প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:০৮
রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তি রয়েছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয়দের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে নানা প্রশ্ন। ইসিএ সীমানা নির্ধারণ, হাউসবোট চলাচল, ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকার ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টাঙ্গুয়ার হাওরে পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করার নানা দিক নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের নিয়মিত বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় কথা বলেছেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের স্টাফ রিপোর্টার জাকারিয়া আহমদ। সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিচে তুলে ধরা হলো—
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: ইসিএ সীমানা নিয়ে এই বিভ্রান্তির মূল কারণ কী এবং এটি দ্রুত নিরসনে কী করা প্রয়োজন?
কাশমির রেজা: ইসিএর সীমানা নির্দিষ্ট থাকার কথা। কিন্তু সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে যখন বলা হলো, ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় হাউসবোট প্রবেশ করতে পারবে না, তখন প্রশ্ন দেখা দেয়—শুধু ওয়াচ টাওয়ার এলাকাই কি ইসিএর অন্তর্ভুক্ত, নাকি আরও বিস্তৃত এলাকা ইসিএর আওতায় রয়েছে? টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওর নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে সুরক্ষা আদেশ হয়েছে, সেখানে ম্যাপের মাধ্যমে ইসিএর সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কোন কোন এলাকা ইসিএর অন্তর্ভুক্ত, সেটিও সেখানে উল্লেখ রয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রায় পুরো অংশই ইসিএর আওতাভুক্ত। প্রায় ৯ হাজার ৭০০ হেক্টর এলাকা এখানে ইসিএর অন্তর্ভুক্ত।
তিনি বলেন, ইসিএ এলাকায় হাউসবোট প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু কোন এলাকা ইসিএর অন্তর্ভুক্ত—এ নিয়ে মাঠপর্যায়ে এখনো এক ধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে। এর আগে টাঙ্গুয়ার হাওরের আওতাভুক্ত কিছু বিলকে হাওরের বাইরে হিসেবে দেখিয়ে তালিকা দেওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। এতে সংকট আরও বেড়েছে।
কাশমির রেজা বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের সীমানা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা দরকার। সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু এলাকায় লাল নিশান টাঙানো হয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ। তবে এ উদ্যোগ আরও আগে নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক সভাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? সঠিক সীমানা নির্ধারণ হলে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ রক্ষায় কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
কাশমির রেজা: জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যে সভাটি হয়েছে, সেটি মূলত ইসিএ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা। সেখানে আবারও সীমানা নির্ধারণ করে লাল নিশান দেওয়ার বিষয়টি বলা হয়েছে। যেসব এলাকায় হাউসবোট প্রবেশ করতে পারবে না, সেসব জায়গায় দেওয়া লাল নিশান কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু হাউসবোট বন্ধ করলেই হবে না। এসব এলাকায় অনেক ক্ষেত্রে ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা প্রবেশ করে। তাই ছোট নৌকায় ইঞ্জিনের ব্যবহার বন্ধ করার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। হাউসবোট নির্ধারিত জায়গা থেকে অনেক দূরে রাখার কারণে পর্যটকদের ওয়াচ টাওয়ার বা নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছাতে সময় লাগে। সময় বাঁচাতে অনেক পর্যটক ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকা ব্যবহার করেন। টাঙ্গুয়ার হাওরে মানুষ আসে এর মনোরম ও নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে। কিন্তু এখানে এসে যদি সব সময় ইঞ্জিনের শব্দে শব্দদূষণ হয়, তাহলে মানুষ কেন টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে আসবে? আইনে যেসব বিধিনিষেধ রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় মানুষ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ সংরক্ষণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন কতটা কার্যকর? বিশেষ করে হাউসবোটসহ পর্যটনসংশ্লিষ্টদের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি?
কাশমির রেজা: টাঙ্গুয়ার হাওরে বর্তমানে যেভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চলছে, তা খুবই অপ্রতুল। মোটেও যথেষ্ট নয়। এ জন্য সমন্বিতভাবে সবাইকে নিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চালাতে হবে। নীলাদ্রী লেকের পাড়ে যেখানে হাউসবোটগুলো রাখা হয়, সেখানে গেলে নিচে অনেক বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। শুকনো মৌসুমে এসব বর্জ্যের মধ্যে থাকা কাচের বোতলে কৃষকদের পা কেটে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। ফলে তারা স্বাভাবিকভাবে চাষাবাদ করতে পারেন না।
সরকার, হাউসবোট মালিক, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং বেসরকারি অংশীজন—সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে বর্জ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমানে কোথায় বর্জ্য ফেলা হবে, সে জন্য নির্দিষ্ট কোনো ডাম্পিং স্টেশন নেই। তাই প্রথমে বর্জ্য ফেলার জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করতে হবে। নৌকার মাধ্যমে হাউসবোট থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশনে নেওয়া যেতে পারে। কাচের বোতল, প্লাস্টিক ও অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করে কোনো ভেন্ডরের কাছে দেওয়া যেতে পারে। এখনই যদি টাঙ্গুয়ার হাওরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ না করা হয়, তাহলে এখানকার পর্যটন টেকসই হবে না। একসময় দেখা যাবে, হাওরের নিচে বর্জ্যের বড় স্তর জমে গেছে। প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য জমতে থাকলে টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এতে পর্যটকরাও একসময় হাওরমুখী হবেন না।
কাশমির রেজা বলেন, এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবেন হাওরপাড়ের স্থানীয় জনগোষ্ঠী। হাওরের পরিবেশ নষ্ট হলে মাছের উৎপাদন কমবে, সাধারণ মানুষের আয়—রোজগার কমবে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান আরও নিম্নমুখী হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শেষ করার আগে একটি প্রশ্ন জেনে নিই। শোনা যায়, পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক কাশ্মির রেজার মালিকানাধীন হাউসবোটও রয়েছে। সেই হাউসবোটও কি নীতিমালা না মেনে চলছিল?
কাশমির রেজা: আমার একটি হাউসবোটে অংশীদারত্ব ছিল। সেটি এখন আর নেই। এ বছর আপনারা দেখবেন, ওই হাউসবোট আমি পরিচালনা করছি না।
তিনি বলেন, পরিবেশসম্মতভাবে পর্যটন পরিচালনা করা সম্ভব—এমন একটি উদাহরণ তৈরি করার উদ্দেশ্যেই তারা হাউসবোট পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু সমন্বিতভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থাকায় সেই উদাহরণ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে আমরা হাউসবোটটি বাতিল করেছি। এ বছর আমরা এই হাউসবোট আর চালাচ্ছি না। ভবিষ্যতে যদি পরিবেশসম্মতভাবে পর্যটন পরিচালনার একটি উদাহরণ তৈরি করতে পারি, তখন হয়তো আবার চিন্তা করব। টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়—স্থানীয় জনগোষ্ঠী, হাউসবোট মালিক, পর্যটক, পরিবেশকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ইসিএর সীমানা স্পষ্ট করা, নিষিদ্ধ এলাকায় হাউসবোট ও ইঞ্জিনচালিত নৌকার প্রবেশ বন্ধ করা এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও পর্যটন—দুটিই টেকসইভাবে রক্ষা করা সম্ভব।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন