বৈরী হাওয়ায় দিকনির্দেশনা

প্রকাশিত: ০২ জুন, ২০২৫ ০৮:৪৮

বৃষ্টিপাতে বন্যার সতর্কতা 

সুনামগঞ্জে গত কয়েকদিন ধরে ভারি বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের কারণে বন্যার সর্তক বার্তা দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এতে আসন্ন কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে পশু বিক্রেতা ও চাষীরা বিপাকে পড়েছেন। দায়িত্বশীলরা বলছেন, আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। তবে স্বস্তির খবর, এখনও জেলার প্রধান সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
গেল ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ও উজানে ভারতের মেঘালয় বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। চেরাপুঞ্জিতে ১২২ মি.মি ও শিলংয়ে ৪৪. মি.মি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এদিকে সুনামগঞ্জে ১২৫ মি.মি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সন্ধ্যা ৬ টায় সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ স্টেশনে বিপদসীমার ৯১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আগামী দুইদিন ভারী থেকে অতিভারী ও পরবর্তী দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, এরকম ভারি বৃষ্টিপাত হলে জেলার প্রতিটি নদীর পানি বাড়বে, কোনো কোনো জায়গায় বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে তাহিরপুর, বিশ^ম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীলরা আগাম প্রস্তুতির কথা বলছেন। আসন্ন কোরবানীর ঈদকে সামনে রেখে প্রস্তুতকৃত পশুর যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেদিক থেকে প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। মাঠের কর্তনযোগ্য ফসল দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি কর্মকর্তারা। এছাড়াও বন্যায় প্লাবিত হওয়া এলাকার মানুষকে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়ার পরামর্শ স্বাস্থ্যবিভাগের।
জেলা প্রাণী সম্পদ অফিসের তথ্যমতে, এবছর জেলায় ৫২ হাজার ৪৯১টি কোরবানীর যোগ্য পশু রয়েছে। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ সদরে ৫ হাজার ৯১৪টি, ছাতকে ৬ হাজার ৮৭১টি, জগন্নাথপুরে ৫ হাজার ৬৫১টি, দিরাইয়ে ৫ হাজার ২৭১টি, দোয়ারাবাজারে ৪ হাজার ৩৮০টি, জামালগঞ্জে ২ হাজার ৮৩৭টি, তাহিরপুরে ৩ হাজার ৮২৩টি,  বিশ^ম্ভপুরে ২ হাজার ৩৬১টি, ধর্মপাশায় ৬ হাজার ২৭৫টি, শাল্লায় ৩ হাজার ৬৬৭টি ও শান্তিগঞ্জে ৫ হাজার ৪৪১টি কোরবানীর যোগ্য পশু রয়েছে। বন্যার সতর্কতার জন্য পশু মালিকদের আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে বলেছেন তারা।
এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এখনও মাঠে আউশ ধান ২ হাজার ৪৫৬ হেক্টর, পাট ৪০৫ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি ৪২৪ হেক্টর, মুগডাল ১৭ হেক্টর, তিল ৩৫ হেক্টর, মরিচ ৪৩ হেক্টর রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও ছাতক উপজেলার ৩ হেক্টর আউশ ধান পানিতে প্লাবিত হয়েছে। 
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বন্যার সময় গবাদিপশুর খাবার নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য গবাদিপশু ও শুকনো খড় উঁচু জায়গায় সংরক্ষণ রাখতে বলা হয়েছে। গরু রাখার ঘর শুকনো রাখতে হবে। স্যাতস্যাতে যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়াও প্রতিটি উপজেলায় দুইটি করে ভ্যাটেনারী মেডিকেল টিম গঠন ও পর্যাপ্ত ওষুধ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের বনগাঁও গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মো. হাবিবুর রহমান বললেন, কৃষি অফিসের সহযোগিতায় দুই একর জমিতে আউশ ধান আবাদ করেছিলেন তিনি। গতকাল পানিতে পুরো জমি তলিয়ে যায়। আজকে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় জমি থেকে পানি নেমেছে। পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষি অফিসের কাছ থেকে কোনো পরামর্শ পান নি বলে জানান তিনি।
মধ্যনগর উপজেলার দক্ষিণ বংশিকুন্ডা ইউনিয়নের রৌহা গ্রামের বাসিন্দা সুলতান মিয়া বলেন, এই কয়েকদিনের বৃষ্টিতে আমাদের পুরাডোবা হাওর ও বাইনচাপড়া হাওর পানিতে ভরে গেছে। এখন পানি বাড়লে বন্যার সম্ভবনা রয়েছে। তবে সোমবারে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।
তিনি বলেন, আমার ৪ টি গরু রয়েছে। চেষ্টা করেছি উঁচু জায়গা তৈরি করে খড় রাখতে। এর বাইরে আমাদের বন্যার আগাম কোনো প্রস্তুতি নেই। প্রতি বছরই আমাদের পানির সঙ্গে লড়াই করতে হয়। পানি বেড়ে ঘরে উঠলে খাট উঁচু করবো, তবুও যদি না থাকা যায় পাশের প্রাইমারি স্কুলে যাবো। 
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের বাহাদূরপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মইনুল ইসলাম বলেন, আমার ৪টি গরু রয়েছে। পানির সময় ঠান্ডা লাগার সম্ভবনা থাকে। এজন্য পরিষ্কার ও উঁচু জায়গায় গরু রাখতে হবে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বললেন, কিছুদিন আগেই আবাদকৃত বোরো ধান কৃষকরা গোলায় তুলেছেন। সে ধান উঁচু জায়গায় সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। এখন মাঠে থাকা কর্তনযোগ্য সবজি কেটে ফেলার পরামর্শ কৃষক—কৃষাণীদের দেওয়া আছে। ছাতকে ৩ হেক্টর আউশ ধান পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পানি নেমে গেলে পরিমাণমতো ইউরিয়া সার প্রয়োগ করলে ঠিক হয়ে যাবে। কৃষকদের এসকল পরামর্শ দেওয়া আছে। 
এদিকে তাহিরপুরে বন্যা সতর্কতার জন্য ৭টি ইউনিয়নে ৩৯টি বন্যাশ্রয় কেন্দ্র খুলেছে উপজেলা প্রশাসন। এছাড়াও জরুরী প্রয়োজনে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ২৪ ঘন্টা খোলা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আবুল হাসেম।
তিনি জানিয়েছেন, নদীতে পানি বাড়ায় হাওরে প্রবেশ করছে। এখনও হাওর পানিতে পরিপূর্ণ হয়নি। তবুও সতর্কতার জন্য ৭টি ইউনিয়নে ৩৯টি বন্যাশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। 
সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, বন্যার সময় চর্মরোগ, ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এজন্য আমাদের কাছে পর্যপ্ত পরিমাণে ডায়েরিয়া ও কলেরার স্যালাইনসহ পানিবাহিত রোগের ওষুধ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও যদি পানি বাড়ে তাহলে দ্রুত আশ্রয় কেন্দ্র অথবা পাশ^বর্তী উঁচু বাড়িতে যেতে হবে। সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে। নিরাপদ পানি পান করতে হবে। প্রয়োজন না হলে বাইরে বের না হওয়া ভালো। কারণ এই সময়ে সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ খালেদুল ইসলাম বলেন, স্বল্পমেয়াদি বন্যার পূর্বাভাস আমরাও পেয়েছি। টিউবওয়েল যদি প্লাবিত হয়, তাহলে সে টিউবওয়েলের পানি পান করা যাবে না। আমাদের কাছে প্রায় ৮ লক্ষ পানি বিশুদ্ধকরণ টেবলেট রয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় সেগুলো পৌছে দেওয়া হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে আক্রান্ত এলাকায় সেগুলো পৌছে দেওয়া হবে। 
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বললেন, গত কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত নদীর পানি বেড়েছে। তবে এখনও কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। এরকম বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে জেলার কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। তবে বড় ধরণের বন্যার কোনো আশঙ্কা এখনো নেই।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার