প্রকাশিত: ২৬ জুন, ২০২৫ ০৮:১৯
প্রশাসনের জব্দ করা কোটি কোটি টাকার বালু বিনা বাধায় প্রকাশ্যেই নিয়ে যাচ্ছে বালু খেকোরা। সরকারি এই সম্পদ লুটের নেতৃত্বে দিচ্ছেন স্থানীয় উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক। প্রশাসনও সেখানে নির্বিকার। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পাহাড়ি নদী ধামালিয়ার পাড়ে লুটের এমন মহোৎসব চলছে। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রাজু আহমেদ অবশ্য বলছেন, ‘এসব অভিযোগ সত্য নয়, অবৈধকাজে বাধা দেওয়ায় এমন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’
পাহাড়ি নদী ধামালিয়া ভরাট হয়ে হয়েছে ‘বালুরখনি’। এই নদীর কয়েক কিলোমিটার এলাকায় লাখ লাখ ঘনফুট বালু রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর তলদেশ শুকিয়ে যায়। এই সুযোগে নদীর তীরবর্তী জলিলপুরসহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বড় বড় স্তূপ করে রেখেছিলেন। কয়েক লাখ ঘনফুট বালু এখানকার বিভিন্ন স্তূপে রয়েছে। দুই মাস আগে উপজেলা প্রশাসন উত্তোলনকৃত এসব বালু জব্দ করে। সরকারি হিসেবে জব্দকৃত এই বালুর পরিমাণ এক লাখ ৮০ হাজার ঘনফুট। টাকার অংকে এই বালুর মূল্য দেড় কোটি টাকারও বেশি। জব্দকৃত বালু নিলামের কোন উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন। সম্প্রতি নদীতে পানি আসলে স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় বালুখেকো চক্রের সদস্যরা বাল্কহেড, ট্রলার, ট্রাক ভরাট করে এসব বালু নিয়ে যাচ্ছে। আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা বালু বহনকারী নৌকা—বাল্কহেড আটক করলেও পুলিশ ছেড়ে দিচ্ছে কৌশলে। গেল সপ্তাহে আইন—শৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছবাব মিয়া জব্দকৃত সরকারি সম্পদ কেন নিলাম দেওয়া হচ্ছে না, প্রশ্ন তুললে গণমাধ্যম কর্মীসহ সকলের নজরে আসে বিষয়টি।
বুধবার ওই এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা জানতে পারেন, গেল ২২ জুন অর্ধশত ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে জব্দের বালু নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে বিশ^ম্ভরপুর থানার এসআই মজিবুর রহমান ঘটনাস্থলে এসে এই বাল্কহেডগুলো জব্দ করেন। এই পুলিশ কর্মকর্তা বসন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা নজু মিয়ার ছেলে মো. বকুল মিয়ার হেফাজতে দেন এসব বালু বোঝাই বাল্কহেড। এসআই মজিবুর রহমান জিম্মানামায় বকুল মিয়ার স্বাক্ষরও নেন। কিছুক্ষণ পরেই বালুসহ জব্দকৃত এসব বাল্কহেড নিয়ে যায় বালুখেকো চক্রের সদস্যরা।
এই ঘটনার পরের দিন জিম্মানামায় স্বাক্ষর দেওয়া বকুল মিয়া জেলা প্রশাসকের কাছে এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে জব্দনামায় স্বাক্ষর নেওয়ার পর পুলিশের সামনেই বালু বোঝাই বাল্কহেডগুলো নিয়ে যাওয়া হয় বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
বকুল মিয়া বলেন, ভরাট হওয়া ধামালিয়ার পাড়ের জলিলপুর গ্রামের প্রতিটি বাড়ির পেছনে বালু স্তূপ করে রাখা আছে। এসব বালু উপজেলা প্রশাসন জব্দও করেছে। একটি চক্র এই জব্দকৃত বালু নদীপথে নিয়ে যাচ্ছে। গেল ২২ জুন রাতে জব্দকৃত বালু লুটের সময় পুলিশকে ফোন দেই। তারা অনেক পরে এসে চারটি বালু ভর্তি বাল্কহেড জব্দ করে সাদা কাগজে আমার স্বাক্ষর নেন। পরে তাদের সামনেই বালু ভরাট বাল্কহেড নিয়ে গেছে। তারা কিছুই বলেন নি। বিষয়টি পরের দিন জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছি।
পাশের বসন্তপুর পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মো. সুহেল বললেন, নদীতে ড্রেজার ও সনাতনি পদ্ধতিতে বালু তোলা হয়েছে। ঢলের পানি আসার পর নদীর প্রশস্ততা বেড়েছে। তাতে কিছুদিন পর দুইপাড়ের বাসিন্দারা নদী ভাঙণের শিকার হবেন। এই অবৈধ কাজের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের শাস্তির আওতায় আনা না গেলে সরকারি সম্পদ লুটপাটে উৎসাহিত হবে অনেকে।
হালাবাদি গ্রামের বাসিন্দা মো. আল—আমিন বললেন, প্রশাসনের জব্দকৃত বালু কিভাবে লুট হয়ে যায়? আমরা প্রশাসনকে জানালেও কার্যকরী কোনো উদ্যোগ দেখছি না। উল্টো সিন্ডিকেটের হুমকি ধমকি সহ্য করতে হচ্ছে।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম খন্দকার বললেন, জব্দকৃত বালু লুটপাটের প্রতিবাদ করায় আমাকে হুমকি দিয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রাজু আহমেদ। কয়েকদিন আগে কয়েকটি বালু বোঝাই ইঞ্জিন নৌকা আটকিয়ে পুলিশকে খবর দিয়েছি। পরে জানতে পারলাম এই বালু লুটপাটের পেছনের কারিগর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রাজু আহমেদ।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রাজু আহমেদ বললেন, আহ্বায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পরে বালু লুটপাটসহ সকল অবৈধ কাজ বন্ধে প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছি। এখানে আমার কোনো ব্যবসা নেই। তিনি বলেন, আহ্বায়কের দায়িত্বে যেহেতু রয়েছি, তাই উপজেলা বিএনপির সকলে আমার লোক। নদী থেকে যারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেছে তারা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এরাই বিএনপির সুবিধাভোগী কিছু মানুষকে নিয়ে এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ধরা পরলে তারা আমার নাম বলে। প্রশাসনকে বলেছি, যেই আমার নাম বলবে, তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য। এক্ষেত্রে প্রশাসনকে আমি সহযোগিতা করবো।
বিশ^ম্ভরপুর থানার এসআই মজিবুর রহমান বলেন, ২২ জুন রাতে অন্য ডিউটিতে ছিলাম। অফিসার ইনচার্জের মাধ্যমে জানতে পারি বসন্তপুর এলাকায় কিছু বালু ভর্তি নৌকা নিয়ে যাচ্ছে, পরে ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে যাই। স্থানীয়দের সহযোগিতায় ওখানে চারটি বালু বোঝাই নৌকা আটক করি। স্থানীয় ইউপি সদস্যের ভাই বকুল মিয়ার কাছে চারটি নৌকা জিম্মায় দিয়ে চলে আসি। পরে জানলাম নৌকাগুলো চলে গেছে, এখন এই চার নৌকা আটক করতে অভিযান চলছে।
বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ছবাব মিয়া বললেন, এক লাখ ৮০ হাজার ঘনফুট বালুর দাম কমপেক্ষ দেড়কোটি টাকা। অন্য আরও অনেকের বালুও এখানে আছে। সরকারি এই বালু লুটপাট যাতে না হয়, সেজন্য আইন—শৃঙ্খলা সভায় জানতে চেয়েছি, ‘জব্দকৃত বালু নিলাম কেন হচ্ছে না।’
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মফিজুর রহমান বললেন, কয়েকমাস আগে স্থানীয়রা জানালে, ওখানকার এক লাখ ৮০ হাজার ঘনফুট বালু সহকারী কমিশনারের মাধ্যমে জব্দ করা হয়। সহকারী কমিশনার ভূমি এখন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। শুনেছি জব্দকৃত বালু কারা নিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রেজাউল করিম বললেন, জব্দকৃত বালু আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দ্রুত যথাযথভাবে নিস্পত্তি করা হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন