তবুও হাওর দাপাচ্ছে হাউসবোট

প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০২৫ ২২:৫৪

কয়েক দফায় নীতিমালা করেও টাঙ্গুয়ার হাওরকে পরিকল্পিত পর্যটনের আওতায় আনতে পারছে না জেলা প্রশাসন। বিশেষ করে পর্যটকবাহী হাউসবোটগুলোকে নির্ধারিত রোড ব্যবহারে বাধ্য করা যাচ্ছে না। এতে টাঙ্গুয়ার হাওরসহ আশেপাশের হাওরগুলোর ইকোসিস্টেম, ফসলি জমি, অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধের ক্ষতি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওসবোটগুলোকে নির্ধারিত রোড ব্যবহারে বাধ্য করা গেলে এই ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এজন্য প্রযুক্তির সাহায্যে হাউসবোটগুলোকে মনিটরিং করা যেতে পারে।

 


জেলা প্রশাসন টাঙ্গুয়ার হাওরে নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের আওতায় আনতে কয়েক দফা নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এসব নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে প্রচারণা, জরিমানাও করা হচ্ছে মাঝেমধ্যে। তবুও হাউসবোটগুলোকে নির্ধারিত রোড মানতে বাধ্য করা যাচ্ছে না। নদীর যেদিকে অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ দুর্বল সেদিক দিয়েই হাওরে প্রবেশ করছে হাউসবোটগুলো। পরে হাওরের মাঝ দিয়ে চলে যাচ্ছে নির্ধারিত গন্তব্যে। এতে অস্থায়ী বাঁধের ক্ষতিসহ হাওরের মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণির ক্ষতি হচ্ছে।
‘হেমন্তে পাও, বর্ষায় নাও’ এমন প্রবাদ বাক্যে বুঝা যায় হাওরাঞ্চলের যোগাযোগের প্রকৃতি। শুকনো মৌসুমে দুর্গম পথে যাতায়াত করলেও বর্ষায় নৌকার বিকল্প ব্যবস্থা নেই। এজন্য যুগযুগ ধরে বর্ষায় যাত্রীবাহী হাজারও নৌকা চলাচল করে। ওইসকল নৌকা নদীপথ কিংবা হাওরের কিনার ঘেঁষে নির্ধারিত পথের বাইরে যায় না। এতে করে হাওরের ঝাউ, শেওলা বিভিন্ন উদ্ভিদসহ মাছের কোনো ক্ষতি হয়নি।

 

 


দায়িত্বশীলরা বলছেন, হাওরের ইকোসিস্টেম হল একটি জটিল বাস্তুতন্ত্র যা হাওর অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশকে সংজ্ঞায়িত করে। এটি জলজ এবং স্থলজ উভয় প্রকার জীব এবং তাদের আবাসস্থলের একটি আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা। হাওরের ইকোসিস্টেমের বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদ ও প্রাণী, যা এই অঞ্চলের জলবায়ু, মাটি এবং পানির পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। এই ইকোসিস্টেমের সুস্থতা হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
মধ্যনগর উপজেলার চামরদানী গ্রামের বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা স্থানীয় নৌকা নিয়ে একদিকে চলাচল করি, নির্ধারিত রোডের বাইরে চলাচল করি না। কারণ হাওরে ঝাউ বনের জন্য নৌকা চলে না। নৌকার ফ্যান (প্রপেলার) আটকে যায়। আর পর্যটকবাহী হাউসবোটগুলো নির্ধারিত রোড বা নদীপথে খুব কম চলাচল করে। বাঁধ একটু ভাঙা দেখলে সেদিকে হাওরে প্রবেশ করে, যেদিকে ইচ্ছে তারা যায়। কারণ তাদের হাউববোটের ফ্যান (প্রপেলার) বড় হওয়ায় ঝাউ বনে আটকায় না। এতে ধীরে ধীরে মাছ কমছে।


একই এলাকার বাসিন্দা মো. নুর আলম বলেন, হাওরে আগের মতো মাছ নেই। বাজারে গেলে শুধু পাঙ্গাস পাওয়া যায়। গত কয়েক বছরে হাউসবোটের সংখ্যা বেড়েছে। এগুলো হাওরের যেদিকে মন চায় চলাচল করে। এতে আমাদের স্থানীয়দের ক্ষতি হচ্ছে।

 


তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের গোবিন্দ্রশ্রী গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক মো. তৌফিক আহমেদ বলেন, হাওরের মাছ, পাখি, শেওলা, ঝাউসহ অন্যান্য উদ্ভিদ নিয়ে ইকোসিস্টেম রয়েছে। হাওরের মাঝ দিয়ে যখন বড় বড় হাউসবোট চলাচল করে তখন ইকোসিস্টেমের ক্ষতি হয়। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করে মাঝেমধ্যে মনিটরিং নয়, এটি বন্ধ করতে জেলা প্রশাসন আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।


হাওর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটকবাহী হাউসবোট নির্ধারিত রোড না মানার কারণে বোরো ফসলি জমি, অস্থায়ী বাঁধসহ মাছের ক্ষতি হচ্ছে। জেলা প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেও নির্ধারিত রোডে হাউসবোটগুলো চলাচল করছে না। এতে ক্রমশ ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।


সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, প্রশাসনের নীতিমালা উপেক্ষা করে হাউসবোটগুলো ইচ্ছে মতো হাওরে চলাচল করছে। একারণে টাঙ্গুয়ার হাওরসহ অন্যান্য হাওরে মাছ, জলজ উদ্ভিদ কমছে। এছাড়াও অস্থায়ী বাঁধেরও অনেক ক্ষতি হচ্ছে।

 

 


সুন্দরবন এলাকায় পর্যটনখাতে প্রায় বিশ বছর কাজ করেছেন মো. রনি শেখ। টাঙ্গুয়ার হাওরে এই পর্যটন মৌসুমে বিলাসবহুল হাউসবোট জলযাত্রার ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দিয়েছেন তিনি। টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রিক পর্যটকের ভবিষ্যৎ কী, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সুন্দরবনে প্রায় ২০ বছর পর্যটনখাতে কাজ করেছি। ওখানে পর্যটক ও সংশ্লিষ্টদের যেরকম নীতিমালা মানতে হয় তার তুলনায় টাঙ্গুয়ার হাওরে নীতিমালা মানতে দেখিনি। হাওরে ময়লা— আবর্জনা, প্লাস্টিক ভাসতে দেখেছি। প্রশাসন নিষেধ করেছে, তবুও এটি বন্ধ হচ্ছে না। প্রায় ১০ বছর ধরে টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রিক পর্যটক আসা শুরু করেছে। এখন আগের থেকে কয়েকগুণ বেশি বর্ষা মৌসুমে পর্যটক ঘুরতে আসেন। প্রশাসনের নীতিমালা না মানার কারণে হাওরের মাছ—পাখি কমছে। পানির নিচের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষ নানানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এরকম চলতে থাকলে কয়েক বছর পর হাওরে ঘুরতে কেউ আসবেন না। তাই পর্যটন এলাকার বিকাশ ও সাসটেইনেবল করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

 


আইটি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি হাউসবোটে জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো নিশ্চিত করা গেলে মনিটরিং সহজ হবে। একটি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে হাউসবোটের চলাচল দেখা যাবে। নির্ধারিত রোডের বাইরে গেলে অ্যাপস থেকেই জরিমানা সম্ভব। অনলাইনে জিপিএস কেন্দ্রিক নজরদারির জন্য জেলা প্রশাসন চিন্তা করতে পারে।

 


আইটি এক্সপার্ট মামুনুর রশিদ মামুন বলেন, হাউসবোটে ট্র্যাকিং ডিভাইস লাগিয়ে অ্যাপস বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নজরদারি করা সম্ভব। হাউসবোট কোন রোড ধরে যাচ্ছে জিপিএস সে তথ্য পাঠাবে। এছাড়াও হাউসবোটের যেকেনো প্রতিনিধির স্মার্টফোনে অ্যাপস ইন্সটল করে দিলেও সিগন্যাল পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি সব সময় হাউসবোটে থেকে অনলাইন থাকতে হবে। সম্প্রতি একটি জায়গায় এরকম কাজ করেছি আমরা। 
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক (রুটিন দায়িত্ব) মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, হাউসবোটগুলো জ্¦ালানি ও সময় বাঁচাতে হাওরের উপর দিয়ে চলাচল করে। এটি বন্ধ করতে হাউসবোট মালিকদের সঙ্গে সভা করে দৃঢ়ভাবে বলেছি, নির্ধারিত রোড না মানলে শক্ত আইনগত ব্যবস্থা নেবো। তারা এই কাজ করবে না অঙ্গিকার করেছে। তবুও আমরা একটি অ্যাপস তৈরি করেছি। কয়েকদিনের ভেতর সেটির কার্যক্রম চালু করবো। এখন হাউসবোটে জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস লাগালে মনিটরিং করতে সহজ হবে। 

 


তিনি বলেন, হাউসবোটগুলো ছাড়া আগে আমাদের প্রতিনিধি পরিদর্শন করে দেখবেন প্লাস্টিক সামগ্রী রয়েছে কিনা, এগুলো নেই নিশ্চিত হলে যাত্রা শুরু করার জন্য অনুমতি প্রদান করবো। ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় পলিথিনের প্যাকেট জাতীয় খাবার, প্লাস্টিক বোতলে কোমল পানি বিক্রি হয়, পর্যটকেরা খেয়ে সেগুলো পানিতে ফেলে দেন। এজন্য এ ধরণের পণ্য বিক্রি পুরোপুরি নিষেধ করে দিয়েছি।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার