প্রকাশিত: ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০৮:০৩
“বন্যার পরে আর ঘরটা ঠিক করতাম (করতে) পারছি না। রাত অইলেই (হলেই) ভাঙা ঘরের ভিতরেদি (ভেতর দিয়ে) ঠান্ডা হামায়। বরফের মতো ঠান্ডা অইযায় (হয়ে যায়) শরীর, তিন ফুরুত্তা (ছোট বাচ্চা) আর বউ লইয়া (নিয়ে) ছিঁড়া (ছেড়া) কেথা আর একটা পাতলা কম্বল দি কোনমতে (কোনভাবে) লইয়া বইতাকি (বসে থাকি)।’
হাওরের কনকনে ঠান্ডা হাওয়া কীভাবে ঘরে ঢুকে বুঝাচ্ছিলেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরের মধ্যবর্তী গ্রাম গোয়াচূড়ার আবুল ফয়েজ।
সড়ক দুর্ঘটনায় পা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে নেই তার আয় রোজগার। প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে স্ত্রী আর তিন সন্তান নিয়ে ছেড়া কাঁথায় কষ্টে কাটছে তাদের রাত। ঠান্ডায় ঘন ঘন সর্দি—কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছে তার শিশুরাও।
খঁুড়িয়ে খঁুড়িয়ে হাঁটা আবুল ফয়েজ বলেন, ‘আমার পাওর ভিতরে অখনো নাট বল্টু লাগাইল। পাড়া প্রতিবেশীর কাছ তাকি চাইয়া ঔষধের টেকা (টাকা) মিলাই। শীতের কাপড় কিনতাম কিলা (কেমনে)। ফুরুত্তাইনও খালি গায়ে থাকে। একটা শীতের কাপড় কিন্না (কিনে) দেয়ার সামর্থ্য নাই। দুই বছর আগের পাওয়া একটা কম্বল আর একটা ছিঁড়া কেথাই রাইতের ভরসা। ইবার ওখনো কেউ কিচ্ছু দিছে না।’
ফয়েজের স্ত্রী মার্জিয়া বেগম বলেন, ‘হাওরের মাঝখানো থাকি। ঠান্ডা বেশি লাগে আমরার। অতিরিক্ত ঠান্ডায় ঘন ঘন সর্দি কাশি অয় ফুরুত্তাইন্তের। আমরার অত টেকাও নাই যে বার বার ডাক্তারের গেছে যাইতাম।’ একই রকমের কষ্টের বর্ণনা দিলেন, প্রতিবেশী জুবেদা খাতুন সহ আরও তিন—চার পরিবারের সদস্যরা।
শুধু ফয়েজ বা তার পরিবার নয়, তীব্র শীতে বিপর্যস্ত সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের দারিদ্র জনগোষ্ঠী। পাহাড়ের পাদদেশে হাওরবেষ্টিত এলাকা হওয়ায় শীতের তীব্রতাও দেশের অন্যান্য জায়গা থেকে বেশি। পাহাড় থেকে নেমে আসা বাতাসের তীব্র শীতে বিপর্যস্ত জেলার হাওরের মানুষের জনজীবন। বোরো মৌসুম শুরু হওয়ায় ভোরের আলো ফোঁটার আগেই জীবিকার টানে হাওরে কর্মব্যস্ত কৃষকরাও অনুভূত করছেন হাঁড়কাপুনি ঠান্ডা। এমন শীতে প্রশাসনের একটু উষ্ণ সহায়তা চান তারা।
লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের বাহাদুরপুরের হাওরে গিয়ে দেখা যায়, ভোর হওয়ার আগেই কৃষক নেমে পড়েছেন হাওরে। কেউ জমিতে পানি দিচ্ছেন, কেউ লাঙ্গল দিচ্ছেন, কেউবা ধানের চারা রোপণ করছেন। এসময় আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম রাখার চেষ্টার দৃশ্যও দেখা গেছে।
হাওরে কর্মব্যস্ত শাহীন মিয়া বললেন, দেশের অন্যান্য জায়গা থেকে হাওরের ঠান্ডা অন্যরকম। হাওরের মাঝখানে থাকা বাড়িগুলোতে যখন শীত নামে বাইরে বের হওয়ার উপায় থাকে না। তবুও জীবিকার তাগিদে পেটের টানে ঠান্ডা কুয়াশা ভেদ করে কাদা পানিতে নেমে কাজ করতে হয়।
বয়োজ্যেষ্ঠ দস্তর আলী বলেন, প্রত্যেকবছর মাঝে মাঝে কম্বল দিলেও ইবার অখনো পাইছি না। পাইলে তো কাম (কাজ) আইলনে (হতো)। সারাদিন কাজ কইরা রাইতে ঘুমানি গেলোনে ৯যেত) আরামে।
জেলার মানুষ শীতের প্রকোপে পড়লেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেই শীতবস্ত্র বিতরণের তোড়জোড়। তবে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পাওয়া দশ হাজার কম্বল বিতরণ চলছে বলে জানালেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. মোস্তাফিজুর রহমান ইমন। এছাড়াও প্রত্যেক উপজেলায় শীতবস্ত্র বিতরণের জন্য ৩ লক্ষ টাকা উপ—বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন