প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৭:৩২
বিশ্ব পর্যটন দিবস আজ
টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সীমান্তের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি সুনামগঞ্জে বাড়ছে পর্যটক। বছরে বছরে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। গড়ে ওঠছে নতুন নতুন পর্যটন স্পট । সেই সাথে যুক্ত হয়েছে বিলাসবহুল হাউসবোট। এই হাউসবোট টানছে পর্যটক। তবে পর্যটকদের অসচেতনতার কারণে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। অভিযোগ রয়েছে, এসব হাউসবোট ও নৌকায় প্রশাসনের দেয়া নীতিমালা মানছেন না পর্যটকেরা। এতে ট্যাকেরঘাট এলাকায় পলিথিন ও কাচের খালি বোতলে নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি। হুমকিতে পড়ছে এলাকার পরিবেশ।
নিয়ন্ত্রিত পর্যটনকে আরও প্রসারিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকবাহী নৌযান, হাউসবোট ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রক্রিয়া বিঘিœত না করা, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া হাওরে প্রবেশ না করা, ট্যাকেরঘাট এলাকা ব্যতীত অন্য এলাকায় নৌকা, জলযানে রাত্রিযাপন করলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে অবহতি করা, জলযানে রান্নার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার বহন না করা, সংরক্ষিত এলাকায় বিভিন্ন প্রাণির অবাধ বিচরণ, স্বাভাবিক আচরণ, প্রজনন, বংশ বৃদ্ধি প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়া, আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো হাতিয়ার, ফাঁদ, বিষ, মাছ শিকারের সরঞ্জাম বহন না করা, নৌযান, হাউসবোটের বর্জ্য পরিবেশবান্ধব উপায়ে নির্দিষ্ট সেফটিক ট্যাংকে রাখা, স্বাভাবিক মাত্রার অধিক শব্দ সৃষ্টিকারী, কালো ধোঁয়া উদগীরণকারী বা ত্রুটিপূর্ণ কোন জলযান পর্যটক পরিবহনে ব্যবহার থেকে বিরত থাকা, নৌযানে সৌর শক্তি ব্যবহার, উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী জেনারেটর বহন থেকে বিরত থাকা, হাওরের নির্জনতা বজায় রাখতে কোনো মাইক, মাইক্রোফোন জাতীয় উচ্চ শব্দযন্ত্র বহণ না করা সহ আরও কিছু বিধি-নিষেধ রয়েছে প্রশাসনের।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এক-দুটি ছাড়া বেশিরভাগ হাউসবোট-নৌকা পর্যটকদের নিয়ে ট্যাকেরঘাট এলাকায় রাত্রিযাপন করেন। এসব নৌযানে রাত্রিযাপন করা পর্যটকদের ব্যবহারের কাচের বোতল, প্লাস্টিকের প্লেট, বোতল, মগ, পলিথিন ব্যাগ পানিতে ফেলে দেন। এতে দূষিত হচ্ছে ট্যাকেরঘাটের আশপাশের এলাকা। শুষ্ক মৌসুমে ফসলি জমিতে কাচের বোতল ও পলিথিনের জন্য আবাদ করতে বাঁধার সম্মুখিন হতে হয়।
এছাড়াও পর্যটকবাহী নৌকাগুলো বৌলাই নদী হয়ে মাটিয়ান হাওরের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করছে। পরে এই হাওর পাড় হয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রবেশ করছে নৌযানগুলো। টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় গিয়ে নৌযান করচ গাছে বেঁধে রাখা হয়। ফলে এই এলাকায় থাকা শতাধিক হিজল করচ গাছ ডাল-পালা ভাঙনের মুখে। ওয়াচ টাওয়ারে নৌকা বাঁধার ফলেও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এই স্থাপনাটি। পর্যটকরা গাছে উঠে নিচে লাফিয়ে পড়া ও ডালপালাও ভাঙতে দেখা গেছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের জয়পুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন বললেন, পর্যটকেরা এসে গাছে উঠার কারণে ডাল-পালা ভেঙে যাচ্ছে। গাছে ও ওয়াচ টাওয়ারে হাউসবোট-নৌকা বাঁধার কারণেও ক্ষতি হচ্ছে গাছগুলোর।
উত্তরশ্রীপুর ইউনিয়নের বালিয়াঘাট গ্রামের বাসিন্দা লুৎফর রহমান বাবর বললেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি আমাদের এই টাঙ্গুয়ার হাওর। এটি ভ্রমণ পিপাসু মানুষের জন্য আকর্ষনীয় স্থান। প্রতিবছর এখানে হাজারও পর্যটক আসেন। তবে তাদের নিয়ে তাহিরপুর থেকে যখন নৌকাগুলো আসে তখন নির্দিষ্ট কোনো পথ ধরে আসা হয় না। ফলে হাওরের জীববৈচিত্র্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি শতকোটি টাকার ফসল রক্ষা বাঁধের ক্ষতি হচ্ছে। নদী দিয়ে যদি নৌকাগুলো হাওরে আসতো, তাহলে এই ক্ষতি হতো না।
শহীদ সিরাজ লেকের পাশর্^বর্তী পুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা তারা মিয়া বললেন, পর্যটকেরা ট্যাকেরঘাটে রাতে নৌকায় থাকেন। তারা বোতলের পানীয়ও খেয়ে কাচের ও প্লাস্টিকের বোতল, প্লেট, পলিথিন পানিতে ফেলে দেয়। এগুলো আমাদের ফসলি জমিতে ভেসে আসে। জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে।
লাকমা গ্রামের বাসিন্দা মো. আরশ আলী বললেন, পর্যটকেরা ময়লা আবর্জনা ফেলার কারণে আমাদের এলাকার ক্ষতি হচ্ছে। জমিতে ফসল আবাদ করার সময় কাচের বোতলে আমাদের পা কাটে। গত বছরে আমার ছেলের পা কেটেছে।
ঢাকার খিলক্ষেতের বাসিন্দা মো. ফিরোজ মিয়া বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসে খুবই ভালো লেগেছে। তবে আমাদের কাছে মনে হয়েছে তাহিরপুরের বিকাশমান এই পর্যটনখাতকে বিকশিত করবার জন্য প্রশাসনকে আরও বেশি নজর দেয়া উচিত। পর্যটকদেরও আরও সচেতন হওয়া উচিত। পানির বোতল, পলেথিন ব্যাগ যেখানে সেখানে ফেলে দেওয়া হয়। এগুলো বন্ধ করার জন্য প্রশানের জোড়ালো ভূমিকা নিতে হবে।
পর্যটক তৌফায়েল বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য্য দেখলে যে কেউ মুগ্ধ হবেন। এছাড়াও সিরাজ লেক, যাদুকাটা, বড়গোপ টিলাও চমৎকার পর্যটন স্পট। তবে এখানে এসে খারাপ লেগেছে। সবাই পলিথিন বোতল পানিতে ফেলে দিচ্ছেন। এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এসব বন্ধ করা উচিত।
টাঙ্গুয়ার হাওরের পাড়ে সীমান্তের কাছাকাছি আরেক পর্যটন স্পট শহীদ সিরাজ লেক। নীল রঙে রূপায়িত হবার কারণে লোকে এটা ‘নীলাদ্রি’ নামে চিনে। যার একপাশে রয়েছে নীল জলের স্বচ্ছ লেক, লেকের পাশে রয়েছে ছোট ছোট টিলা। পাহাড়ের উপর ভেসে বেড়ায় মেঘ। কখনও বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে, শীতল করে পর্যটকদের শরীর ও মন। সচেতন না হয়ে এভাবে চলতে থাকলে, এতো বড় আয়োজন নষ্ট হয়ে যাবে বলে মনে করছেন সচেনত পর্যটকেরা।
জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বললেন, সুনামগঞ্জে অনেক পর্যটন এলাকা রয়েছে। এরমধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক (নিলাদ্রী), যাদুকাটা, বড়গোপটিলা ও দেশের সবচেয়ে বড় শিমুলবাগান রয়েছে। এইসব পর্যটনস্পটকে ঘিরে প্রতিদিন অনেক পর্যটক আসছেন। তাদেরকে নীতিমালা মেনে ভ্রমণ করার জন্য বলা হচ্ছে। নীতিমালা না মানলে পুরো পর্যটন খাতই হুমকির মধ্যে পড়বে। এজন্য ট্যুর অপারেটদেরও আরো সচেতন হতে হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন