প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারি, ২০২৫ ০৮:১৫
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সুবিপ্রবি’র) এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রীবাহী বাসের চালকের দ্বন্দ্ব, কথা কাটাকাটি এবং পরে ওই শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কাম্পাস। সোমবার সকাল দশটায় এই ঘটনায় ঘটে।
ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সুনামগঞ্জ—সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানায়। এসময় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিশ^বিদ্যালয় কতৃর্পক্ষ এবং পরিবহন শ্রমিক নেতাদের হস্তক্ষেপে ৪৫ মিনিট পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। বিকালে শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী অভিযুক্ত হেলপার গিয়ে শিক্ষার্থী ও বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে ক্ষমা চাইলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
জানা যায়, সুনামগঞ্জ শহর থেকে সোমবার নয়টা দশ মিনিট থেকে নয়টা বিশ মিনিটে ছেড়ে যাওয়া বাসে শান্তিগঞ্জের সুবিপ্রবি’র ক্যম্পাসে যাচ্ছিলেন শিক্ষার্থী আল—নাহিয়ান। শিক্ষার্থীরা বাসে হাফ ভাড়া দেবে দাবি করায় পরিবহনের হেলপারের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় আল—নাহিয়ানের। এসময় আরও কয়েকজন ছাত্র এবং বিশ^বিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রক্টরও ছিলেন। শান্তিগঞ্জে বাস থামানোর পর দুইপক্ষে কথা কাটাকাটি আরও বেড়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সেখ আব্দুল লতিফ বিষয়টি সুরাহার জন্য মধ্যস্থতার চেষ্টা করেন। ঝামেলা মিটিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইন্সটিটিউটের সুবিপ্রবি’র অস্থায়ী ক্যাম্পাসে ফিরে আসার সময় শিক্ষার্থী আল—নাহিয়ানের গায়ে হাত তুলে বাসের হেলপার। রক্তাক্ত হন আল—নাহিয়ান। তার ডান হাতে সেলাই লেগেছে ৮টিরও বেশি। আল—নাহিয়ান সুবিপ্রবির পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। সহপাঠীর এমন অবস্থা দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন অন্যান্য শিক্ষার্থীরা। তারা ক্যাম্পাস ছেড়ে সড়কে চলে আসে। বন্ধ হয়ে যায় সিলেট—সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের সব ধরণের যান চলাচল। দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। অ্যাম্বুল্যান্স, বিদেশ যাত্রী ও পরীক্ষার্থীদের পাস দিচ্ছিলেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পেঁৗনে এক ঘণ্টার চেষ্টায় অবরোধ তুলে নিতে রাজি হন শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীরা শর্ত দেন দুই ঘন্টার মধ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতির সুষ্ঠু সমাধান দিতে হবে। পরে সুবিপ্রবি’র অফিসে আলোচনায় বসে পরিবহন শ্রমিক নেতাদের কাছে ছয় দফা দাবি জানিয়ে বিকাল ৪ টার মধ্যে এই ঘটনার সমাধান চান তারা। না হলে বিকালে আবারো আন্দোলনে নামার হুমকি দেন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা জানান, প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকেই আমরা দাবি করে আসছি— সুবিপ্রবির সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাড়া অর্ধেক করতে হবে। সারা দেশে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাফ পাশ আছে। আমাদেরও থাকতে হবে। ইতোমধ্যে পরিবহনের মালিক সমিতিসহ সবখানেই আমরা এই দাবি করেছি। পরিবহন শ্রমিকরা হাফ পাশ বললে আমাদের সাথে তর্ক করে, ঝগড়া লেগে যায়, কটু কথা বলে। মেয়েদের সাথে বিশ্রী আচরণ করে। এটা আমরা এতোদিন সহ্য করে এসেছি। আজ আমাদের প্রক্টর স্যারসহ বাসে আসার পথে ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু করে হেলপার। বলে, আমাদেরকে গাড়ি থেকে নামতে দেবে না। প্রক্টর স্যারের সাথেও বেয়াদবি করেছে। ক্যম্পাসের সামনে এসে নামিয়ে দেওয়ার সময় উত্তেজিত হয়ে পড়ে হেলপার। স্যার কথা বলে আমাদেরকে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে আসার সময় সহপাঠী নাহিয়ানের উপর হামলা করে হেলপার। সে গুরুতরভাবে আহত হয়। হাতে ৮ টিরও বেশি সেলাই দিতে হয়। শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে তাকে চিকিৎসা করানো হয়েছে। এরপর সকলেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। সড়ক অবরোধ হয়। স্যাররা আশ্বস্ত করেছেন, দ্রুত এর সমাধান দিবেন। পরিবহনের দুই নেতা এসেছিলেন। ডিন স্যার, প্রক্টর স্যার, অন্যান্য স্যার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসনের সামনে আমার ছয়টি দাবি তুলে ধরেছি। এরমধ্যে অভিযুক্ত চালক হেলপারকে ইউনিভার্সিটিতে এসে সবার সামনে ক্ষমা চাইতে হবে। স্যারের সাথে বেয়াদবির জন্য আলাদা করে স্যারের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
আহত শিক্ষার্থী আল নাহিয়ান বলেন, আমাদের অন্যান্য দাবিগুলো হচ্ছে ২৪ ঘন্টার মধ্যে সিলেট—সুনামগঞ্জ রুটে সুবিপ্রবির সকল শিক্ষক—শিক্ষার্থীর হাফ পাশ নিশ্চিত করতে হবে। সকল শিক্ষক—শিক্ষার্থীর সাথে মার্জিত আচরণ করতে হবে। প্রতি বাসে হাফপাশের লিফলেট টাঙাতে হবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা একজন হলেও বাস দাঁড়িয়ে থেকে তাকে নিয়ে যেতে হবে।
নাহিয়ান জানালেন, তাদের স্যারের সঙ্গে হেলপার বাজে আচরণ করে, তখন তারা প্রতিবাদ করে। একপর্যায়ে ক্যাম্পাসে আসার সময় পেছন থেকে তার উপর হামলা করে হেলপার।
সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের কোস্টার শাখার সভাপতি বশির আহমদ বললেন, সুনামগঞ্জ শহর থেকে বিশ^বিদ্যালয়ের সাতজন শিক্ষার্থী শান্তিগঞ্জের বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসেন। তাদের কাছ হাফ ভাড়া ১৫ টাকা করে আদায় হয়। জয়কলস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড.সেখ আব্দুল লতিফ ওঠেন এই বাসে। তার কাছে হেলপার ভাড়া চাইলে শিক্ষার্থীরা বলেন, স্যার কেন ভাড়া দেবেন, এ নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। এখানে কেউ কাউকে মারধর করে নি। নামার সময় গাড়ির গ্লাস ভাঙতে গিয়ে একজন শিক্ষার্থী হাতে ব্যাথা পান। আমাদের হেলপার রূঢ় আচরণ করেছেন। এজন্য আমরা বিকালে তাকে নিয়ে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিকট দুঃখ প্রকাশ করিয়েছি, সে তার ভুলের জন্য ক্ষমাও চেয়েছে।
সুনামগঞ্জ পরিবহণ শ্রমিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নূরুল হক বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি জানিয়েছেন, আমরা এ নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে কথা বলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবো।
শিক্ষার্থীদের দাবি দাওয়ার বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সেক্রেটারী জুয়েল মিয়া বললেন, শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল সুনামগঞ্জ থেকে শান্তিগঞ্জে আসতে হাফ ভাড়ার, আমরা সেটি কার্যকর করেছি। এখন সিলেট থেকে শান্তিগঞ্জ আসার বিষয়টিও ওঠেছে। এই বিষয়ে মালিক সমিতি এবং শিক্ষার্থীগণ বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টর ড. সেখ আব্দুল লতিফ বলেন, আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। বাসের কন্ট্রাক্টর বেয়াদবি করেছে। ছেলেরা উত্তেজিত হওয়ার পর আমি তাদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে আসার সময় নাহিয়ানের উপর হামলা করে বসে ওরা। ছেলেটি মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে।
সুবিপ্রবির ডিন অধ্যাপক হারুনুর রশিদ বললেন, এটা অত্যন্ত উদ্বেগের কথা। হাফপাশ চাইলে ছেলেদের উপর হাত তুলতে হবে কেনো। এটা চরম অন্যায় হয়েছে। বিকেলে পরিবহন শ্রমিকরা ক্ষমা চাওয়ার পর উভয়পক্ষকে শান্ত থাকার কথা বলেন অধ্যাপক হারুনুর রশিদ।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুকান্ত সাহা বলেন, সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে আমরা ঘটনাস্থলে চলে এসেছি। শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে সড়ক অবরোধ আধাঘন্টার ভেতরেই তুলে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা খুবই মার্জিত আচরণ করেছে। বাস চালক যা করেছে তা মোটেও উচিত হয় নি। বিকেলে অভিযুক্ত হেলপার ক্ষমা চেয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি দাওয়া মানা হবে আশ^াস দেওয়ায় পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন