প্রকাশিত: ১০ মে, ২০২৫ ২২:৩৩
চল্লিশোর্ধ্ব সোহাগ মিয়ার বাড়ি শহরতলীর মোল্লারপাড়া ইউনিয়নের বেতগঞ্জ এলাকায়। সুনামগঞ্জ শহরে প্রায় চার বছর ধরে ভ্রাম্যমাণ দোকানের মাধ্যমে আখের রস বিক্রয় করেন তিনি। খর্বাকৃতির মানুষটির শরীর ঘামে ভিজে একাকার হলেও চোখমুখে এক ধরণের তৃপ্তির ছাপ দেখা গেছে শনিবার বিকালে। তার ভাসমান দোকানে ক্রেতাদের ভিড়। আখ চেপে রস বের করার মেশিন এক মুহুর্তের জন্যও থামছে না। একজন ক্রেতা যেতে না যেতে আরেকজন আসছেন। গরমের তীব্রতা বেশি হওয়ায় অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ তার আখের রসের কাটতি (বিক্রি) বেশি। বিক্রি বেশি হচ্ছে, তাই কষ্ট হলেও তার চোখেমুখে তৃপ্তির ঢেঁকুর। শনিবার বিকাল ৪টায় এমনই দৃশ্যের দেখা মিলে সুনামগঞ্জ সদর থানার সামনের ডিএস রোড এলাকায়।
কথা হয় সোহাগ মিয়ার সাথে। তিনি জানান, এর আগে বেশ কয়েক বছর সিলেটে আখের রস বিক্রয় করেছেন তিনি। চার বছর ধরে সুনামগঞ্জ শহরের অলিতে গলিতে ঘুরে ঘুরে আখের রস বিক্রয় করেন সোহাগ মিয়া। আজ বিক্রয় বেশি হওয়ায় তৃপ্তির সাথে কিছুটা চিন্তিত তিনি। কারণ ইতোমধ্যে শেষ হতে শুরু করেছে তার সকল আখ। শনিবার সকাল থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত দুই হাজার টাকা বিক্রয় করেছেন। আর যে আখ হাতে আছে, সে আখ দিয়ে আরো এক হাজার টাকার বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান তিনি। এরপর তার কাছে আর কোনো আখ নেই। এদিকে বেশি দামেও কিনতে পারছেন না আখ। এজন্য অনেকটা চিন্তিত তৃষ্ণা মেটানোর এই কারিগর।
সোহাগ জানান, আকাশ মেঘলা কিংবা বৃষ্টি থাকলে আখের উপরে এতোটা চাপ থাকে না। আজ কড়া রোদ উঠেছে। তাই গরমের কারণে অনেক মানুষ চা, ঠান্ডা না খেয়ে আখের রস খেতে আসেন। নিজের আখের রস অনেক সুস্বাদু ও প্রাকৃতিক বলে দাবি করেন আখ বিক্রেতা সোহাগ। তিনি বলেন, ‘অখনও চাইরটা বাজছে না দুই হাজার টেকা (টাকা) বেছিলিছি (বিক্রয় করেছি), অখন আখতো শেষ, আর এক হাজার টেকার মত বেছতাম পারমু)। গরম পড়ায় বেশি দামে কিনতে হয় জানিয়ে, সোহাগ বললেন, ১৫ টাকার গ্লাস ২০ টাকা এবং ২৫ টাকার গ্লাস ৩০ টাকায় বিক্রয় করতে হচ্ছে।
সোহাগ মিয়ার সাথে কথা বলার সময় তার দোকানে আখ খেতে আসেন দিন মজুর আবুল কালাম, রিকশা চালক মুহিব আলী ও জোবায়ের আহমদ নামের এক তরুণ। তারা জানালেন, প্রচণ্ড গরম পড়েছে। গ্রীষ্মের কড়া রোদে তারা বার বার হাঁপিয়ে যাচ্ছেন। তাই অন্য কোনো কিছু না খেয়ে আখের রস খেতে এসেছেন। আখ একই সাথে গরমে ভেতর ঠাণ্ডা রাখে এবং পুষ্টি গুণও রয়েছে।
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ডাক্তার সৈকত দাস বললেন, আখের রসে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ক্রোমিয়াম, কোবল্ট, তামা, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, পটাশিয়াম এবং জিংক সমৃদ্ধ। এছাড়াও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রোটিন,আয়রন ও ভিটামিন এ, সি, বি১, বি২, বি৩, বি৫ এবং বি৬ ধারণ করে। এই সব পুষ্টি উপাদান শরীর সুস্থ এবং সুন্দর রাখতে একসঙ্গে কাজ করে। এই গরমে আখের মানুষের শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তির সঞ্চয় ও তৃষ্ণা নিবারণের খুব ভালো উৎস হিসেবে কাজ করে। এই রসে আছে পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্লুকোজ। এই গ্লুকোজ মুহূর্তেই মানব দেহ রিহাইড্রেট করে চাঙা করে তোলে। আখের রসে উচ্চ মাত্রার ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ এবং ক্যালসিয়াম থাকার কারণে এটিকে ক্ষারীয় বলে মনে করা হয়। আখের রস শরীরে প্রোটিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, তাই এটি কিডনির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। রসে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সংক্রমণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং ইমিউন সিস্টেমকে উন্নত করে। এছাড়াও লিভারে সংক্রমণ হওয়া রক্ষা করে এবং বিলিরুবিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এটি পাচনতন্ত্রের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে ও পেটের সংক্রমণ রোধ করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যায় বিশেষভাবে উপযোগী বলে মনে করা হয়। আখে দাঁতের ক্ষয় রোগ থেকেও রক্ষা করে। তবে আখের রস যেখানে বিক্রয় হচ্ছে, সেই দোকানীকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। একইসঙ্গে আখের পানি ঠান্ডাকরণের জন্য কোন কোন বরফ ব্যবহার করা হয়। এই বরফও পরিস্কার এবং বিশুদ্ধ পানি দিয়ে তৈরি হতে হবে।
এদিকে আবহাওয়াবিধ সাঈদ আহমদ জানিয়েছেন, শনিবার সুনামগঞ্জে সর্বনিম্ন ২৮ থেকে সাড়ে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করেছে তাপমাত্রা। আজ রবিবার আবহাওয়া এই জেলায় এভাবেই থাকবে। সোমবার রাতে বৃষ্টি হতে পারে। ১৮, ১৯ ও ২০ মে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়বে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন