প্রকাশিত: ১৫ জানুয়ারি, ২০২৫ ০৬:৫২
শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে যাওয়ায় নদীর তীরবর্তী ঢালু ও পতিত জায়গাকে কাজে লাগিয়ে পারিবারিক সবজি বাগান করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন নদী তীরবর্তী মানুষ। এই ফসল ফলানোর ঐতিহ্য জেলার নদী তীরবর্তী মানুষের যুগ—যুগের। উৎপাদিত সবজি নিজেদের পুষ্টির চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি সবজি বিক্রি করে প্রান্তিক পরিবারগুলোর উপার্জন হচ্ছে অর্থ। এতে একদিকে অনাবাদি জায়গা আবাদের আওতায় আসছে। অন্যদিকে পতিত জায়গার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে শাক—সবজি উৎপাদনের মাধ্যমে সচল থাকছে অর্থনীতির চাকা। পাশাপাশি নদী কিনারের সবুজ শ্যামল পরিবেশ আর ভিন্ন রঙের ফোঁটা শাক সবজির ফুলে বৃদ্ধি পাচ্ছে নদী তীরবর্তী এলাকার সৌন্দর্য। পতিত জমি কৃষির আওতায় থাকলে নিরাপদ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে দেশ। সরকার থেকে দেশের প্রত্যেক ইঞ্চি জমির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহবান থাকলেও কোথাও কোথাও এমন সবজি বাগান করতে বাধা দিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, জেলায় সকল উপজেলায় নদীর পাড় বা চরে সবজি আবাদ হয়। প্রায় ৫শ’ হেক্টর জমিতে শাক সবজি আবাদ হয়। এসব জমিতে উৎপাদিত সবজির মূল্য বছরে প্রায় ৪ কোটি টাকা।
সরেজমিনে বড়পাড়া এলাকার নদীর তীরে গিয়ে দেখা যায়, নদীর নীচ থেকে উপরের চর পর্যন্ত হরেক রকমের সবজিতে ছেয়ে আছে কয়েক কিলোমিটার জায়গা। সরিষার হলুদ ফুল আর পেঁয়াজ—মুলার সাদা ফুলের মাঝে মাঝে লালশাক। হরেক রকমের শাক সবজির ঘ্রাণ আর সৌন্দর্য যে কাউকে বিমোহিত করবে।
স্থানীয় খেটে খাওয়া নজির, হাফিজ, রুবেল, নাসির, নুরুল, মকব্বির, সুলেমান, একরাম, মনির সহ অন্তত ৩০—৪০টি প্রান্তিক পরিবার করেছেন নিজেদের পারিবারিক সবজি বাগান। পেঁয়াজ, রসুন, আলু, মুলা, লালশাক, ডুগি শাক, কাঁচামরিচ, টমেটো, বেগুন, সরিষা, বাদাম, স্কোয়াশ, শিম, লাউ, গাজর, ধনিয়া, শসা, বরবটি, করলা, পরশুরি সহ বিশ থেকে ত্রিশ জাতের শাক সবজিতে ভরপুর বাগান। কেউ বাগানে পানি দিচ্ছেন, কেউ ছিটাচ্ছেন ওষুধ। নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে সবজি বাগান পরিচর্চার মাধ্যমে অবসর সময়ও কাটাচ্ছেন অনেকে। উৎপাদিত এসব সবজি নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করছেন স্থানীয় বাজারে। কেউ উপহার হিসেবে দিচ্ছেন নিজেদের বাগানের তাজা নিরাপদ সবজি। এতে সাশ্রয় হচ্ছে নিজেদের ও আত্মীয়ের পরিবারগুলোর সবজি কেনার অর্থ।
ইসমাইল মিয়া বলেন, নদীর পাড়ে ও ঢালু জায়গা খালি পড়ে থাকে। প্রত্যেক বছর নতুন পলি আসায় এই জায়গা অনেক উর্বর থাকে। ফসল ফলাতে খুব একটা কষ্ট করতে হয় না। পড়ে থাকার চেয়ে ফসল উৎপাদন করলে দোষ কি। একটি পরিবারের যদি কিনে সবজি খেতে না হয় সেটা দেশের জন্য ভালো। বাজারে এই একটি পরিবারের সবজি উদ্ধৃত্ত্ব থাকবে। দেশের খাদ্য ঘাটতি ও শাক সবজির দাম কমবে।
মাহমুদুল হাসান বলেন, এখানে সবজি করায় জায়গাগুলো নিরাপদ আছে। সবজি চাষ না করলে অবৈধ দখলদাররা বালু, পাথর ডাম্পিং স্টেশন বানিয়ে ব্যবসা করে, খালি জায়গা পেলে মাটি কেটে বিক্রি করে। সবজি বাগানগুলোর পাশেই যেখানে সবজি চাষ হয় নি সেখানের মাটি নেই। মাটিখেকোরা মাটি কেটে বিক্রি করে দিয়েছে। প্রশাসনের বুঝতে হবে নদী পাড়ের মাটি কাটার চেয়ে সবজি উৎপাদন ভালো।
নজির আহমেদ বলেন, বিশ হাজার টাকা খরচ করে গড়া এই বাগানে আশা করছি পঞ্চাশ হাজার টাকার সবজি পাবো। আমার বাপ দাদারা এভাবেই নদীর পাড়ে বাগান করে আসছেন। কোনদিন কেউ এসে বাধা দেয় নি। হঠাৎ এবার এসিল্যান্ড স্যার এসে বললেন, সরকারি জায়গায় বাগান করা যাবে না, সবকিছু সরিয়ে ফেলতে। আমাদের বাগান সরিয়ে এসিল্যান্ড স্যার কি মাটি খেকো আর ব্যবসায়ীদের জায়গা করে দিতে চান।
নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার মো. ইসমাইল রহমানকে টানা তিনদিন মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করার পর তার বক্তব্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, সরকারি জায়গায় কোন কিছু করতে হলে অনুমতি নিয়ে করতে হবে। তারা যদি বাগান করতে চায়, সরকারকে রাজস্ব দিয়ে ইউএনও স্যারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে করতে হবে। রাজস্ব না দিয়ে সরকারি জায়গায় কিছু করা যাবে না। বড়পাড়ায় সরকারি জায়গায় স্থাপনা বানিয়ে দখল করা হচ্ছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে নালিশ করে। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় তাই সবজি বাগান না করার জন্য বলে আসছি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন