প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৫ ২১:৫২
ওমান ফেরত রেমিট্যান্স যোদ্ধা আলমগীর হোসেন। পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক। বাড়ি শান্তিগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নের আক্তাপাড়া এলাকায়। বিয়ের উদ্দেশ্যে দেশে এসেছিলেন তিনি। গত শুক্রবার তার বিয়ের দিন ধার্য্য করা হয়েছিলো দিরাই এলাকার এক কনের সাথে, কিন্তু সে বিয়ে হয়নি। ২৩ জুন সোমবার পাগলা—জগন্নাথপুর সড়কে ইউনিয়নের সিচনী এলাকায় প্রাইভেট কার—সিএনজির সংঘর্ষে গুরুতরভাবে আহত হন তিনি। এক পা খুব বিপদজনকভাবে ভেঙে গেছে। বর্তমানে সিলেটের ওসমানী মেডিকেলে চিকিৎসাধীন আছেন। এতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার বিয়ে ও প্রবাসে ফেরা। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৪ জন।
২৪ জুন উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের দামোধরতপী পয়েন্ট এলাকায় ট্রাক— প্রাইভেট কারের সংঘর্ষে আনোয়ারা বেগম নামের আশি বছরের এক বৃদ্ধা নিহত হন। আহত হয়েছেন ৫ জন। নিহত আনোয়ারার বাড়ি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বইশবের গ্রামে। এর পরদিন বুধবার দুইটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। একটিতে একজন নিহত হলেও আরেকটিতে কারও প্রাণহানি ঘটেনি।
জয়কলস উজানীগাঁও পয়েন্টে ত্রিমুখী সংঘর্ষে নিহত হন মিলন মিয়া (৩০) নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীসহ গুরুতর আহত হয়েছেন মোট ৫ জন। একই দিনে বেলা সাড়ে ১১টায় ডাবর সংলগ্ন এলাকায় দুর্ঘটনায় ৪ যাত্রী মারাত্মক জখমের শিকার হয়েছেন। এর আগে ২৯ মার্চ সুমাইয়া নামের ৮ বছরের এক শিশু রাস্তা পারাপারের সময় নূর পরিবহন নামের দূর পাল্লার একটি বাসের চাপায় পিষ্ট হয়েছে। ঘটনাস্থলেই নিহত হয় শিশু সুমাইয়া। সে ঢাকা থেকে তার পরিবারের সাথে ঈদ উদযাপন করতে বাড়িতে এসেছিলো।
এসব দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২৩ জুন থেকে তিন দিনের চার দুর্ঘটনায় দুইটি প্রাণহানি ও বিশ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের কাউকে কাউকে হয়তো স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে নিতে হবে। আলমগীর হোসেনের বিদেশে ফেরা যেমন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তেমনি দুর্ঘটনা কবলিত অন্যান্য আহতরাও আছেন মারাত্মক ঝুঁকিতে। উজানীগাঁও পয়েন্টে ঘটা দুর্ঘটানায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনও এখন হুমকির মুখে। হঠাৎ আসা ঝড়ের মতোই যেনো দুর্ঘটনা কবলিত মানুষগুলোর জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে মহামারি সড়ক দুর্ঘটানা।
গত এক বছরে সুনামগঞ্জ জেলায় ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য প্রকাশ করেছে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। তাদের দেওয়া তথ্য মতে, ২০২৪ সালে শুধুমাত্র সুনামগঞ্জ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬৪টি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৬ জন হতভাগ্য মানুষ। আহত হয়েছেন ১০৮ জন। গত এক বছরের গড় হিসাবে দেখা গেছে, সুনামগঞ্জে ৫—৬ দিন অন্তর একটি করে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ইদানিং এই পরিসংখ্যান আরো ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। বেড়েছে দুর্ঘটনার সংখ্যা। সিলেট বিভাগে গত ৩৬৫দিনে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩৫৯টি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৭৫ জন লোক। এদের মধ্যে নারী—পুরুষ, শিশু, শিক্ষার্থী ও পরিবহণ শ্রমিকও রয়েছেন। দেশের সামগ্রিক পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধুমাত্র গত ঈদ যাত্রায় (ঈদুল আজহার আগে ও পরের ১৫ দিনে) ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে মৃত্যু হয়েছে ৩৯০ জনের। আহত হয়েছেন প্রায় ১২০০ মানুষ।
কেনো ঘটছে এসব দুর্ঘটনা?
এমন প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গিয়ে এই প্রতিবেদক কথা বলেছেন বেশ কয়েকজন চালক, হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ ও সচেতন মানুষের সাথে। তাঁদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সড়কে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে মূলত ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অদক্ষ চালকদের কারণে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন অথোরিটি বা বিআরটিএ’র কথিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রকৃত যোগ্যতা যাচাই—বাচাই ছাড়া অদক্ষ ব্যক্তিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তারা।
এছাড়াও ট্রাফিক আইন না মেনে যত্রতত্র ওভারটেকিং, অবৈধ পার্কিং, অসচেতনভাবে রাস্তা পারাপার, ভাঙাচোরা রাস্তা, রাস্তায় অতিরিক্ত বাঁক, আঞ্চলিক ও মহাসড়কে গরু—ছাগলের অবাদ বিচরণ, সরু বা ছোট রাস্তা, চালকদের স্বাস্থ্যগত দুর্বলতা, বিরামহীন গাড়ি চালানো, ড্রাইভিং—এর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা, নেশাদ্রব্য সেবনের প্রবণতা, অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালক, ট্রাফিক আইন না মেনে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ, ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি সেতু, রোড সিগন্যাল সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব ও না মনাসহ বেশ কিছু কারণে সড়কে দিন দিন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয়রা জায়িছেন, শান্তিগঞ্জ উপজেলায় প্রধান তিনটি সড়ক রয়েছে। সিলেট—সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক, পাগলা—জগন্নাথপুর সড়ক ও মদনপুর—দিরাই সড়ক। এই তিনটি সড়কে প্রতিদিনি হাজার হাজার যান চলাচল করে। এসব সড়কে রয়েছে বড় বড় অনেক বাঁক। একপাশ থেকে আরেক পাশের কোনো কিছু দেখা যাবে তো দূরের কথা অপর পাশ থেকে বুঝার উপায় নেই যে অন্য পাশ দিয়ে গাড়ি আসছে।
বিশেষ করে মদনপুর—দিরাই সড়কের বাঁকগুলো বেশ বড়। সুনামগঞ্জ—সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক ও পাগলা—জগন্নাথপুর সড়কের শান্তিগঞ্জ এলাকায় আছে বড় বড় বাঁক। এসব বাঁক নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুকান্ত সাহা। তিনি বলেছে, আমি আসার পর থেকে উপজেলায় বেশ কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এখানকার সড়কগুলোর বাঁক অনেক বড় বড়। দুর্ঘটনার আশঙ্কা করে আমি বিভিন্ন জায়গায় স্পিডব্রেকার বা গতিরোধক বসানোর প্রস্তাব করেছি। বড় বড় বাঁকগুলোতে লুকিং মিরর বসানোরও প্রস্তাব করেছি। এগুলো বসানো গেলে আশা করছি দুর্ঘটনা অনেকটা রোধ হবে।
দুর্ঘটনা রোধে করণীয়
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে জানতে এই প্রতিবেদকের কথা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. শাহনেওয়াজ হাসনাত—ই—রাব্বীর সাথে। তিনি বলেন, তখনই সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে যখন আমরা সড়ক ব্যবস্থাপনাকে সামগ্রিকভাবে একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নিয়ে আসতে পারবো। বিআরটিএ ড্রাইভারদেরকে সঠিকভাবে লাইসেন্স দিবে, ফিটনেস দেখে চলাচলের উপযোগী গাড়িকে অনুমোদন দিলেই সড়ক দুর্ঘটনা কমতে শুরু করবে। যেসব প্রতিষ্ঠান সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ বা সড়ক রক্ষার দায়িত্বে আছেন তারা দক্ষ ব্যক্তিদের কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সড়কের সংস্কার করলেও সড়ক দুর্ঘটনা রোধ হবে। এতে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারগণ বেশি ভূমিকা পালন করতে পারেন এবং পথচারীদের সচেতন থাকতে হবে। তারা কীভাবে রাস্তা পারাপার করতে চান তাদের চাহিদার কথা চিন্তা করে নিরাপদ উপায়ে পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাস্তায় চলাচল ও ট্রাফিক আইন মানার ব্যপারে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। ট্রাফিক আইন মানতে হবে। না মানলে আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারে এখনই বৃহৎ পরিসরে ভাবতে হবে। মূলত: সড়কে যানবাহন ও পথচারীদের আলাদা চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এছাড়াও চালকদেরকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। তাদেরকে বুঝাতে হবে যে, তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন এবং সেটা খুবই সংবেদনশীল।
ড্রাইভিং—এর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। ভাঙাচুরা রাস্তা ঠিক করতে হবে। মহাসড়ক বা আঞ্চলিক মহাসড়কে গরু—ছাগলের বিচরণ বন্ধে স্থানীয় মানুষকে ভূমিকা পালন করতে হবে। চালকরা নেশাদ্রব্য সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে। এক টানা সারা মাস গাড়ি না চালিয়ে সাপ্তাহিক ছুটি নিয়ে গাড়ি চালালে দুর্ঘটনা কমে আসতে পারে। বিআরটিএ তার দায়িত্ব যথাযতভাবে পালন করতে হবে। তাহলে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেরা দক্ষতা অর্জন না করে ড্রাইভিং সীটে বসতে পারবেন না। প্রয়োজনী সব পদক্ষেপ নিতে হবে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)—এর সহ—সভাপতি ওবায়দুল হক মিলন বলেন, চালকদের অসচেতনাতার কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। আর লক্করঝক্কর যানবাহন তো আর আছেই। অথচ এসব প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ নেই বিআরটিএ অফিসে।
ট্রাফিক পুলিশও অনিয়মে জড়িত। অনুমোদনহীন অনেক যানবাহনের কারণেই বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। ফুটপাতে অবৈধ স্থাপনা, সিগন্যালবিহীন গাড়ি ও সড়ক, অবৈধ পার্কিং এবং বাসস্ট্যান্ডগুলো বেদখল হচ্ছে। এসব প্রতিকারে নিয়ে আসা দরকার। চালকদের প্রশিক্ষণ ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে করণীয় শীর্ষক একটি কর্মসূচি হাতে নিতে একটি প্রস্তাব আমাদের কেন্দ্রিয় কমিটিতে পাঠাবো।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটির (বিআরটিএ) সুনামগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের মোটরযান পরিদর্শক শরীফুল ইসলাম রাসেল বলেন, আমাদের এখান থেকে যখন কোনো চালককে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হয়, তখন তার সব যোগ্যতা যাচাই করা হয়। কোনো একটি যোগ্যতা ব্যতিরেখে কাউকেই ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হয় না। আর ফিটনেস ছাড়া গাড়িকে তো কোনোভাবেই অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই। রাস্তায় যেসব অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালকরা গাড়ি চালাচ্ছেন বা ফিটনেসবিহীন গাড়ি আছে তাদের ব্যপারে আমাদের মোবাইল কোর্ট অভিযান অব্যাহত আছে। আমরা এই ব্যাপারে খুবই সতর্ক।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন