প্রকাশিত: ২৯ মার্চ, ২০২৫ ০৭:১৩
প্রতিবেদকের গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়া চোরাকারবারিরা। ওরা কয়লা নিয়ে যাচ্ছে ডিপোর দিকে
সারি সারি পাহাড় বেষ্টিত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলা সুনামগঞ্জ। পাহাড়, নদী আর প্রকৃতির অপরূপ মিশেলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা। সবচেয়ে বেশি পর্যটক সমাগম জায়গা তাহিরপুর। তাহিরপুরের এই অপরূপ দৃশ্যের বিপরীতে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর অনেক গল্প। যার ভাজে ভাজে লুকিয়ে আছে নানা রহস্য। এবার আমাদের অনুসন্ধান সীমান্তের অন্যতম আলোচিত তাহিরপুরের ভয়ঙ্কর কয়লা চোরাকারবার ঘিরে।
আমরা এবার যে বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করেছি তা অনেকটাই কঠিন। তার অন্যতম কারণটা হলো, যারা ভুক্তভোগী তারাই অপরাধী। তাহিরপুরের সীমান্তের বিশাল একটা জনগোষ্ঠী জড়িত এমন অপরাধের সাথে। তাই সেখানে কাজ করাটাও অনেকটাই অনিরাপদ। মাঝে মাঝে বিপদের সম্মুখীন হন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরাই। তাই প্রাণের নিরাপত্তায় বিজিবিকে অবগত করেই সীমান্তে অবস্থান।
তাহিরপুরের সীমান্তবর্তী একটি এলাকা টেকেরঘাট। সবার কাছে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেই পরিচিত। তবে আড়ালে নয় অনেকটা প্রকাশ্যেই এখানকার মানুষ চলে যায় ওপারের পাহাড়গুলোতে। উদ্দেশ্য ভারতের পাহাড়ে থাকা কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করে বাংলাদেশে নিয়ে আসা। তারা এগুলোকে অন্যায় মনে করেন না। ফলাফল ভয়াবহ জেনেও প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে ভারতের মেঘালয় থেকে কয়লাসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য নিয়ে আসেন। প্রতি বস্তা কয়লা এনে বিক্রি করেন ৪০০-৪৫০ টাকায়। এই সামান্য অর্থের লোভে কোন নিরাপত্তা ছাড়াই ঢুকে যাচ্ছেন ভয়ঙ্কর কয়লার গর্তের ভিতর। আর এতেই প্রাণ যাচ্ছে বাংলাদেশি নাগরিকদের। তবুও থামছে না কয়লা চোরাকারবারি। চারশো টাকার জন্য জেনে শুনেই জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে কয়লা শ্রমিকরা। সরকারি হিসেবেই গত এক বছরে অবৈধভাবে কয়লা আনতে গিয়ে জেলায় মারা গেছেন দশ জন বাংলাদেশি। যাদের সবাই তাহিরপুরের বাসিন্দা। বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। আইনি ঝামেলা এড়াতে অনেকে মৃত্যুর সংবাদটি লুকিয়ে রাখেন কিংবা মারা যাওয়ার কারণ বলতে চান না। এর প্রমাণও মিলে আমাদের অনুসন্ধানে। এবার জানাতে চাই ট্যাকেরঘাট ও আশপাশের এলাকার দুইদিন একরাতের দেখা সেসব চোরাকারবারিদের গল্প।
.jpg)
প্রথম দিন টেকেরঘাট পুলিশ ফাঁড়ির সামনে অবস্থান। আগেই বলেছিলাম, আমরা বিজিবিকে জানিয়ে এসেছি, তাই সীমান্তে কড়া নিরাপত্তা। এরই মধ্যে কয়েকজন বিজিবি সদস্য এসে সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয়দের কাছে। আগামী কয়েকদিন যেন কোন অবস্থাতেই কেউ সীমান্ত অতিক্রম না করে। তবুও চোর কি শুনে গৃহস্থের কথা। সকাল থেকেই পাহাড়ের পাদদেশে আমাদের অপেক্ষা। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই চোখে পড়লো কাক্সিক্ষত সেই দৃশ্য। বড়ছড়া বাজারের কয়েকশো গজ পূর্বে ভারতের পাহাড় থেকে সারিবদ্ধ কয়লা নিয়ে নামছে অন্তত দশ জন শ্রমিক। এরপরই বিজিবির অবস্থান সেখানে, আর দেখা গেলো না কিছু।
এবার স্থান পরিবর্তন করে নীলাদ্রি লেকে অবস্থান। সেখানে পাহাড়ের নিচ আর লেকের পাড় ঘেঁষে বড়ছড়া কয়লা ডিপোর দিকে মাথায় কয়লার বস্তা নিয়ে তিনজনের যাত্রা।
এরপর ট্যাকেরঘাট জেলা প্রশাসন বাংলোর সামনে অপেক্ষা আমাদের। কয়েকজনকে পণ্য নিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেখা গেল। এরমধ্যে কয়েকজন শিশুও রয়েছে। ঘন্টাখানেক অপেক্ষার পর সীমান্ত পারি দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করলো ৫ জন। সবার কাঁধে বস্তা। দেখা গেল, কয়েকজন শ্রমিক বস্তা মাথায় নিয়ে খুব তাড়াহুড়ো করে কয়লার ডিপোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বড়ছড়া কয়লা স্টেশনের পাশে অনেকগুলো ডিপো রয়েছে।
পর্যটক সেজে তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা। বেশিরভাগই মুখে কুলুপ এঁটে কাজ করেন। তবুও জিজ্ঞাসা, এগুলোতে কী রয়েছে? কয়লা। কত টাকা বস্তা? এই চারশো সাড়ে চারশো টাকা। কতদূর থেকে আনেন? মেলা দূরে। হেঁটে হেঁটে যেতে হয়। আবার অনেক সময় খাসিয়া, গারোদের কাছ থেকে কিনে আনি। মারাও তো যাচ্ছেন অনেকে, তবুও কেন করেন এমন কাজ? পেটের দায়ে করি। আর কোন কাজ নাইতো।
পরে আরও এক দল মাথায় বস্তা নিয়ে আসলো। তবে তারা সবাই নারীও শিশু। মোবাইলে ভিডিও দেখেই অকথ্য ভাষায় গালি দিতে দিতে তেড়ে আসলেন মারতে। কোনোমতে সটকে পড়া।
কথা বলতে বলতে কাঁটাতারের পাশ থেকে চলে গেলাম লাকমা বাজারে। যখন তাদের পিছু নিয়েছি সেই সময় চোরাকারবারিদের একটি গ্রুপ আমাদের উপর নজর রাখছিল। সামনে এগোতে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। এই চোরাকারবারি গ্রুপটির সদস্য রুবেল নামের একজন খানিকক্ষণ জেরা করলো। মোবাইলের ভিডিও চেক করতে চাইলো। কয়লা উত্তোলনে আহত নিহতদের সহায়তা করতে এসেছি- এমন আশ্বাস দেয়ার পর মুক্তি পেলাম।
সীমান্তে এমন চোরাচালানীর কারণে একের পর এক মানুষ মৃত্যুবরণ করছে ভারতের কয়লার গুহায়। টাকার লোভ দেখিয়ে ভারতে পাঠানো হচ্ছে দরিদ্র শ্রমিকদের। কয়লার ফাঁদে পরে বলি হচ্ছেন সাধারণ কয়লা বহনকারীরা। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এদের গডফাদাররা।
এবার সীমান্ত ছেড়ে জানাতে চাই কয়লা ডিপোর কথা। কি চলছে আমদানির আড়ালে। তাহিরপুরের তিনটি শুল্কস্টেশনের পাশেই অসংখ্য কয়লা ও পাথরের ডিপো। ভারত থেকে পণ্য আমদানি করে এসব ডিপোতে রেখে পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পথে আসা কয়লার বস্তাগুলোও জমা হয় এসব ডিপোতেই। ডিপোতে ঢুকেই চোরাই কয়লা হয়ে যায় বৈধ কয়লা। কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ কয়লা দেখে বোঝার উপায় নেই। সেই সুযোগে বিজিবির চোখের সামনেই প্রতিদিন পাচার হয় কোটি কোটি টাকার অবৈধ কয়লা।

ভারতের পাহাড় থেকে কয়লা নিয়ে নামছে চোরাইকারবারির দল
কয়লা ডিপোর সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখা যায় দুইজন নারী মাথায় করে নিয়ে আসছেন কয়লা। তাদের উপর চোখ আমাদের। দেখা গেল একটি ডিপোতে বস্তা রেখে চলে যাচ্ছেন। এবার আমাদের যাত্রা সেই ডিপোতে। ডিপোর মালিক আনোয়ার, তারা ৭-৮ জনের একটি গ্রুপ, যারা একসাথে চোরাই কয়লা কেনার ব্যবসা করেন। জানা যায়, এরকম দশ থেকে বারোটি গ্রুপ আছে শুধু বড়ছড়া কয়লা ডিপোতে।
গোপন ক্যামেরায় চোরাই ব্যবসার সকল কথা অকপটে স্বীকারও করলেন আনোয়ার। তিনি বলেন, আমরা পাহাড় থেকে আনা কয়লা কিনি। বস্তাপ্রতি চারশ পাঁচশো টাকা দরে কিনি। কিভাবে আনা হয় এসব কয়লা তাও বিস্তারিত বললেন। তবে ক্যামেরা ধরে বক্তব্য নিতে চাইলে পলটি নিয়ে তিনি বনে যান আমদানীকারক। ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিলেন, তারা এলসির মাধ্যমে কয়লা আমদানি করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করেন।
পরে আরও বেশ কয়েকটি ডিপোতে কথা বলার চেষ্টা করলেও কেউ কথা বলতে চান না সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। তবে অবৈধ পথে দেশে নিয়ে আসা কয়লায় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাইভাবে বিক্রি করায় শুল্ক বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। আর দামের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বৈধ আমাদানিকারকরা।
তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি খসরুল আলম বললেন, চোরাই কয়লার জন্য আমরা যারা বৈধ ব্যবসায়ী আছি তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আমরা সরকারকে শুল্ক দিয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে কয়লা এনে বিক্রি করি। চোরাকারবারিরা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা কয়লা কম দামে বিক্রি করতে পারে, তাই আমাদের কয়লারও দাম কমে যায়। ডিপোতে ঢুকলেই কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ চেনার উপায় নেই। এই সুযোগ নিয়ে চোরাকারবারিরা ব্যবসা করছে। যদি আমাদের এলাকায় শিল্প কারখানা বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত থাকতো।
ইতোমধ্যে খুঁজে পেলাম ভারতের কয়লাখনিতে দুর্ঘটনার শিকার রমজান নামের এক শ্রমিককে। তিনি দুই সন্তানের জনক। কয়লা গুহাতে ঢুকার পর চাপা পড়ে অন্ধকার নেমে এসেছে তার জীবনে। নিজের মেরুদ-ের উপর ভর করে দাঁড়াতে পারেন না। শুয়ে-বসেই কাটাতে হচ্ছে দিন।
রমজান বলেন, আমরা বেশ কয়েকজন গিয়েছিলাম একসাথে। আমার সাথে একজন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আমি কিভাবে বেঁচে ফিরেছি তা জানিনা। নিজের পালিত গরু বিক্রি করে প্রথমে চিকিৎসা করিয়েছি, এরপর আত্মীয়স্বজন পাড়া প্রতিবেশীর দেয়া সহযোগিতার চাঁদায় আমি এখনো চিকিৎসা নিচ্ছি। আমি পঙ্গু হয়ে গেলাম। পরিবার কিভাবে চালাবো জানি না। না খেয়ে মরতে হবে।

বিজিবির সামনেই ডিপো থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে চোরাই ও এলসির কয়লা
এতো গেল আহত পরিবারের গল্প। আমরা যোগাযোগ করেছি নিহত ৭-৮টি পরিবারের সাথে। পূর্বেই বলেছি অনেকেই মৃত্যুর কারণ ও খবর লুকিয়ে রাখতে চান। তাদের মধ্যে একজন উত্তর লাকমা গ্রামের মধ্যবয়ষ্ক রজব আলী। তথ্য বলছে, কয়লা খনিতে গিয়ে শ্বাসকষ্টে মারা গেছেন। খবরের সত্যতা যাচাই করতে তার বাড়ি গেলে সাংবাদিকদের উপর চড়াও হয় পরিবার। স্থানীয়দের সহায়তায় পরে সেখান থেকে ফিরে আসা।
একই রকম ১০ থেকে ১২ জনের একটি গ্রুপ চোরাই পথে কয়লা আনতে যান ভারতের মেঘালয়ে। সেই সময় অন্যরা বের হতে পারলেও পাথর চাপা পড়ে ক্ষত বিক্ষত হয় কলাগাঁওয়ের পঁচিশ বছরের যুবক আবুল হাসানের শরীর। ছোট্ট দুই সন্তানকে রেখে দুনিয়া ছাড়েন হাসান। দুই সন্তান নিয়ে এখন অকূল সাগরে আবুল হাসানের স্ত্রী পারুল বেগম। ভালোবেসে বিয়ে করায় আগেই হয়েছেন ঘরছাড়া। আবুল হাসান মারা যাওয়ার পরও তার স্ত্রী-সন্তানকে গ্রহণ করেনি হাসানের পরিবার। এমন অসহায় অবস্থায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে পারুলের। সামান্য কয়টা টাকার লোভে পড়ে হারিয়ে যাওয়া হাসানের এই পরিবারকে দেখবে কে? দেশের ভেতরে কম উপর্জনের কোন কাজ করলে হয়তো বেঁচে থাকতেন। বাবাহারা হতো না সন্তানগুলো।
বয়সে তরুণী পারুল বেগমের সাথে কথা বলতেই চোখ গড়িয়ে জল পড়ছিল তার। অল্প বয়সে স্বামী হারিয়ে দিশেহারা পারুল। পারুলের মায়ের সামান্য আয়েই খেয়ে না খেয়ে চলছে দুই পরিবার।
সরকারি হিসেবে জানুয়ারি ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত শুধুমাত্র একবছরে মোট ১০ জন সীমান্তবর্তী বাংলাদেশী নাগরিক মৃত্যুবরণ করেছেন ভারতে চোরাই কয়লা আনতে গিয়ে। আহত হয় অসংখ্য। এরমধ্যে পাঁচজন কয়লা খনিতে ঝুঁকিপূর্ণ গর্তে মাটিচাপা পরে মারা যান। ২ জন গর্তে ঢুকে অক্সিজেনের অভাবে শ্বাসকষ্টে, ১ জন ভারতীয় খাসিয়াদের মারধরে, ১ জন হার্ট অ্যাটাকে ও ১ জন ভারতে প্রবেশকালে বিএসএফের গুলিতে মারা যান। ২৫ সালের চলতি মাস পর্যন্ত মারা গেছেন আরও একজন।
২৮ বিজিবি সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল একেএম জাকারিয়া কাদির বললেন, কয়লা চোরাচালান রোধে আমরা নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা করছি। বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরিতে জাল, পলো সহ নানা উপকরণ দিচ্ছি। যেন মানুষ রোজগার করে খেতে পারে। এছাড়াও আমাদের প্রশাসনিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করেছি। গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে। যার ফলে অনুপ্রবেশকালে আমরা অনেককে আটক করেছি। আশা করছি, খুব দ্রুত কয়লা চোরাকারবারি কমে যাবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন