সর্বনাশা জুয়ায় সর্বশান্ত

প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর, ২০২৩ ০৮:২০

অনলাইন জুয়া। দেশের যুব সমাজ ধ্বংসের জন্য মারাত্মক এক প্লাটফর্মের নাম। শহর বন্দর ছাপিয়ে জুয়ায় এখন আসক্ত গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ কিশোর ও যুব সমাজ। শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় এমন খেলায় এখন মত্ত হয়েছেন উঠেছেন কিশোর—যুবকরা। শুধু কিশোর কিংবা যুব সমাজই নয়, ক্ষেত্র বিশেষে বয়স্ক লোকেরাও জড়িয়ে পড়ছেন এমন বিধ্বংসী খেলার নেশায়। এতে যেমন সামাজিক অবক্ষয় ভয়ংকর আকার ধারণ করছে তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও অনেক পরিবার হচ্ছে সর্বশান্ত। সমাজ ও পরিবারে বাড়ছে অশান্তি। অভিভাবক ও সচেতন মহলে বাড়ছে উদ্বেগ। 
অনুসন্ধানে জানা যায়, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে এ ধরণের জুয়ায় অংশগ্রহণ করেন জুয়ারিরা। এক্ষেত্রে Bet360, 1XBet, Melbet, Lenbet  সহ আরও একাধিক অ্যাপ ব্যবহার করা হয়। সবগুলো অ্যাপকে এক সাথে বলা হয় বেটিং সাইট। এসব অ্যাপ রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পরিচালিত হয়ে থাকে। নির্ধারিত অ্যাপে খেলায় অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির নামে কিংবা পরিচিত অন্য ব্যক্তির নামে একটি একাউন্ট খুলতে হয়। এই একাউন্টে কিনতে হয় সরকারি অনুমোদনহীন ভাচ্যুর্য়াল মুদ্রা বা ক্রিপ্টো কারেন্সি। এজন্য ওই ব্যক্তিকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ‘এজেন্ট’ নামধারী কতিপয় দালাল চক্রের ব্যক্তিকে পরিশোধ করতে হয় দেশীয় টাকা। যে পরিমাণ টাকা এজেন্টকে পরিশোধ করা হবে সে অনুপাতে ক্রিপ্টো কারেন্সি দেওয়া হবে জুয়ারি ব্যক্তিকে। টাকাগুলো লেনদেন করতে সাধারণত ব্যবহার করা হয় বিকাশ, রকেট ও নগদ নামের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা। তবে এ অঞ্চলে বিকাশের ব্যবহার হয় মাত্রাতিরিক্ত বেশি। এসব টাকার বেশির ভাগ অংশই চলে যায় যে দেশ থেকে অ্যাপটি পরিচালিত হয় সেই দেশে। এভাবেই অত্যাধুনিক ফর্মুলায় সকলের চোখের সামন দিয়েই প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে।
‘২০২১ সালের সিআইডির দেওয়া এক তথ্য থেকে জানা যায়, শুধুমাত্র অনলাইন অ্যাপসের মাধ্যমে জুয়া খেলে প্রতি মাসে ২০—২৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।’ বর্তমানে জুয়ারির সংখ্যা সে সময়ের তুলনায় বেড়েছে অনেকগুণ। তাই পাচারকৃত টাকার পরিমাণও বেড়েছে সেই অনুপাতে।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, শান্তিগঞ্জ উপজেলার একেবারে প্রান্তিক এলাকায়ও অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছেন কিশোর বয়সী ছেলেদের থেকে শুরু করে যুবক ও বৃদ্ধরা। শুধু যে শান্তিগঞ্জ উপজেলাতেই এমন হচ্ছে তা কিন্তু নয়, সমস্ত দেশেরই একই অবস্থা। জুয়ার বিভিন্ন অ্যাপ থাকলেও শান্তিগঞ্জ উপজেলায় 1XBet এর ব্যবহার হয় খুব বেশি। ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেট, তীর, লুডু, বিমান, ক্যারামসহ এমন কোনো খেলা নেই যা এই অ্যাপে খেলা যায় না। বিভিন্ন লীগ নিয়েও বাজি হয়ে থাকে এই অ্যাপে।
উপজেলার পাগলা বাজার, পাথারিয়া বাজার, আক্তাপাড়া মিনাবাজার, শান্তিগঞ্জ বাজার, দামোদরতপী পয়েন্ট, মামনপুর পয়েন্ট, পাগলা পশ্চিম পাড়া পয়েন্ট, বীরগাঁও বাজার, খালপাড়, নোয়াখালী বাজার, জিবদারা বাজার ও ছাতক উপজেলার বড়কাপন পয়েন্টসহ বিভিন্ন পয়েন্ট ও খেলার মাঠে বসে এমন ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেন তরুণরা। উপজেলার বিভিন্ন স্থানের পয়েন্টগুলোর চায়ের দোকানে, সিএনজি—লেগুনায়, খেলার মাঠের কোনে এমনকি রাস্তার পাশে বসে আড্ডা দেওয়া ছলে এসব খেলা খেলে থাকেন জুয়ারিরা। মোবাইল ফোনে নীরবে বসে খেলা যায় বিধায় পাশে থাকা লোকজন কিংবা অভিভাবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনও খুব একটা বুঝে উঠতে পারেন না কে খেলছেন।
সূত্র জানায়, এমনও জুয়ারি আছেন যে এক গেইমে চার লক্ষ টাকা জিতে আধা ঘন্টার মধ্যে হেরে আবার শূন্য হাতে বাড়ি ফিরেছেন। কেউ আবার দশ লক্ষাধিক টাকা ঋণ করে নিঃস্ব হয়ে স্ত্রী সন্তানকে রেখে ছেড়েছেন ঘরবাড়ি। জুয়ারি চক্রের লোকজন স্থানীয় বাজারগুলোর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকান থেকে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মাধ্যমে ছোট ছোট লেনদেন করে থাকে। সর্বনিম্ন ১শ’ টাকা থেকে সর্বোচ্চ টাকার বাজি খেলা যায় বিধায় নিম্ন আয়ের লোকজনও জড়িয়ে পড়ছেন এই নেশায়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকানগুলোতে ১শ’, ২শ’ ও ৩শ’ টাকার লেনদেন হয় বেশি। স্ন্যাকবারের দোকানদার, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকানদার, পান—বিড়ির দোকানদার ও সিএনজি—লেগুনা শ্রমিকসহ ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কোনো কোনো বড় ব্যবসায়ীরাও এসব খেলার নামধারী ‘এজেন্ট’ থাকেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। বেকার, ছোট—বড় ব্যবসার সাথে জড়িত লোকজন, দিনমজুর অনেক যুবক এমনকি কোমলমতি অনেক শিক্ষার্থীরাও এমন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জুয়ারি বললেন, দীর্ঘ দিন ধরে খেলি। হারতে হারতে জীবনটা বরবাদ করে ফেলেছি। একবার জিতলে একমাস দুইমাস যায় হারতে হারতে। এটা একটা নেশার মতো। এসব খেলায় কোনো লাভ নেই। নিঃস্ব হয়ে অনেকে ঘরবাড়ি এমনকি এলাকা ছাড়া হয়েছেন।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন শান্তিগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি হোমিও চিকিৎসক শাকিল মুরাদ আফজল বললেন, যে হারে সমাজে অনলাইন জুয়া বাড়ছে তাতে আমরা ক্রমশ: উদ্বিগ্ন হচ্ছি। একটা ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে সমাজ। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আমাদেরও দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিজেদের সন্তানদের উপর চোখ রাখতে হবে সে কখন কি করে। চাওয়া মাত্রই তার হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়া ঠিক হবে না। পারিবারিক সুশিক্ষায় তাকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে।
শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খালেদ চৌধুরী বলেন, এটা এমন একটি খেলা যা জুয়ারিরা মোবাইলে খেলে থাকেন। দেখে বুঝার উপায় নাই যে এই ব্যক্তিই জুয়া খেলছেন। তবে আমরা বসে নেই। প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার করে আমাদের অভিজ্ঞ টিম মাঠে কাজ করছে। একাধিক জুয়ারিকে এর আগে গ্রেফতারও করেছি আমরা। আমাদের কাজ চলমান আছে। শুধু আমাদের কাজ করলে হবে না, সাধারণ মানুষ আমাদেরকে সহযোগিতা করতে হবে। যখন কয়েকজন একসাথে বসে জুয়া খেলে তখন আমাদের খবর দিতে হবে। আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবো। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলের হাতে মোবাইল ফোন তুলে না দিয়ে তাদেরকে পড়াশোনার প্রতি উৎসাহিত করে তুলতে হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার