প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৫ ২২:০১
মাছ, পাথর আর ধানের জেলা সুনামগঞ্জ। এখানকার মানুষ দুর্যোগের সাথে সংগ্রাম করে টিকে থাকে। টিকে থাকাই যেখানে একটি বড় লড়াই সেখানে চীনে গিয়ে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব—১৮ এশিয়া কাপ হকিতে জাতীয় দলের হয়ে অংশ নেওয়া যেনো চ্যালেঞ্জের উপরে চ্যালেঞ্জ। দুঃসাহসিকতা তো অবশ্যই। সেই দুঃসাহসিক কাজটি করেছেন শান্তিগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাঁক ইউনিয়নের দুর্গম গ্রাম ঢালা’র এক অপার সম্ভাবনাময়ী মেয়ে নাদিরা তালুকদার ইমা। ৩০ জুন সন্ধ্যায় হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে চীনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) থেকে নির্বাচিত হয়ে চীনে যাচ্ছেন ইমা। ইমা এবছর বিকেএসপির মাধ্যমিক স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন।
১৬ নম্বর জার্সিতে চীনের দাজহৌ’র হকির নীল মাঠ মাতাবেন সুনামগঞ্জের এই ‘হাওর কন্যা। ৪ জুন সকাল ৮টায় জাপানের মুখোমুখি হয়ে অনূর্ধ্ব—১৮ এশিয়া হকি কাপের মিশন শুরু করবে টিম বাংলাদেশ মহিলা দল। ৫ জুন বিকাল ৫টায় উজবেকিস্তান ও ৭ জুন বিকাল ৫টায় হংকং, চায়নার সাথে খেলবে বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বে নিজেদের সেরা প্রমাণ করতে পারলে ৯ জুলাই সেমিফাইনাল ও ১৩ জুলাই ফাইনাল খেলবে টিম বাংলাদেশ। ১৪ জুলাই দেশে ফেরার কথা রয়েছে তাদের।
ছোটবেলা থেকে খেলাধুলায় আগ্রহী ইমার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢালা গ্রামের ডিকেসিআর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে মাধ্যমিকে ভর্তি হন সাতগাঁও জিবদারা উচ্চ বিদ্যালয়ে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময় সম্প্রতি শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে এনটিআরসিএর সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষক, বড়ভাই হোসাইন আহমদের হাত ধরে পাড়ি দেন বিকেএসপিতে। শুরু হয় নতুন জীবন। আর পেছন ফিরে থাকাতে হয়নি ইমাকে। এর আগে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের হয়ে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত উইমেন্স জুনিয়র এএইচএফ কাপ খেলেছেন ইমা। তখন একটি গোলও পেয়েছিলেন তিনি। অনুর্ধ্ব ২১ দলেও খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। এছাড়া ওমানেও বাংলাদেশের হয়ে খেলেছেন সুনামগঞ্জের এই মেয়ে।
ইমার টিকে থাকার লড়াই
নাদিরা তালুকদার ইমার বাবা মুসলিম তালুকদার ৯ সন্তানকে রেখে ২০২২ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন। ২ ছেলে ও ৭ মেয়েকে নিয়ে পশ্চাৎপদ হাওর এলাকায় টিকে থাকার করুণ লড়াই করেছেন ইমার মা মাজেদা তালুকদার। সবার ছোট মেয়ে ইমা তাদের ভরসার ফুল হয়ে ফুটেছে। গ্রাম থেকে বিকেএসপিতে যান ২০২১ সালে করোনাকালীন সময়ে। ৯ সন্তানের সবচেয়ে ছোট মেয়েকে ঢাকা পাঠিয়ে ভালো ছিলেন না মা মাজেদা তালুকদার। গ্রামীণ মানুষদের অনেকে বিষয়টি সহজভাবে নিলেও অনেকে দেখেছেন বাঁকা চোখে। সব কিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ইমা আজ সুনামগঞ্জবাসীর গর্বে পরিণত হয়েছেন। বিদেশের মাটিতে উড়াচ্ছেন বাংলাদেশের পতাকা।
ইমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন তাঁর পরিবার ও এলাকাবাসীর। ইমার ভাই হোসাইন আহমদ বললেন, আমি চাই ইমা বাংলাদেশের নাম বিশ্ব দরবারে উজ্জ্বল করুক। সে দেশের হয়ে তার সেরা পারফরম্যান্সটাই দিক। একজন ইমা এখন আর আমাদের পরিবারের সম্পদ নয়, এখন সে দেশের সম্পদ। আমি চাই ইমাকে বাংলাদেশ সরকার সঠিক পরিচার্যা করুক। যদি সরকার তাদেরকে ভালো সুযোগ সুবিধা দেয় তাহলে বাংলাদেশকে তারা ভালো কিছু দিতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এমন আরও অসংখ্য ইমারা আছেন। কিন্তু সুযোগের অভাবে তারা বের হয়ে আসতে পারছেন না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের জেলায়—ই তো হকি খেলার সরকারি কোনো ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে মেয়েদের বেলায় তো বিষয়টি রীতিমতো অবহেলার। জেলায় জেলায় যদি সুব্যবস্থা থাকতো, তাহলে বাংলাদেশ খেলাধুলায় আরো অনেক ভালো কিছু করতো।
নাদিরা ইমার শিক্ষক জিবদারা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নোমান আহমদ বলেন, ইমা ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলায় আগ্রহী ছিলো। তার বড় ভাই হোসাইন তাকে খুব উৎসাহিত করতেন। ইমার কাছে আমাদের প্রত্যাশা দেশের হয়ে সে তার সর্বোচ্চ সেরাটা দিয়ে খেলে দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাক।
জেলা প্রশাসক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার এডহক কমিটির আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, এটা আমাদের জন্য আনন্দের সংবাদ যে, আমাদের এখানের একটা মেয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খেলছে। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে তাকে যতটুকু সাপোর্ট দেওয়া দেওয়া দরকার বা তদারকি করা দরকার তা করবো। জেলা পর্যায়ে আরও বেশি সুযোগ সুবিধা থাকলে আরো অনেক প্রতিভাবান খেলোয়ার বেরিয়ে আসতে পারতো। খেলোয়ার বের করে আনতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতটুকু পৃষ্ঠপোষকতা করা লাগে আমরা তা করবো।
উল্লেখ্য, ৩ জুন চীনের দাজহৌতে শুরু হবে হকির এশিয়া কাপ। বাংলাদেশ, জাপান, চীন (আয়োজক), উজবেকিস্তান, হংকং চীন, চাইনিজ তাইপিই, শ্রীলঙ্কা, কাজাখস্তানসহ এশিয়ার ৮টি দেশ খেলবে এই টুর্নামেন্টে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন