আলাদা বলয়ে আওয়ামী লীগে বিভক্ত

প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৬:৩৫

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সুনামগঞ্জ এক আসন। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিয়ে ধোয়াশা থাকলেও আওয়ামী লীগ নিজেদের মধ্যেই উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এই আসনে প্রায় ডজন খানেক মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থীকে নিয়ে প্রতিটি উপজেলায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেই বিভাজন তৈরি হয়েছে। মনোনয়ন যিনিই পাবেন তাকে নিয়ে একট্টা হয়ে কাজ করবেন জানালেও ভেতরে ভেতরে কোন্দল রয়েছে চরমে।


সুনামগঞ্জ—১ আসন তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত। জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে এটি আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকেও সবচেয়ে বড় আসন। এজন্য জেলার সবচেয়ে বেশি মনোনয়ন প্রত্যাশীও এই আসনে। এই আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৯১ হাজার ৫৫৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ দুই লাখ ৫২ হাজার ৯৭৩ এবং মহিলা দুই লাখ ৩৮ হাজার ৫৮৫ জন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ১৫০টি। এবার খসড়া তালিকা অনুযায়ী ১৬৯টি।


সুনামগঞ্জ এক আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য শামীমা আক্তার খানম নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশী। এছাড়াও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুনা সিন্দু চৌধুরী বাবুল, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাড. রঞ্জিত সরকার, সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. হায়দার চৌধুরী লিটন, আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির টিম সদস্য ও সাবেক যুগ্ম সচিব বিনয় ভূষণ তালুকদার ভানু, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাড. আক্তারুজ্জামান সেলিম, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সুনামগঞ্জ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সেলিম আহমেদ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের জেলা আহবায়ক ড. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব খান ও যুবলীগের  কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট গোলাম কিবরিয়া এই আসনের নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশী। তারা নিবার্চনী এলাকায় ব্যানার— ফেস্টুন লাগাচ্ছেন। অনেকেই এলাকায় গণসংযোগ করছেন।


আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী এই ১১ জন প্রার্থী নতুন কৌশল হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করছেন। এই প্রচারণায় অনেক সময় দলীয় কোন্দলও সামনে আসছে। এরমধ্যে তৃণমূলে সবচেয়ে বেশি গণসংযোগ করছেন বর্তমান সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, শামীমা আক্তার খানম, করুণা সিন্দু চৌধুরী বাবুল, অ্যাড. রঞ্জিত সরকার, সেলিম আহমেদ ও বিনয় ভূষণ তালুকদার ভানু ।


গেল ১৭ জুলাই তাহিরপুরে ঘাগটিয়া এলাকায় গণসংযোগ ও পথ সভায় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনকে দোষারোপ করে বক্তব্য দেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামীমা আক্তার খানম। পরে একই মাসের ২৪ তারিখে একই উপজেলার বাদাঘাট পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্ণামেন্ট উপলক্ষে সভায় বক্তব্য দেন এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনসহ তার অনুসারিরা। সভায় জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ—সভাপতি রেজাউল করিম শামীম ও ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিস— এমপি শামীমা আক্তার খানমের কড়া সমালোচনা করে বক্তব্য দেন।
এরকম পাল্টাপাল্টি বিষোদগারে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অবশ্য, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বলছেন, দলে কোন্দল নেই, বরং নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে।


তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি অধ্যাপক মো. আলী মুতুর্জা বললেন, গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এমপি রতন নিজের বলয় তৈরি করে নৌকার প্রার্থীর ভরাডুবি নিশ্চিত করেছেন। এজন্য উপজেলায় হাতেগোনা কয়েকজন নেতাকর্মী ছাড়া উনার সঙ্গে কেউ নেই। কোনো সহযোগী সংগঠনও তার সঙ্গে নেই। তার পছন্দের লোক দিয়ে উপজেলার কয়েকটি নৌ—ঘটে খাস কালেকশনের নামে চাঁদাবাজি হচ্ছে। তিনবারের এমপি হওয়ায় দম্ভ বেড়েছে তাঁর, তৃণমূল নেতাকর্মীদের তিনি মূল্যায়ন করেন না।


ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ বিলকিস বললেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক মনোনয়ন প্রত্যাশী মাঠে কাজ করছেন। তবে তৃণমূলের ৮০ ভাগ নেতাকর্মী বর্তমান সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনকে চায়।
তিনি বললেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, প্রকাশ্যে কোনো জনসমাবেশে বর্তমান এমপি’র বিপক্ষে কিছু বলা যাবে না। তবে তাহিরপুরের বাদাঘাটে শামীমা আক্তার খানমের কড়া সমালোচনা করে বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ওঠা গঠনমূলক সমালোচনা ছিলো।


মনোনয়ন প্রত্যাশী বিনয় ভূষণ তালুকদার ভানুু বলেন, আমি প্রতিটি উপজেলায় ঘুরছি। যেখানেই যাই সেখানে নতুন মনে হয়। রাস্তাঘাটের সেরকম উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে নি। তৃণমূল নেতাকর্মীরা উনার প্রতি অসন্তুষ্ট। সেজন্য সাধারণ মানুষ এই আসনে পরিবর্তন চান।


মনোনয়ন প্রত্যাশী অ্যাড, রঞ্জিত সরকার বলেন, সাধারণ মানুষের আশা— আঙ্খাংকা বর্তমান সংসদ সদস্য পূরণ করতে পারেন নি। মানুষের চাওয়া নেত্রীর কাছে পৌছাতে পারেন নি তিনি। সেজন্য পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে এই আসনে। সাধারণ মানুষের নেত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাস রয়েছে। আশা করি তাদের প্রত্যাশা পূরণ হবে।


সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. শামীমা আক্তার খানম বলেন, কিছু মানুষের কারণে এই আসনে আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা অবহেলার শিকার হচ্ছেন। সেখানে নব্য আওয়ামী লীগাররা মূল্যায়ন পাচ্ছে। সাধারণ মানুষ সেগুলো জানে। অনেকেই মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন। নেত্রী যাকে নৌকার মনোনয়ন দেবেন আমরা তার পক্ষেই কাজ করবো।


বর্তমান সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, যে কাজ করে তারই সমালোচনা হবে। কাজ না করলে এতো সমালোচনা হতো না। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। তবে দলীয় সভানেত্রী যাকেই মনোনয়ন দেবেন, তার পক্ষেই নির্বাচনে কাজ করবো।


মনোনয়ন প্রত্যাশী করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বললেন, নির্বাচনে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, দুর্নীতি মুক্ত হাওরাঞ্চল গড়তে আওয়ামী লীগের ত্যাগী ক্লিন ইমেজের একজন প্রার্থী চাই আমরা।


মনোনয়ন প্রত্যাশী সেলিম আহমেদ বলেন, সারাদেশে এই সরকারের আমলে যুগান্তকারী উন্নয়ন হলেও আমাদের আসনে কাঙ্খিত উন্নয়ন হয় নি। বর্তমান সংসদ সদস্যের নানা বির্তকিত কর্মকাণ্ড ও দলের প্রকৃত ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে নিজের বলয় তৈরি করার ফলে এখানে বিভক্তি বেড়েছে। তাঁর অনেক কর্মকান্ডের জন্য নেতাকর্মীদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন। এজন্য তৃণমূল নেতাকর্মীরা এবার পরিবর্তনের দাবি তুলেছে।


জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল হুদা মুকুট বলেন, আওয়ামী লীগে কোনো কোন্দল নেই। তবে নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগ খুবই শক্তিশালী। আগামী নির্বাচনে ৫ টি আসনেই নৌকা বিপুল ভোটে জয়ী হবে। সেজন্য দলীয় সভানেত্রী যাকে নৌকার মনোনয়ন দেবেন তাকে নিয়ে আমরা কাজ করবো।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার