প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল, ২০২৫ ১১:৪৫
শান্তিগঞ্জে চলছে ধান কাটা, মাড়াই চলছে
শান্তিগঞ্জ ছোট-বড় ২৩টি হাওরে ফসলের মাঠ এখন সোনালী প্রান্তর। বোরো ধানের সোনালী চাদরে ঢাকা পড়েছে মাঠ। ছড়ায় ছড়ায় দুলছে কাঁচা পাকা ধান। নতুন ধানের মিষ্টি ঘ্রাণে এখন মৌ মৌ করছে মাঠ। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কোথাও কোথাও আগাম জাতের ধান কাটার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, তবে পুরোপুরি ধান কাটা শুরু হতে আরও দুই সপ্তাহ সময় লাগবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে আর কয়েকটি দিন রক্ষা পেলে চলতি বোরো মৌসুমে বোরো ধানের বা¤পার ফলন হবে বলে আশা করছেন কৃষকরা। উপজেলায় এবার বোরো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকেরা।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শান্তিগঞ্জ উপজেলায় কৃষক পরিবারের সংখ্যা ২৯ হাজার ২২৭ টি। উপজেলায় মোট কৃষি জমির পরিমাণ ৩০ হাজার ৩১৭ হেক্টর। ২৪ হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। ৯৪ হাজার ৮০৫ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার বাজার মূল্য অনুমান ৪৮০ কোটি টাকারও অধিক। চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলায় হাইব্রিড জাতের আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে, উফশী, ব্রি ২৮, ২৯ জাতের ধান আবাদ হয়েছে ১৩ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে এবং স্থানীয় জাতের ৬১০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। শান্তিগঞ্জ উপজেলায় চলতি বছর কোন হারভেস্টার (ধান কাটার যন্ত্র) বিতরণ করা হয়নি। বিগত বছরগুলোতে ৮৭টি হারস্টোর (ধান কাটার যন্ত্র) বিতরণ করা হয়েছিল। ৪/৫ টি নষ্ট হলেও ভর্তুকি সহায়তায় মেরামত করা হয়েছে। চলতি বছর হারস্টোর (ধান কাটার যন্ত্র) মেশিন দিয়ে ধান কাটা শুরু হয়েছে। পাশপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ৩ হাজার ৭৮০ জন ও বহিরাগত ১ হাজার ২৭০ জন ধান কাটার শ্রমিক ধান কাটবেন বলে আশা প্রকাশ করছে কৃষি বিভাগ।
স্থানীয় একাধিক কৃষক জানান, বোরো ধান পাকতে শুরু করেছে। গতবারে বারের চেয়ে এবার তুলনায় অনেক বেশি ফলন হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার নাগডোরা, দাউড়িকান্দি, দেখার হাওর, সাংহাইর হাওর, কাউয়াজুরী হাওর, জামখোলা হাওর, সাংহাইর হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে স্থানীয় কৃষকেরা ব্যাপক হারে এবার বোরোর আবাদ করেছেন। হাওরে ধান কাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কৃষক ও শ্রমিকরা। পাশপাশি ধান শুকানোর খলা (মাঠ) তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন নারী, বৃদ্ধ ও শিশুরা। বিশেষে করে আগাম জাতের ধানে পাক ধরায় এবং ধান কাটার সময়োপযোগী হওয়ায় স্থানীয় অধিকাংশ কৃষক পরিবারের কৃষক ও কৃষি শ্রমিকেরা কেউ ধান কেটে ক্ষেত থেকে ধানের মুঠো টানছেন, কেউ চিটা ছাড়াচ্ছেন, কেউ রোদে ছড়ানো ধান নাড়া দিচ্ছেন। কেউ মেশিন দিয়া ধান কাটা, মাড়াই কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। এসব কাজের মধ্যে তাদের সঙ্গ দিচ্ছে শিশু—কিশোররা। এবছর শান্তিগঞ্জ উপজেলায় বোর জমিতে তেমন পোকার আক্রমণও হয়নি বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় কৃষকরা আগাম জাতের ব্রি ২৮, ২৯, ও হাইব্রিড এল সি—৮ জাতের ধান কাটতে শুরু করেছেন। অনুকূল আবহাওয়া, সার, বীজ, ইত্যাদি কৃষিজ বিভিন্ন উপকরণ সঠিক সময়ে পাওয়ায় এবার বোরোর বা¤পার ফলন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কৃষকরা।

জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান, আতাউর রহমান ও নাজিম উদ্দীন বলেন, আমরা এবার খুব খুশি বোরো ধানের চাষ করে। গতবারের তুলনায় এবার অনেক বেশী ফসল তুলতে পারবো বলে আশা করছি। যদি কোন ঝড় বৃষ্টি না হয় তাহলে এবার বোরোর বাম্পার ফলন হবে। ইতোমধ্যে আমাদের দেখার হাওরের বোরো ধান পাকতে শুরু করেছে। অনেকেই জমির ধান ইতোমধ্যে কেটে মাড়াই দিয়েছেন। এখন ধান শুকানো ও গোলায় তোলার কাজ চলছে। আশা করছি আগামী সপ্তাহ দু্ই—একের মধ্যে আমাদের সহ আমাদের এলাকার অধিকাংশ কৃষকের বোরো ধান কাটে ফেলতে পারবেন।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে সার, বীজ, ডিজেল ও বিদ্যুৎ সংকট না থাকায় বোরোর বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ঝড় বৃষ্টি ও ডোবরার পানিতে ফসলি জমির ধান কিছুটা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এবার বোর ধানের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া আমারা নিয়মিত ভাবে স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকদেরকে অনাবাদি জমিতে বোর ধান উৎপাদনে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি।
এইদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ সহকারি প্রকৌশলী মোমিন মিয়া জানান, চলতি আগাম বন্যার সতর্কতা জানিয়ে ফসল রক্ষা বাঁধের সকল পিআইসিদেরকে চিঠি দেয়া হয়েছে। হাওররক্ষা বাঁধে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা তাদেরকে দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পিআইসিদেরও চিঠি দিয়ে জানানো হবে। নিজ নিজ স্থান থেকে বাঁধের তদারকি করার জন্য এবং আগাম বন্যা থেকে হাওর রক্ষা করার জন্য আমাদের টিম মাঠে কাজ করে যাচ্ছে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার আহসান হাবিব জানান, এ বছর শান্তিগঞ্জে বোর ধানের ভালো ফলন হয়েছে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ধান কাটা শুরু হয়েছে। এবছর কোন হারস্টোর (ধান কাটার যন্ত্র) বিতরণ করা হয় নাই। বিগত বছর গুলোতে ৮৭টি হারস্টোর (ধান কাটার যন্ত্র) বিতরণ করা হয়েছিল। ৪/৫ টি নষ্ট হলেও ভর্তুকি সহায়তায় মেরামত করা হয়েছে এবং হারস্টোর (ধান কাটার যন্ত্র) মেশিন দিয়ে ধান কাটা শুরু হয়েছে। চলতি বছর স্থানীয় পর্যায়ে ৩ হাজার ৭৮০ জন ও বহিরাগত ১ হাজার ২৭০ জন ধান কাটার শ্রমিকেরা ধান কাটবেন। আশা করছি আবহাওয়া ও প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে অল্প সময়ের মধ্যে ধান কাটা শেষ হবে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুকান্ত সাহা বলেন, এ উপজেলায় ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষি যন্ত্রের পাশপাশি ধান কাটার শ্রমিকরাও ধান কাটবেন। পাশপাশি উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি অফিসের কর্মকর্তারাও মাঠে কাজ করছেন এবং কৃষকদেরকে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। আমাদেরকেও কৃষকরা সরাসরি ফোন দিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। চলতি বছরের সরকারি নির্দেশনায় ২৪ এপ্রিল থেকে অনলাইনে (অ্যাপ) এর মাধ্যমে কৃষকরা ৩৬ টাকা কেজি (প্রতিমণ ১৪৪০/—টাকা) দরে সরকারি খাদ্য গোদামে দিতে পারবেন। আগামী ৮/১০ দিন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গত বছরের ন্যায় এবছরেও আমারা কাক্সিক্ষত ফসল ঘরে তুলতে পারবো।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন