প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর, ২০২৪ ০৬:১৬
৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার উপর হামলা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে গেল ৪ আগস্ট সুনামগঞ্জ শহরের শহীদ মিনারের সামনে থেকে থেকে পুলিশ সুপারের কার্যালয় পর্যন্ত ছাত্র—জনতা অভ্যুত্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় পুলিশ—আওয়ামী লীগ। সবচেয়ে বেশি সময় ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে পুরাতন বাস—স্টেশন এলাকায়। এসময় পুলিশের গুলিতে আহত হন দোয়ারাবাজার উপজেলার বাসিন্দা জহুর আলী। এ ঘটনার একমাস পর আদালতে মামলা করেন জহুরের বড় ভাই হাফিজ আহমেদ। যে মামলার এজাহারে নামোল্লেখ করে ৯৯ জন ও অজ্ঞাত ২০০ জনকে আসামী করা হয়। মামলা রজু হওয়ার পর বাদীর দাবি, এতো আসামির বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি। ছোট ভাইয়ের চিকিৎসা করতে হলে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দিতেই হবে এমন চিকিৎসা সহায়তার কথা বলে মাসুম হেলাল নামের এক সাংবাদিক মামলার সবকিছু তৈরি করে তার কাছ থেকে সই নেন। পরে ইচ্ছেমতো বসানো হয় আসামির নাম।
আসামীদের জামিনে আপত্তি নাই জানিয়ে মামলা করার দেড়মাস পর আবার আদালতে আপসনামাও দিয়েছেন বাদী। এমন খবর জানার পর মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে মামলার নেপথ্যে যদি চিকিৎসা হয়ে থাকে, তাহলে আপসের নেপথ্যে কি? টাকার বিনিময়েই আপসের চেষ্টা চলছে এমন অভিযোগও উঠছে বাদীর বিরুদ্ধে। মামলা নিয়ে সকল ব্যবসা বন্ধের আহবান জানিয়েছেন গুলিবিদ্ধ জখমি জহুর আলী। তিনি এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
মামলার বাদী মো. হাফিজ আহমেদ বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ঘটনার একমাস পর মাসুম হেলাল নামের এক সাংবাদিক এসে আমাদের কিছু অর্থ দেন চিকিৎসার জন্য। এরপর পুরো চিকিৎসা করাতে হলে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দিতে হবে জানান। তাই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আদালতে মামলা করতে যাই। আমাকে একটা কাগজ দিলে আমি শুধু সেখানে স্বাক্ষর করেছি। এরবাইরে আর কিছু জানিনা। পরে বাড়িতে এসে শুনি সারা সুনামগঞ্জের অনেকে আসামি। এখন কে আসামি হচ্ছে, কে গ্রেফতার হচ্ছে, কে বের হচ্ছে— আমাদের কিছুই জানায় না পুলিশ। সবকিছু মাসুম হেলাল—ই নিয়ন্ত্রণ করছে। আর দোষী হচ্ছি আমরা।’

এদিকে, আদালতে আপসের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ১১ নভেম্বর বাদীকে স্বশরীরে আদালতে উপস্থিত হতে নোটিশ জারি করা হয়। হাজিরা দিতে এদিন আদালতে আসলে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগ করেন মামলার বাদী মো. হাফিজ আহমেদ।
আসামী পক্ষের কয়েকজনের আইনজীবী নাজমুল হুদা হিমেল বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের মাধ্যমে আদালতে আপষের আবেদন করেন বাদী। আমরা সেই সার্টিফাইড কপি তুলে আদালতে আমার আসামীদের জামিনের আবেদন করি। আদালতকে জানাই আসামীদের জামিন দিতে বাদীর কোন আপত্তি নাই। আদালত দুইপক্ষের আইনজীবীদের কথা শুনে বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য বাদীকে আদালতে উপস্থিত হতে সমন দেন। শুনেছি বাদী আদালতে এসেছিল, কিন্তু আদালত যখন তাকে তলব করেন তখন আর বাদীকে পাওয়া যায়নি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহবায়ক ইমনদ্দোজা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মামলাটি শুরু থেকেই বিতর্কিত। অনেক আসামী যারা সেদিন হামলা চালিয়েছে তাদের নাম নেই মামলায়। কয়েকজন নিরপরাধ ব্যক্তিকেও আসামী করা হয়েছে, যারা আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। এখন আবার শুনছি সুনামগঞ্জে একটি মাত্র মামলা যেটা হয়েছে, তাও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বাদী আপস করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এর মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ নেতাদের সুনামগঞ্জে পুনর্বাসিত করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। আমরা এটি কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিনা।
আপস কেন করছেন জানতে চাইলে বাদী হাফিজ আহমেদ জানান, আমি শুধু পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছি। এখন যাকে ইচ্ছা তাকে আসামী বানানো হচ্ছে। দোয়ারাবাজারের আমার আত্মীয়—স্বজনও আসামী হয়ে জেলে যাচ্ছেন, অথচ আমি কিছুই জানিনা। জেলে ভরতেছে যারা, ছুটাচ্ছেও এরাই, আর দোষ হচ্ছে আমার মামলার। চারিদিকে আমার শত্রু তৈরি করা হচ্ছে। সকল শত্রু আমাদের দিয়ে, টাকা কামিয়ে মামলাবাজ মাসুম হেলাল চলে যাচ্ছে কানাডা। তাই এই মামলার দায় আমি আর নিতে চাইনা। মামলা অন্য কেউ চালাক, আমরা আর বিপদে পড়তে চাইনা। আমি এখন মহাবিপদে আছি। কাম কাজে যেতে পারছিনা, বাড়িতে থাকতে হচ্ছে। আমরা গরিব মানুষ কাম কাজ করে খেতে হয়। তাই মামলা তুলতে চেয়েছি। মামলা তুলতে গেলেও বিপদ। আদালত থেকে আমাকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়, না তুললেও বিপদ। এখন আমাদের পরিবারের কোন নিরাপত্তা নাই।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে তাকে নিয়ে করা মামলা বাণিজ্য বন্ধের আহবান জানিয়েছেন গুলিবিদ্ধ জহুর আলী। একই সাথে আসল আসামি পুলিশ কর্মকর্তা খালেদ চৌধুরী ও রাজন কুমার দাসকে গ্রেফতার না করায় ক্ষোভ জানান তিনি। জহুর বলেন, আমাকে যে গুলি করেছে, সেই ওসি খালেদকে এখনো গ্রেফতার করা হচ্ছে না। সে তার চাকরিতে বহাল আছে। শুনেছি হবিগঞ্জে চাকরি করছে। তাদের গ্রেফতার না করে আমার আত্মীয় স্মজন যারা আমাকে সাহায্য করেছে তাদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে। আমাদেরকে সবার চোখে খারাপ বানানো হচ্ছে। আমার ভাই অনেক সহজ সরল সবাই জানেন। আমার ভাইয়ের সরলতাকে কাজে লাগিয়ে মামলা দিয়ে ব্যবসা করছে মাসুম হেলাল। এখন আমরা সবার শত্রুম্ন এই মামলার কারণে। এই মামলা সরকার বা অন্য কেউ চালাক। মামলা নিয়ে এসব ব্যবসা বন্ধের জন্য সবার কাছে সহযোগিতা চাই। আসল অপরাধীদের গ্রেফতারের দাবি জানাই।
অভিযোগের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত দাবি করে ফেসবুক লাইভে এসে সাংবাদিক মাসুম হেলাল জানান, মামলাকে কেন্দ্র করে এক টাকার বাণিজ্য করেছি এমন কোন প্রমাণ দিতে পারলে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইবো। আমি শুধু নৈতিকবোধ থেকে চিকিৎসার জন্য প্রথমে সহায়তা করেছি। পরে আমার কাছে থাকা ভিডিও ফুটেজ দিয়ে মামলায় সহযোগিতা করেছি। এখন জহুর আলী কেন এমন অভিযোগ করছে আমার জানা নেই। তবে যতটুকু জানতে পেরেছি আইনী জটিলতার কারণে আপস না হওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ। কানাডা যাওয়ার বিষয়ে পাসপোর্ট দেখিয়ে তিনি জানান, কানাডা যাওয়ার কোন আবেদন তিনি করেননি। স্বপরিবারে কানাডা যাওয়ার মতো টাকা তার কাছে নেই। পাসপোর্টে শুধুমাত্র অনেক আগে করা ভারতীয় ভিসা আছে।
ভুক্তভোগীর লাইভ ভিডিও দেখে স্বউদ্যোগে মামলা বাণিজ্যের বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি নাজমুল হক। তিনি বলেন, যদিও বাদী আমার কাছে বাণিজ্যের বিষয়ে কোন অভিযোগ করেননি তারপরও ভুক্তভোগী জহুরের ভিডিও দেখার পর খোঁজ খবর নিচ্ছি কতটুকু সত্যতা আছে অভিযোগের। বাণিজ্যের কোন কিছু পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ মামলায় আসামি হয়ে জেল খেটে জামিনে বের হয়েছেন সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, সুনামগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন। এখনো কারাগারে আছেন ৪০ জনেরও উপরে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন