প্রকাশিত: ২৪ নভেম্বর, ২০২৪ ০৬:৫৯
তাহিরপুর উপজেলার পর্যটন এলাকায় ফেলা প্লাস্টিক, চিপসের প্যাকেট ও পলিথিনে দূষিত হচ্ছে এলাকার পরিবেশ। এসব প্লাস্টিক বর্জে্যর সঙ্গে রয়েছে কাচের বোতল। এতে পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। প্রায়ই কৃষকদের দুর্ঘটনার সম্মুখিন হতেও হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসরিন জাহান বলেছেন, পরিবেশ বান্ধব পর্যটন গড়ে তুলতে হবে। ইতোমধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওরে নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের উপরে সম্ভবতা যাচাই সমীক্ষা হয়েছে।
গেল বছর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘পর্যটকবাহী নৌযান/ হাউসবোট ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা ২০২৩’ প্রণয়ন করা হলেও তা কেবলই কাগজেপত্রে। ‘পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষা’ এই নীতিমালার তোয়াক্কা করছেন না কেউই। হাউসবোটে ময়লা রাখার ডাস্টবিন থাকলেও পর্যটকেরা সব হাওরে ফেলে দিচ্ছেন।
ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— পর্যটনের কারণে হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রক্রিয়া যাতে বিঘ্নিত না হয় তার নিশ্চয়তা বিধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, হাওরের পরিবেশ, প্রতিবেশ অক্ষুন্ন রেখে নিয়ন্ত্রিত আকারে ভ্রমণ অনুমোদন করা, পর্যটকবাহী জলযানে রান্নার জন্য ব্যবহার্য গ্যাস সিলিন্ডার বহন না করা, সংরক্ষিত এলাকা বিভিন্ন প্রাণির অবাধ বিচরণ, স্বাভাবিক আচরণ, প্রজনন, বংশ বৃদ্ধি, নিরাপত্তা ইত্যাদি প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া, হাওরে ভ্রমণের জন্য পর্যটক, ট্যুর অপারেটর এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ, জলযান ব্যবহার সংক্রান্ত বিধি নিষেধ প্রণয়ন, হাওরে জীববৈচিত্র্য সংকটাপন্ন হতে পারে কিংবা জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকির সৃষ্টি হতে পারে এমন কোন কর্মকাণ্ড বা আচার—আচরণ থেকে বিরত থাকা, হাওরে ভ্রমণের রুট নির্ধারণ করা এবং ব্যাপকভাবে প্রচারের ব্যবস্থা করা, নৌযান/ হাউসবোটের বর্জ্যসমূহ পরিবেশবান্ধব উপায়ে নির্দিষ্ট সেফটিক ট্যাংকে নির্গমন নিশ্চিত করা, স্বাভাবিক মাত্রার অধিক শব্দ সৃষ্টিকারী, অতিরিক্ত/ কালো ধেঁায়া উদগীরণকারী বা ত্রুটিপূর্ণ কোন জলযান পর্যটক পরিবহনে ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং পর্যটকবাহী নৌকা/জলযানে বর্জ্য রাখার ব্যবস্থা রাখতে হবে, নৌযানে সৌর শক্তি ব্যবহারে সচেষ্ট থাকা, হাওরের অভ্যন্তরে উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী জেনারেটর বহন থেকে বিরত থাকা।
পর্যটন এলাকায় সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যাদুকাটা নদী, টাঙ্গুয়ার হাওরসহ ট্যাকেরঘাট এলাকায় পানিতে কাচের বোতলে সয়লাব। যেদিকে চোখ যায় পানিতে ভেসে থাকতে দেখা যায় কাচের বোতল, প্লাস্টিক ও পলিথিন। প্রতিটি নৌযানে রয়েছে জেনারেটর ব্যবস্থা। যেগুলো উচ্চ শব্দে পরিবেশ দূষণ করছে। নৌযানে ব্যবহৃত প্লাস্টিক প্লেট, চিপস, বিস্কুটের প্যাকেট ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হচ্ছে পানিতে। এছাড়াও রান্নার ব্যবহার্য্য সবজির, মোরগের অবশিষ্ট অংশও ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এতে পর্যটন এলাকার পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়দের দুভোর্গ বাড়ছে। ঘুরতে আসা পর্যটকদের অসচেতনতার কারণে হুমকির মুখে পড়ছে হাওরের জীববৈচিত্র্য। আর এতে নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি।
ট্যাকেরঘাট এলাকার পুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা গৃহিনী বিলকিছ বেগম বলেন, নৌকা থেকে সবজি, মোরগের অবশিষ্ট অংশ পানিতে ফেলে দেয়। এসব পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়, ঘরে থাকা যায় না। পানিতে গোসল করতে পারি না। পর্যটকদের সমস্যা নেই এসবে। আমাদের সব সমস্যা।
একই এলাকার বাসিন্দা নাঈম খান বলেন, পর্যটকদের ফেলে দেওয়া কাচের বোতল, প্লাস্টিক পলিথিন কৃষি জমিতে গিয়ে পড়ছে। পানি যখন শুকিয়ে যাবে তখন দেখা যাবে, মাটির উপরে পলিথিনের স্তর পড়ে গেছে। এগুলো পরিস্কার করে চাষাবাদ করা বহুকষ্টের। কয়েকদিন আগে মাছ ধরতে গিয়ে একজনের পা কেটেছে কাচের বোতলে। এরকম হাজারও বোতল রয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, পর্যটনেরই ক্ষতি হচ্ছে। আমরা পরিবেশ বান্ধব পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার দাবি জানাই।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক মাফরাহ রহমান সাথী বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে এসেছি, সারাদিন পানির উপর ভাসছি। এতো ভালো লাগার মধ্যে খারাপ লেগেছে পানিতে প্লাস্টিক পলিথিন ভাসতে দেখে। এটি দুঃখজনক ব্যাপার। আমরা যারা ঘুরতে এসেছি তারাই এগুলো ফেলছি। বিকেলে শহীদ সিরাজ লেকে ঘুরেছি। লেকের চারপাশ খুবই সুন্দর। আবার একটু নিচের দিকে তাকালে ঘাসের মধ্যে চিপসের প্যাকেট, কাগজ, ডাবের কোষা, ছোলা এগুলো দেখতে পাচ্ছি।
ঢাকা থেকে আসা আরেক পর্যটক সাইফুজ্জামান শহীদ সিরাজ লেক এলাকায় হাতে ডাব নিয়ে বলছিলেন, এটি কোথায় ফেলবো জানি না, কোনো ডাস্টবিন নেই। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অন্তত ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, এতে এই এলাকার পরিবেশ রক্ষা পেতো।
সুনামগঞ্জ হাউজবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনে সদস্য কামরুল হাসান ইমন বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর বিশ^ ঐতিহ্যের অংশ ও রামসার সাইট। হাওরের জীব—বৈচিত্র্যকে প্রাধান্য দিয়েই পর্যটন শিল্প বিকাশের চেষ্টা করছি। এজন্য প্রতিটি হাউসবোটে বর্জ্য রাখার ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও পর্যটকেরা পানিতে যাতে কোনো কিছু না ফেলে সে ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করছি।
এদিকে ১৫ নভেম্বর শুক্রবার রাতে ট্যাকেরঘাট এলাকায় লোকজ পূর্ণিমা উৎসবে আসেন বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসরিন জাহান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের মাধ্যমে টাঙ্গুয়ার হাওরে নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের উপরে সম্ভবতা যাচাই হয়েছে। এখন বিচ্ছিন্নভাবে পর্যটন হচ্ছে। এটিকে সরকারি—বেসরকারিভাবে আরও ব্যাপক আকারে কিভাবে প্রসার করা যায়, সে বিষয়গুলো দেখা হচ্ছে। এখানে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা অবশ্যই কাজ করবো।
তিনি বলেন, পরিবেশের দিকে নজর দিতে হবে। পরিবেশ বান্ধব পর্যটন গড়ে তুলতে হবে। প্লাস্টিক নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে রির্জারভারের ব্যবস্থা করা হবে। যেখান থেকে রিসাইকিলিংয়ের ব্যবস্থা করা যাবে। এজন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পর্যটকদের আরও সচেতন হতে হবে। পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে সক্রিয় প্রচার প্রচারণা প্রয়োজন। প্রতিটি হাউজবোটই জেনারেটরের মাধ্যমে চলে। এতে অনেক শব্দ দূষণ হয়। এটি রোধে সোলার ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে সবাইকে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন