ভুলে ভরা সাইনবোর্ড

প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ০৯:১৪

২৩২৩ দাগে আমাদের চার ভাইয়ের নামে দেখার হাওরে ৬৯ শতাংশ ধানী জমি আছে। এছাড়াও দেখার হাওর মৌজায় আরও একাধিক দাগে আমাদের প্রায় ৪০ একর জমি রয়েছে। জমির সব কাগজে দেখার হাওর মৌজা লেখা আছে। কিন্তু কিছুদিন আগে দেখলাম আহসানমারা সেতুর পূর্বাংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক একটি সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। সেখানে দেখার হাওরকে ‘ডেকার হাওর’ লেখা হয়েছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। দেখার হাওর পাড়ে আমাদের বাড়ি। পূর্ব পুরুষরা এই হাওরে ধান চাষ ও মৎস্য আহরণ করেছেন। ছোটবেলা থেকেই হাওরকে দেখার হাওর নামে চিনি। হঠাৎ করে কোন কারণে নামের এমন পরিবর্তন আবশ্যক হয়ে উঠলো তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। এই নাম পরিবর্তন করে এলাকাবাসীর আবেগের জায়গার কথা চিন্তা করে এবং দুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে ‘ডেকার হাওর’কে দেখার হাওর লেখার জোর দাবি জানাচ্ছি।

দেখার হাওরের নাম পরিবর্তন করায় চরম অসন্তোষ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের দেখার হাওর পাড়ের আস্তমা গ্রামের বাসিন্দা মো. নূর মিয়া। তার বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করে পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জগলুল হায়দার বলেন, দেখার হাওরে আমাদের কয়েক শত একর জমি রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই হাওরে বিভিন্ন বিলে মাছ ধরি। কোনো দিনই ডেকার হাওর নাম শুনিনি। হাওরের প্রকৃত নাম দেখার হাওর। আমাদের অসংখ্য জমির দলিলেও দেখার হাওর লেখা। তাই নাম পরিবর্তন কাম্য নয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, সুনামগঞ্জ জেলার সদর উপজেলা, শান্তিগঞ্জ, ছাতক ও দোয়ারাবাজারের বিশাল এলাকা নিয়ে দেখার হাওর। জেলার শস্য ভাÐার খ্যাত হাওরে মোট জমির পরিমান ৪৫ হাজার ৮৬৯ হেক্টর। এরমধ্যে চাষাবাদ হয় ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর জমিতে। চাষাবাদকৃত এসব জমিতে বছরে ১ লক্ষ ৪০ হাজার ৪শ’ মেট্রিক টন ধান উৎপন্ন হয়। প্রচলিত আছে, এই ধানে সমস্ত দেশের প্রায় ১৫ দিনের খাদ্যের যোগান হয়। এ ছাড়াও বর্ষায় কিংবা হেমন্তে এ হাওর-বিলে-ঝিলে মাছ ধরে কয়েক হাজার জেলেরা জীবিকা নির্বাহ করেন। চার উপজেলাসহ সমস্ত জেলার অর্থনীতির পাশাপাশি হাওরটি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। পাশাপাশি কৃষক-জেলের আবেগ ও অনুভূতির এক কেন্দ্রস্থল হচ্ছে দেখার হাওর। এ নামের সাথে মিশে আছে হাওরপাড়ের কৃষক-জেলের জীবনোপাখ্যান। বর্ষায় পাল তোলা নৌকা থেকে শীতের ঘাসের শিশিরবিন্দুসহ সব কিছুর সাথে মিশে আছে দেখার হাওরের নাম। হঠাৎ করে দেখার হাওর থেকে ‘ডেকার হাওর’ বনে যাওয়ায় অবাক হয়েছেন হাওর পাড়ের মানুষজন। প্রকাশ করছেন ক্ষোভ। দাবি তুলেছেন নাম সংশোধনের।

বৃহস্পতিবার আহসানমারায় গিয়ে দেখা যায়, সাত লাইনের একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড। সেখানের তিন স্থানে ভুল বানান লিখা হয়েছে। বোর্ডে বিশাল বড় বড় অক্ষরে দেখার হাওরকে লিখেছে ‘ডেকার হাওর’। সুনামগঞ্জ সদর কে লেখা হয়েছে সুনামগঞ্জ-সদব এবং আহসানমারার নাম পরিবর্তন করে লিখা হয়েছে আসনমারা। নাম পরিবর্তন ও ভুলে ভরা এমন সাইনবোর্ড দেখে ক্ষুব্ধ স্থানীয় এলাকাবাসী ও সুধীজন।

জয়কলস নোয়াগাঁও (খাইক্কারপাড়) গ্রামের আনোয়ার হোসেন, সুরুজ আলী, আয়নাল মিয়া ও উত্তর জয়কলসের রব্বানী মিয়া বললেন, আমাদের জন্ম দেখার হাওরপাড়ে। ছোটবেলা থেকেই শুনেছি, জেনেছি এই হাওরের নাম দেখার হাওর। দেখার হাওর মৌজায় আমাদের জমিও আছে। কাগজে কলমেও দেখার হাওর। তাহলে এটা ডেকার হাওর হয় কীভাবে? আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। দ্রæত নাম ঠিক করা হোক, দেখার হাওর নামটিও সুন্দর।

জগন্নাথপুরের শাহজালাল মহাবিদ্যালয়ের সহযোগি অধ্যাপক ও লেখক এনামুল কবির বলেন, আমাদের দেখার হাওর- দেখার মতো একটা হাওর এবং এটা এখন অপ্রচলিত কোনও নাম নয়। এই নামটাও বেশ শ্রুতিমধুর। তাহলে এটা পরিবর্তনের কী প্রয়োজন? থাকুক এটা।

লেখক ও গবেষক ইকবাল কাগজী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, সরকারি কিছু কর্মকর্তার ইংরেজি প্রীতির কারণেই নামের এমন বিভ্রাট সৃষ্টি হয়েছে। বাংলায় লেখার কথা থাকলেও তারা ইংরেজির অনুবাদ করতে গিয়েই দেখার হাওরকে ডেকার হাওর লিখেছেন। এটা মোটেও ঠিক নয়। দীর্ঘ দনের একটি নামকে এভাবে পরিবর্তন দুঃখজনক। যত দ্রæত সম্ভব দেখার হাওরকে দেখার হাওরে ফিরিয়ে আনা হোক।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, দুইটি নামই সঠিক। এ নিয়ে জেলা কমিটির মিটিংয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা যাচাই-বাছাই করছি। যাচাই-বাছাইয়ের পর আমরা সিদ্ধান্ত নেবো কী করা যায়। বানান ভুলের বিষয়ে তিনি বললেন, বানান ভুল কাম্য নয়। আমরা দেখছি। 

 

 

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার