প্রকাশিত: ২৩ মার্চ, ২০২৫ ২৩:১৪
হাওরের কান্দা ধ্বংস, নষ্ট হচ্ছে গোচরণ ভূমি
‘হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে সরকার স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে হাওরের বোর ফসল নিয়ে বিপাকে পড়বে হাওরবাসী।’ কথাগুলো বলছিলেন, জেলার বৃহৎ বোর ফসলি ধানের হাওর মাটিয়ান হাওর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি বড়দল গ্রামের সিরাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণে বাঁধ সংলগ্ন গোচারণ ভূমি থেকে মাটি নিতে নিতে এখন মাটির সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া গোচারণ ভূমির কোন অস্তিত্ব পর্যন্ত নেই। প্রতি বছর একই স্থান থেকে মাটি কাটার ফলে এমন দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সমস্যা সমাধানে তিনি জানান, প্রতি বছর পাউবো যদি স্থায়ী বাঁধের চিন্তাভাবনা করে তাহলে আগামী ৫ বছর লাগাতার কাজ করলেই হয়তোবা একটি সমাধানে পৌঁঁছা যেতে পারে। প্রতি বছর হাওরে বাঁধের কাজ শুরু হয় ডিসেম্বরের শুরুতে, কিন্তু হাওরপাড়ে মাটি সংকটের কারণে এবছর অনেক বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে মার্চের শুরুতে।
জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার ছোট বড় ২৩টি হাওরে ২০১৭ সাল থেকে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প (পিআইসি) এর মাধ্যমে হাওরের কান্দা কেটে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এছাড়াও কান্দা কেটে হাওর পাড়ের লোকজন নতুন বাড়ির ভিত তৈরি ও মাটি ভরাট করা হয়। এভাবে ধারাবাহিক মাটির কাজ হওয়ায় ২০২৫ সালে এসে বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণে মাটি সংকট দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে এ সংকট প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে কৃষকদের ধারনা।
পরিবেশকর্মীরা জানান, হাওর অঞ্চলের প্রকৃতি ও জীবনের সঙ্গে মিশে আছে কান্দা। এটি হাওরের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা উঁচু জমি হিসেবে পরিচিত। কান্দা হাওরের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের প্রাণকেন্দ্র। হাওরের কান্দা স্থানীয় মানুষের গবাদি পশুর চারণভূমি, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের স্থান এবং মৌসুমি ফসল উৎপাদনের স্থান হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও বর্ষাকালে এগুলো জলজ প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কান্দা কেটে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কারণে হাওরের কান্দাগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
তারা আরও বলেন, হাওর অঞ্চলে বন্যা ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের হাত থেকে রক্ষা পেতে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এই বাঁধ নির্মাণের কারণে হাওরের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। বাঁধের মাধ্যমে পানির প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হলেও প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বাঁধের নির্মাণকাজে কান্দাগুলো কেটে সমান করে ফেলা হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক জলাবদ্ধতা রোধের ক্ষমতা নষ্ট করছে।
হাওরের জীববৈচিত্র্যের প্রাণকেন্দ্র এই কান্দাগুলো রক্ষা করে হাওরের বাঁধ নির্মাণে স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকারকে অনুরোধ করে পরিবেশকর্মীরা জানায়, কান্দাগুলোতে হাওরের প্রচুর প্রজাতির পাখি, মাছ এবং উদ্ভিদের বাসস্থান। এগুলো বিলুপ্ত হওয়ার ফলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বন্যা ও বর্ষার সময় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা কান্দাগুলো বিলুপ্ত হলে মাছের প্রজাতি হ্রাস পাবে। কান্দাগুলো শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবিকার একটি অংশ। কান্দাগুলোর ক্ষয় এবং বাঁধ নির্মাণের ফলে অনেক কৃষক জমি হারাচ্ছেন। গবাদি পশুর জন্য খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে, যা তাদের জীবিকাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
মহালিয়া হাওরপাড়ের বাসিন্দা সুলেমানপুর গ্রামের হাবুল মিয়া বলেন, হাওরে এক সময় বিশাল বড় বড় কান্দা ছিলো। এসব কান্দায় প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে উঠতো বনজাত উদ্ভিদ। যা গবাদিপশু খাদ্য ও জ্বালানি হিসাবে সংগ্রহ করা যেত। বর্তমানে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও অপরিকল্পিতভাবে কান্দা কেটে বাড়ি ভরাট করায় হাওরের কান্দাগুলো উজাড় হয়ে যাচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড তাহিরপুরে দায়িত্বরত উপ-সহাকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন বলেন, এ বছর হাওরে মাটি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কৃষকরা বিকল্প ব্যবস্থা করে দূর থেকে মাটি সংগ্রহ করে বাঁধের কাজ সম্পন্ন করেছে। এতে তাদের তিনগুণ বেশি টাকা খরচ হয়েছে। সামনের বছর এসব হাওরে বাঁধ নির্মাণ করতে মাটির কারণে আরও বেশি সমস্যা হতে পারে। এমনও হতে পারে পিআইসির জন্য কৃষকরা কেউ আগ্রহী হবে না।
সেন্টা ফর ন্যাচারাল রিসোর্স সার্ভিস (সিএনআরএস) এর সুনামগঞ্জ জেলা সমন্বয়কারী ইয়াহিয়া সাজ্জাদ বলেন, কান্দা থেকে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণের কারণে প্রতি বছরই গোচারণ ভূমি সংকোচিত হয়ে পড়ছে। এতে করে প্রাকৃতিক গোখাদ্য সংকট তৈরি হচ্ছে। এছাড়া কান্দার পরিমাণ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন জলজ বন যেমন চাইল্যা, বউল্যা, মটমঠিয়া, নল, খাগড়া, বিন্না, বনতুলশী, গুজাকাটা জাতীয় জলজ বন সংকটাপন্ন এমনকি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছরই বাঁধ নির্মাণে কান্দার মাটি কেটে ফেলায় বর্ষার ঢেউয়ে মাটি নদীতে পড়ে। এতে নদী ভরাট হয়ে নদীর পানি নাব্যতা হারাচ্ছে। যার ফলে আগাম বন্যার প্রবনতা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, হাওরের কান্দাগুলো হাওরের প্রতিবেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো প্রাকৃতিক ভাবেই সৃষ্টি হয়েছে। হাওরের অর্থনীতিতে এই কান্দাগুলো অবদান রাখছে। এই কান্দাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে। কান্দা কেটে বাঁধ নির্মাণ কোনো ভাবেই কাম্য নয়। একই সাথে বাঁধের বিকল্প হিসেবে ব্যাপক ভিত্তিক নদী খনন করা জরুরী। তিনি আরও বলেন, হাওরের কান্দা বিলীন হওয়া রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। হাওরের কান্দা রক্ষা করা না গেলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য যেমন নষ্ট হবে, তেমনি স্থানীয় মানুষের জীবনও ক্রমশ সংকটে পড়বে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুল হাসেম বলেন, কান্দা বিলীন হওয়ার কারণে মাটির সংকট দেখা দিয়েছে, এটি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা পিআইসিদের সচেতন করছি যেন কান্দা কেটে উজাড় করা না হয়। এ বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলবেন বলেও জানান।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন