ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ডাকবাংলো এখন বর্জ্যের ভাগাড়

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৭:৫২

ইতিহাস আশ্রিত অনেক স্থাপনা আমাদের দেশে আজ হুমকির মুখে। যদিও এটা অনেক পুরনো খবর। তবে নতুন খবর হচ্ছে ধ্বংসের মিছিলের লম্বা সারিতে এবার যোগ হচ্ছে শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা বাজারের শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ডাকবাংলো। উপজেলার পাগলাবাজারে মূল কেন্দ্রে অবস্থিত এই বাংলো তার শত বছরের ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে কালের মহাপরিক্রমায়। ব্রিটিশ শাসনামালে নির্মিত এই বাংলো অব্যবহৃত থাকায় বলতে গেলে পুরোপুরি নষ্ট হয়েই গিয়েছিলো। ২০০৪ সালের দিকে তৎকালীন পশ্চিপ পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল আলম নিক্কুর উদ্যোগে উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে পুরনো আদলে পুনঃনির্মাণ করা হয় চৌচালা বিশিষ্ট এই ভবন। ভবনের আশপাশে রয়েছে প্রচুর ফাকা জমি। আনুমানিক ১ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই বাংলোর ফাকা জমির  সৌন্দর্য বাড়ানোর কথা থাকলেও ক্রমশ ডাস্টবিনে পরিণত হচ্ছে। এখন এই স্থাপনাকে অঘোষিত পাবলিক টয়লেট বললেও ভুল হবে না। অভিভাবকহীন হয়ে থাকায় বাংলোটি আজ ধ্বংসস্তুপ পরিণত হচ্ছে।
স্থানীয় প্রবীণ লোকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই বাংলোতে এক সময় ফুলের বাগান ছিলো। বাংলোর আশপাশে বেড়ে উঠা এসব বাগান থেকে সুমিষ্ট ঘ্রাণ ভেসে আসতো বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। অত্যন্ত সুন্দর হওয়ায় এলাকার বিশিষ্টজনের আড্ডাস্থল ছিলো বাংলোটি। সভা—সমাবেশ, নাটক ও ইসলামী জলসার জন্য উপযুক্ত স্থান ছিলো এটি। আপন ঐতিহ্যের গড়িমায় উদ্ভাসিত এই বাংলোটি কিছুক্ষণের জন্য হলেও তার বুক পেতে নিয়েছিল বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে। দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, বাউল স¤্রাট শাহ্ আবদুল করিম, প্রয়াত রাজনীতিক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ, কৃষক—শ্রমিক—জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, এরশার সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী, সাবেক অর্থ প্রতিমন্ত্রী ফারুক রশিদ চৌধুরীসহ জাতীয় সংসদের অনেক জ্ঞাণী—গুণী ব্যক্তিবর্গের সেকেন্ড—মিনিট—ঘন্টার আশ্রয়স্থল ছিলো এই বাংলো। কিন্তু সরকারি সম্পদ আজ পরিচর্চার অভাবে শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। মেহগনি, সেগুন, জামগাছগুলো এখন আর নেই। অর্ধশত বছরের পুরনো বিশালাকার দুটি রেইন্ট্রি গাছ শুধু ডাক বাংলোকেই নয় সারা বাজারকেই বৃষ্টি, ঝড়, জলোচ্ছাস থেকে ছাতার মত আগলে রেখেছে। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে যখন সন্ধ্যা নামে সারা বাজার বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হলেও বিদ্যুতের আলো জ্বলেনা ডাক বাংলো প্রাঙ্গণে। ফলে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে পাল্টে যায় তার দৃশ্যপট। অন্ধকারে ডুবে যায় বাংলো প্রাঙ্গণ।
প্রাচীন এই স্থাপনা সুনামগঞ্জ জেলা সড়ক ও জনপথের দায়িত্বে থাকলেও এদিকে যেন দেখার সময় নেই তাদের। সময়ের পালাবদলের সাথে সাথে নেতৃত্বও পাল্টে। নির্বাচনী ইশতেহারও আসে শত শত প্রতিশ্রম্নতি। কিন্তু কারো মুখে কোন দিনই ডাক বাংলো উন্নয়নের কথা থাকে না। কোন কোন সময় স্থানীয় যুবকদের বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে এই ডাক বাংলো। তাদের হাত ধরে সামনের দিকটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হলেও আঁধার ও নোংরামি ঢেকে রাখে পেছনের দিকটা। কোনও কোনও শীতে যদিও রাতের আঁধারে আলো জ্বলে ব্যাডমিন্টন কিংবা ফুটবল খেলার সময় তবে তা ক্ষণিকের জন্যই। ডাক বাংলোর বর্তমান অবস্থা দেখে এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকে ক্ষোভের সাথে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, এখনই যদি এটি রক্ষার কোন কার্যকরী পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে ভূমি খেকোদের পেটস্ত হতে পারে সরকারি এই সম্পদ। তারা চাইছেন, বাংলোটিকে যেনো সরকারিভাবে শ্রীবর্ধন করা হয়। চারদিকের ময়লা পরিষ্কার করে লাইটিং করে আলোকিত করার তাগিদ দেন এলাকাবাসী। কালের স্বাক্ষী এই বাংলোটিকে সরকারি বিশ্রামাগার করা যেতে পারে বলেও মতামত দিয়েছেন অনেকে। আবার চারদিকের পরিবেশের উন্নয়ন করে বৈকালিক বিনোদনের স্থান করে দেওয়ার কথাও অনেকে বলেন।
এ প্রসঙ্গে সমাজকর্মী জহিরুল ইসলাম বলেন, পাগলার এই ডাক বাংলোর সাথে আমাদের কৈশোর, যৌবন জড়িত। আমরা তখন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী। আমাদের সকল সভা—সমাবেশ ডাক বাংলোতে করতাম। চার দিকটা কত সুন্দর ছিলো। এখন আর সেসব নেই। ডাক বাংলোকে হঠাৎ কেউ দেখলে পাবলিক টয়লেট ভাববে। বাংলোটির কথা ভাবলে চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। আমাদের দাবি, আমাদের এলাকাবাসীর আবেগের জায়গা বাংলোটিকে যেনো শ্রী বর্ধন করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি বলেন— ডাক বাংলোর সামনে সড়ক ও জনপথের ভূমির উপর গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। ফলে ঐসব স্থাপনার আড়ালে পড়ে আছে ডাক বাংলো। ভয়ংকর কথা হচ্ছে বাংলোটির প্রধান গেইটের সামনেই বসেছে তিনটি দোকান। ডাক বাংলোতে প্রবেশের পথ আপাতত বন্ধ। এসব দোকান সরিয়ে বাংলোটির সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে হবে।
পরিবহন শ্রমিক বজলুর রহমান বলেন, নব্বইয়ের দশকে আমরা ডাক বাংলো প্রাঙ্গণে নাটক করেছি। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করতাম এই ডাক বাংলোতে। দুইটি গন্ধরাজ ফুলের গাছ ছিলো এখানে। তার ঘ্রাণে এলাকায় ম—ম করতো।
পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল আলম নিক্কু বলেন, পাগলা বাজার ডাক বাংলো একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের অনেক বড় বড় ব্যক্তিদের পদার্পণ ঘটেছিলো এখানে। এখানে অনেক বড় বড় জনসভা ও সমাবেশ হয়েছিল। তৎকালীন সময় এটার তত্ত্বাবধানে ছিলেন ময়না মিয়া নামের সুহৃদয় এক ব্যক্তি। তিনি মারা যাওয়ার পর ধীরে ধীরে নব্বই দশক থেকে এটা পরিত্যাক্ত হতে থাকে এবং এক সময় আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়। আমি ২য় মেয়াদে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর এটাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে আমার অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করি। ১/১১ এর সময় এই স্থাপনা ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে পুনরায় পরিত্যাক্ত ও আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়। এটার সংস্কার জরুরি। 
শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ বলেন, এটা আমাদের তত্বাবধানে পড়ে না। স্থাপনাটি সড়ক ও জনপথের অধীনে। তবে ডাক বাংলো সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে কথা বলবো।
সুনামগঞ্জ জেলা সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম প্রাং বলেন, ডাক বাংলো সম্পর্কে আমরা অবগত। প্রথমে আমরা অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করবো। তারপর সৌন্দর্য বৃদ্ধির বিষয় নিয়ে ভাববো।


 

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার