প্রকাশিত: ১৪ মার্চ, ২০২৫ ০৮:৩৭
তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন সীমান্তে কয়লা চোরাচালানে বড়দের সাথে জড়িয়ে পড়ছে স্থানীয় শিশুরা। শিশুদের সহানুভূতি কাজে লাগিয়ে এই কাজ করাচ্ছে চোরাকারবারি চক্র। স্কুল ফাঁকি দিয়েও অনেক শিশু বহন করছে চোরাই কয়লা। লেখাপড়ার চাইতে টাকা উপার্জনের দিকেই তাদের মনোযোগ বেশি। মা-বাবা অভিভাবক নিজেরাই পাঠাচ্ছেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ কাজে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো পরিবারই যুক্ত হচ্ছে কয়লা চোরাকারবারিতে। পেটের তাগিদে বাধ্য হয়ে এমন কাজ করছেন দাবি পরিবারগুলোর। এতে শিশুদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়বে এবং অবৈধ কাজে উৎসাহিত হবে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরেজমিনে তাহিরপুর উপজেলার ট্যাকেরঘাট সীমান্তে দুইদিন ও এক রাত অবস্থান করে দেখা যায়, কয়লা চোরাকারবারে পরিবারসহ শিশুদের জড়িয়ে পড়ার নানা দৃশ্য। এখানকার বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ পার্শ্ববর্তী ভারত থেকে চোরাই পণ্য আনার সাথে জড়িত। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো এই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে শিশুদের। শিশুদের শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কয়লা ক্যারিংয়ে। (বহনকারী)। বড়দের সাথে সমানতালে কয়লা বহন করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাচ্ছে তারা। শিশুদের উপর বিজিবির সহানুভূতির কারণে যুক্ত করা হয় তাদের। শিশুদের পেছনে দৌড়ে বিজিবি সদস্যদের কয়লা জব্দ করার দৃশ্যও চোখে পড়েছে।
অবস্থানকালে দেখা যায়, ফিল্মি স্টাইলে নীলাদ্রি লেক পাড়ের সাইড ধরে ও স্মৃতিসৌধের পেছনে ধানের জমির পাড়ে বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে চোর পুলিশের খেলার মতো কয়লা বহন করছে শিশুরা। এর মাঝে একবার বিজিবিকে দেখে বস্তা নিয়ে দৌড়ে ক্ষেতের মাঝে চলে যায় দুই শিশু। অনেক দৌড়ঝাঁপ করে একটি শিশুকে ধরে তার সাথে থাকা কয়লা জব্দ করে বিজিবি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই খেলা। কথা হয় এসব কয়লা ক্যারিয়ার অনেক শিশুদের সাথে। জানতে চাই কেন যুক্ত হচ্ছে, এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাহাড় থেকে বস্তা আসার পর বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে প্রত্যেক বস্তা কয়লা ডিপো পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারলে মিলে নগদ অর্থ। অনেকে বড়দের সাথে পাহাড়ের খনিতেও চলে যায়। যেখানে গর্তে চাপা পড়ে কিংবা অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি।
কয়লা ক্যারিয়ারদের একজন হুমাশা (ছদ্মনাম)। ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। দুপুর একটায় ছোট্ট আরেক বোন, মা, ও দাদী চারজন একসাথে মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছেন চোরাই কয়লা। ডিপোতে বিক্রি করে আসার পথে কথা হয় এই পরিবারের সাথে। হুমাশার মা বলেন, স্কুল শেষ করেই আসছে। সব সময় মেয়েকে নিয়ে আসি না। মেয়েরা মাঝে মধ্যে আসে।
ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড় থেকে কয়লা নামানোর দৃশ্য। যেই দৃশ্য শ্রেণি কক্ষ থেকে রোজ দেখে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরা জানালেন, আরও ভয়াবহ তথ্য। শিশু ওয়ানের শিক্ষার্থীরাও জড়িয়ে পড়ছে এই চোরাকারবারিতে। ২০২৫ সালের সরকারি জরিপ বলছে, ট্যাকেরঘাট গ্রামে মোট শিশুর সংখ্যা ৫৬৮জন।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক হালিমা বেগম বললেন, আমাদের স্কুলে মোট ২০৬ জন শিক্ষার্থী। স্কুল ফাঁকি দিয়ে অনেক শিশুরা কয়লা চোরাই কাজের সাথে জড়িত হয়। দরিদ্র এলাকা হওয়ায় মা-বাবা জেনে শুনে এই কাজে পাঠাচ্ছে শিশুদের। অনেকে স্কুলে আসে না, আসলেও ফাঁকি দিয়ে চলে যায়। এর জন্য মা-বাবারা বেশি দায়ী। আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ জেনে শুনে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। আমরা নিয়মিত মা সমাবেশ, অভিভাবক সমাবেশসহ অনেক সচেতনতামূলক সভা করে তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। সরকারের কাছে আমার আকুল আবেদন এসব এলাকায় দরিদ্রদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ অনেকটা কমে আসবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন