দুর্বিষহ দিন শেষে ‘সুদিন’

প্রকাশিত: ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০৮:২৪

২০০৯ সাল থেকে ২০২৪। দীর্ঘ এই ১৫ বছর রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দেওয়া ২০০৯ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলো দলটি। এ নির্বাচন নিয়ে জন মনে কোনো প্রশ্ন না থাকলেও পরের তিন নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ছিলো ভোটারদের মাঝে। আওয়ামী লীগের বাইরের সকল ভোটাররা এসব নির্বাচনকে অবৈধ নির্বাচন ছাড়া আর কিছু বলতেই রাজি ছিলেন না, এখনো নন। এ নিয়ে এক যুগের বেশি সময় ধরে আন্দোলন—প্রতিবাদ করেছে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো। একই প্রতিবাদে সরব ছিলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ একাধিক ইসলামি রাজনৈতিক দলও। বিএনপির এমন প্রতিবাদের কারণে রাজনৈতিক ইস্যুতে দেশব্যাপী ১ লক্ষ ৪২ হাজার ৮২৫টির বেশি মামলায় আসামী হয়েছেন ৫০ লাখ ৩৩ হাজার নেতাকর্মী। এসব মামলা ও আসামীদের মধ্যে শান্তিগঞ্জ উপজেলার নেতাকর্মীরাও ছিলেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, শান্তিগঞ্জ উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে ৭ টিতেই রয়েছেন বিএনপির রাজনৈতিক মামলার আসামী। শুধুমাত্র পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নে বিএনপির কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করে নি পুলিশ কিংবা আওয়ামী লীগ। ১৫ বছরের বিভিন্ন সময়ে সাত ইউনিয়নে মামলা হয়েছে মোট ছয়টি। এর মধ্যে পুলিশ এসল্ট, ভোটের বাক্স ছিনতাই, দ্রুত বিচার আইন, গাড়ি ভাঙচুর ও নাশকতার মামলাও রয়েছে। আসামী করা হয়েছে বিএনপির ৮৫ নেতাকর্মীকে। তাদের মধ্য থেকে ২৪ নেতাকর্মী কারাবরণ করেছেন বিভিন্ন মেয়াদে। কেউ কেউ একাধিকবারও জেলে গিয়েছেন। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়েও কারাবরণ করেছেন আলী আহমদ দুলাল নামের শান্তিগঞ্জের যুবদলের এক কর্মী। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ ছিলো তার উপর। সরকারের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর মুক্তি পেয়ে দেশে এসেছেন তিনি। স্বামী বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার কারণে একটি মামলায় আসামী করা হয়েছিলো সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নূর আলীর স্ত্রী পারভীর নূরসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের।
এছাড়াও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নে সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আনছার উদ্দিন ও ফারুক আহমদ বলয়ের সর্বোচ্চ ৩৫ নেতাকর্মী মামলায় আসামী হয়েছেন। আনছার উদ্দিনসহ বিভিন্ন সময়ে এসব মামলায় ইউনিয়নের ১০ নেতাকর্মী  কারাবরণ করেছেন। ঢাকার একটি মামলা ও গায়েবি মামলাসহ  ৮টি মামলার আসামী করা হয়েছিলো আনছার উদ্দিনকে। তাঁকে গ্রেফতারের পর কোমরে রশি বেঁধে ধরে নিয়েছিলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফারুক আহমদ শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকার পরও তাঁকে সকল ক্ষমতার বাইরে রাখা হয়েছিলো, আরও এক অদৃশ্য ক্ষমতা খাটিয়ে। ৪ টি মামলার আসামী ছিলেন তিনি। তাঁকে গ্রেফতার করতে বাড়ি, পাড়া মহল্লা এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে অভিযান কেও নি পুলিশ। গ্রেফতার এড়াতে নিজের বাড়িতে ঘুমান নি ফারুক আহমদ। দুর্বিষহ রাত কাটিয়েছেন হাওরে হাওরে, ধানি জমিতে। হাওরেই সাড়তে হয়েছে খাবার—দাবার। 
আনছার উদ্দিন ছাড়াও প্রাক্তন ইউপি সদস্য ও উপজেলা বিএনপির প্রবীণ নেতা আবদুল আউয়াল, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাস্টার শফিকুল ইসলাম, বিএনপি নেতা আলা উদ্দিন আলাই, যুবদল নেতা শহিদুল ইসলাম মুন্সি, সুজন উদ্দিন (বর্তমানে প্রবাসী), পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি শাহিদ আহমদ, উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাহাদত হোসেন কামরান, ছাত্রদল নেতা মানছুর আহমদ ও জেলা প্রজন্মদলের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম কারাবরণ করেছেন। 
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মামলার আসামী হতে হয়েছিলো দরগাপাশা ইউনিয়নকে। এই ইউনিয়নের ১৭ নেতাকর্মীর উপর মামলা হয়েছিলো। এর মধ্যে ৭ জন বিভিন্ন মেয়াদে কারাবরণ করেছেন। তারা হলেন— উপজেলা বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত  কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও দরগাপাশা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রওশন খান সাগর, একই কমিটির প্রচার সম্পাদক হিফজুর রহমান চৌধুরী দিদার, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সুহেল মিয়া, ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ছালিক আহমদ, যুবদল নেতা শ্যামল চৌধুরী, উপজেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ওবায়দুল করিম মাছুম ও ছাত্রদল নেতা আবু তাহের ইমন। 
পাথারিয়া ইউনিয়নে মামলার আসামী সংখ্যা ১১ জন। তার মধ্যে একজন কারাবরণ করেছেন। তিনি হলেন— বিএনপি নেতা শাহ আলম। পূর্ব পাগলা ইউনিয়নে আওয়ামী মামলার আসামী হয়েছেন ৮ জন বিএনপি নেতা। তাদের মধ্য থেকে কারবরণ করেছেন ২ নেতা। সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদাল হোসেন ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাশেম নাঈম। জয়কলস ইউনিয়নের ৭ জন মামলার আসামী হলেও জেল খেটেছেন ৪ নেতাকর্মী। 
কারাবরণকারীরা হচ্ছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নূর আলী। উপজেলায় যতগুলো মামলা হয়েছে, পাগলার মামলা ছাড়া প্রায় সবগুলো মামলাতেই আসামী তিনি। জেল খেটেছেন একাধিকবার। তার স্ত্রীকেও আসামী করেছিলো পুলিশ। অন্যান্য কারাবরণকারীরা হলেন— বিএনপি নেতা নূরুল ইসলাম, জেলা প্রজন্মদলের সাংগঠনিক সম্পাদক শব্দেন নূর আহমদ সাগর, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ইয়াহিয়া পারভেজ। শিমুলবাঁক ইউনিয়নে মামলার আসামী হয়েছিলেন ৫ জন। গ্রেফতার এড়াতে দুর্বিষহ ফেরারি জীবন কাটিয়েছেন তারা। পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নে আসামী হয়েছিলেন ১ জন।
মামলার শিকার হয়েছেন এমন একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা যায়, যারা জেলে গিয়েছিলেন তাদের কম কষ্ট হয়েছিলো তখন। যারা পালিয়ে বেড়িয়েছেন তারাই বেশি কষ্টে ছিলেন। দুর্বিষহ ফেরারি জীবন কাটিয়েছেন তারা। হাওরের মধ্যে খড় দিয়ে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে (উরা) এই ঘরে থাকতে হয়েছে তাদের। কেউ কেউ খড়ের মধ্যে বসে রাত কাটিয়েছেন। হাওরেও পুলিশ হামলা করেছিলো। ভয়ে ধানি জমির মাঝখানে মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে হয়েছিলো তাদের। লুকিয়ে খাবার নিয়ে গেলে পলাতকরা ভাত খেয়েছেন. না হলে না খেয়ে থাকতে হয়েছে তাদের। বাড়ির বাইরে, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে থাকতে হয়েছে। ব্যবসায় বাণিজ্য করার কোনো উপায় ছিলো না। দোকান থেকে তুলে নিয়ে গেছে র্যাব—পুলিশ। এমন দুর্বিষহ দিন থেকে মুক্তি পাওয়ায় খুশি তারা। এখন তারা দাবি করছেন মূল্যায়নের। দুর্দিনে যেসব নেতাকর্মী দল ছাড়েননি, কষ্টে দিন কাটিয়েছেন, জেল খেটেছেন তারা এখন এই ত্যাগের মূল্যায়ন চান।
উপজেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ওবায়দুল করিম মাছুম, সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেন কামরান ও ছাত্রদল নেতা মানছুর আহমদ বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে পারি নি। মিছিল থেকে ধরে নিয়ে গেছে। নাশকতার মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়েছে। পুলিশ তার ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করেছে। তবু আমরা রাজনীতির মাঠ থেকে সরে যাই নি। এখন সময় এসেছে মূল্যায়নের।  নেতাদের কাছে দাবি, প্রকৃত ত্যাগীরাই যেনো মূল্যায়িত হন।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাশেম নাঈম বললেন, আমরা যে কষ্ট শিকার করেছি শুধুমাত্র গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। আমাদের কষ্ট সার্থক হয়েছে। এখন বিএনপির কমিটি হবে। আমরা দাবি করছি, যারা ত্যাগী ছিলেন তারাই যেনো মূল্যায়িত হন। একই মন্তব্য করলেন, পূর্ব পাগলা ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদাল হোসেন, দরগাপাশা ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ছালিক আহমদ ও যুবদল নেতা শ্যামল চৌধুরী।
সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নূর আলী বলেন, উপজেলায় এমন কোনো মামলা নেই, যে মামলায় আমি আসামী হইনি। আমার স্ত্রীকেও আসামী করেছিলো পুলিশ।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও  উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ বলেন, দীর্ঘদিন আমি নিজেও বাড়িতে থাকতে পারিনি। আমার অসুস্থ ছেলেকে দেখতে পারিি ন। পুলিশ আমাদেরকে হন্য হয়ে খুঁজেছে। যারা আমাদের সাথে রাজনীতি করে জেল—জুলুমের শিকার হয়েছেন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তারাই যেনো মূল্যায়িত হন ঊর্ধ্বতন নেতাদের প্রতি আমার সেই অনুরোধ থাকবে। অনেকে জেল খেটেছেন, অনেকে জেলে না থেকেও অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেক নেতাকর্মী। আমার অনুরোধ ও চেষ্টা থাকবে সেইসব নেতাকর্মীরাই যেনো সকল কমিটিগুলোতে মূল্যায়ন পান। আমি তাদের জন্যই কথা বলবো।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আনছার উদ্দিন বলেন, আমাদের নেতা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান ইতোমধ্যে একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন, ত্যাগী নেতাকর্মীরা যেনো কমিটিতে স্থান পান। আমি নিজেও নির্যাতিত। গায়েবি মামলা, নাশকতা মামলাসহ ৮টি মিথ্যা মামলায় আমাকে জড়িয়েছিলো লুটেরার দল। জেল খেটেছি। কোমরে রশি বেঁধে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো পুলিশ। আমি চাইবো, আমার নেতাকর্মী যারা জেল—জুলুম, মামলার শিকার হয়েছেন, তারা যেনো কমিটিতে মূল্যায়িত হোন। এতোদিন যারা আওয়ামী লীগ, মন্ত্রী, এমপির কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন— এমন দালাল চাটুকাররা যেনো কমিটিতে স্থান না পায়, সেদিকে দৃষ্টি রাখবো। 
 

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার