের পথ নেই, যারা কেবল শ্রম বেচে বেঁচে থাকে, তারা শ্রমের ন্যায্য মূল্য পায় না।এই দেশে শ্রম নিয়ে অধিদপ্তর আছে, শ্রম মন্ত্রণালয় আছে। শ্রম ছাড়া দেশের এক মুহূর্ত চলে না। কিন্তু শ্রমিকদের শ্রমের ন্যয্য মূল্য পাওয়ার অধিকার নেই, শ্রম অধিকার ফলানোর সময়ে সরকারি—বেসরকারি মহলের সকলেই সবখানে সব সময় কাচকলা দেখাতে কখনও কসুর করে না, প্রয়োজনে সংহারমূর্তি ধারণ করে। সাধারণ মানুষÑ শ্রমশোষণ, যাকে বলা যায় এক ধরণের চুরি অথবা আত্মসাৎÑ তাকেই নিয়ম হিসেবে মেনে নেয়, কোনও প্রশ্ন তোলে না, প্রতিবাদও করে না। এমনকি প্রতিবাদী কাউকে সমর্থনও করে না, কেবল চুপ করে থাকে। বরং যখন অধিপতি শ্রেণি স্বশ্রেণির স্বার্থোদ্ধারের মতলবে জনসমাজের সম্মাতি উৎপাদনের জন্য জনগণকে নিয়ে রাজনীতি করে সে—অধিপতি শ্রেণির প্রতিই সমর্থনে এগিয়ে আসে।
এই রকম অবস্থায় যখন বিভিন্ন দাবি আদায়ের, বিশেষ করে বারকিওয়ালাদের আহরিত বালুপাথরের ন্যায্য মূল্য আদায়ের কোনও বিধিসম্মত পথ খেঁাজে পাওয়া যাচ্ছিল না তখনবাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি বাদল সরকারের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। বাদল সরকার বারকিশ্রমিকদের আন্দোলনের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়ে সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন গ্রহণের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর পরামর্শে সচেষ্ট হয়ে আমরা বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সহযোগিতায় ২০০৪ সনের ২৮ ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম শ্রম অধিদপ্তর হতে রেজি নং চট্ট—২৩৫৫ রেজিস্ট্রেশন পাই।
এর পরে আমরা আমাদের উপর মালিকদের অন্যায় জুলুম নির্যাতনের বিষয়ে প্রশাসনের নিকট সমস্যা সমাধানের দাবিতে অনেক আবেদন নিবেদন করেছি। প্রতিটি আবেদনের অনুলিপি শ্রম অধিদপ্তরে দিয়েছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ পর্যন্ত আমাদের পক্ষে শ্রম অধিদপ্তর কর্তৃক কোনও ভূমিকা গ্রহণ করা হয় নি। শ্রমিকদেরকে কোনও সুযোগ— না দিলেও বার বার ইজারদারদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিাধা দিয়ে এসেছে এই প্রশাসন। এমন নির্বিকারত্বকে সঙ্গে নিয়ে সমগ্র প্রশাসন নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে চলেছে। অর্থাৎ প্রশাসন ও ব্যবসায়ী ইজারাদার একটি নির্দিষ্ট আর্থনীতিক স্বার্থের বন্ধনে আবদ্ধ ও পরম্পর সহযোগী শক্তি। প্রকৃতপ্রস্তাবে সেই সূত্রে এটা হেজিমনি) পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের শিখেও থাকা অধিপতি শ্রেণি এবং তাদেও কায়েম করা মালিকানা সম্পর্কেও সেং্গ যুক্ত
এমন পরিস্থিতিতে আমরা যুগ যুগ ধরে শোষণ লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছি। প্রশাসন বারকিশ্রমিকদের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের অধিকার বাতিল করে, আমাদের বাপদাদার উত্তরাধিকারে লাথি মেরে বারকিওয়ালাদের স্বার্থক্ষুণ্ণ করে বালুপাথর মহাল সৃষ্টির মাধ্যমে আসলে ইজারাদার ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থসংরক্ষণে তৎপর হয়েছে এবং এতে কেও বারকিওয়ালাদেরস্বাধীনভাবে বালুপাথর আহরণের স্বার্থ বিলকুল বিনা ক্ষতিপূরণে হরণ করা হয়েছে কেবল নয়, অধিকন্তু বালুপাথর আহরণে নিয়োজিত বারকিশ্রমিকদেরশ্রমের ন্যায্য দাম পাওয়ার অধিকারটিকেও হরণ করা্ হয়েছে। ব্যবসাযীদের নির্ধারিত মূল্যে বালুপাথর বিক্রি করতে আপত্তিকারিকে নদীতে কাজে নামতে বারণ করে দিচ্ছে এবং প্রশাসন থাকছে নির্বিকার, তারা এক দিনের জন্যেও নদীতে বারকিশ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।
আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে বার বার ইজারাদারদের সন্ত্রসী বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি। তাদের হুমকির কারণে সৈয়দপুরের কাদির মিয়া পালিয়ে বেড়িয়েছে, রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারে নাই অনেকদিন। স্টিলবডি, ইঞ্জিননৌকা ওবাল্গেড চলতি নদীতে চলায় কতশ্রমিকের বারকি পানির নীচে তলিয়ে গেছে তার কোনও হিসাব নাই। অক্ষয়নগর গ্রামের পাশে চলতি নদীতে বাল্গেডের ধাক্কায় পানিতে পড়ে বারকিশ্রমিক কাফনার দেলোয়ারের হাত ভেঙেছে এবং পঙ্গু হয়ে তাকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।
সর্বশেষ আমাদের দাবি ছিল জিনাপুর বাজারের ভাটিতে স্টিলবডি ও অন্যান্য নৌকা রাখার। জেলা প্রশাসনের মধ্যস্থতায় প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও বারকিশ্রমিক এই তিন পক্ষের একটি বৈঠকে ব্যবস্য়ী মালিকরা এই দাবি (জিনাপুর বাজারের ভাটিতে স্টিলবডি ও অন্যান্য নৌকা রাখা) মেনে নিলেও কার্যক্ষেত্রে কার্যকর করে নাই, বরং বালিমহালে ড্রেজার—বোমা চালিয়ে অবাধে পাথর বালি লুট করার কার্যক্রম জোরদার করেছে এবং মহালে আধিপত্য বজায় রাখতে ইজারাকৃত এলাকায় স্থানীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে শ্রমিকদের হুমকির চাপ প্রয়োগ করেছে। ড্রেজার—বোমা প্রচলন হলে এক সময় এই অঞ্চলের কীছু লোক প্রভাবিত হয়ে ড্রেজারের নৌকা তৈরি কেও এবং প্রকারান্তরে ২০১৩—২০১৮ সনে ড্রেজার নৌকার আধিক্যেনদীতে নেীকা কিলবিল করতে থাকে। হতাশ কণ্ঠে নাসির ভাই কথাগুলো জানালেন।
নাসির ভাইয়ের মুখে পরাজয়ের হাহাকারের রঙে রঞ্জিত হতাশার কাষ্টহাসি ব্যবসায়ী শিবিরে বিজয়ের হাসি হয়ে প্রস্ফোটিত হয়েছে। এই হাসির উৎস আছে।সেই উৎসটি পুঁজিতান্ত্রিক সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে একান্ত ওতপ্রোত। সেটা তখনই বোধগম্য হয়ে উঠতে পারে যখন জানা যাবে কেন বারকিওয়ালাদের ন্যায্য দাবি কার্যকর হয় নি এবং বিপরীতে প্রতিশ্রম্নতির বরখেলাপির কোনও ধরণের প্রতিকারকরণে প্রশাসনের অপারগতা সমর্থনের নামান্তরে পর্যবসিত হয়েছে। আসলে বিষয়টা এই যে, প্রশাসন তার যাবতীয় কর্মকাণ্ড সমেত শেষ পর্যন্ত বর্তমান পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের নিয়ন্ত্রক অধিপতি শ্রেণি এবং তাদের প্রতিষ্ঠিত মালিকানা সম্পর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান মাত্র, বালুপাথরখেকোদেরসম্পদ সংরক্ষণ ও স্ফীত করার দায়িত্বপ্রাপ্ত তাঁবেদার।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন