পল্লি বিদ্যুৎ অফিসে সক্রিয় সিন্ডিকেট চক্র

প্রকাশিত: ০৬ জুলাই, ২০২৫ ০৯:২০

টাকা না দিলে মিলে  না গ্রাহকের সেবা

নতুন মিটার সংযোগ, ট্রান্সফার অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হয়ে যাওয়া মিটার ফেরত পেতে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না সুনামগঞ্জ পল্লি বিদ্যুতে। নিজে চেষ্টা করে অথবা সংশ্লিষ্ট অফিসের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে সেবা না মিললেও ইলেক্টিশিয়ানের মাধ্যমে কয়েকগুণ বেশি টাকা দিয়ে কাজ হয়ে যাচ্ছে সহজে। পল্লি বিদ্যুতের এমন সিন্ডিকেটের কথা শিকার করলেন সুনামগঞ্জ পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানাজার মিলন কুমার কুন্ডু। বললেন, অফিসের কারও সম্পৃক্ততা থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জ পল্লি বিদ্যুৎ অফিসে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরলেও কাঙ্খিত সেবা মিলে না গ্রাহকের। নতুন মিটার সংযোগ থেকে শুরু করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ট্রান্সফার অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে লাইন বিচ্ছিন্ন হলেই গ্রাহকের ভোগান্তি শুরু হয়। এমন সমস্যার সমাধানে প্রতিটি আবেদনে নির্ধারিত সরকারি ফি দিয়ে অনলাইনে আবেদন করে সাবমিট করলে একাধিক সমস্যা দেখা যায়। কয়েক মাস আগেও নতুন মিটারের আবেদনের জন্য ইলেক্ট্রিশিয়ানের ওয়ারিং রিপোর্ট প্রয়োজন হতো। এই ইলেক্ট্রিশিয়ানের ওয়ারিং রির্পোট ছাড়া আবেদন সাবমিট হতো না। এতে গ্রাহককে আবেদনের আগে যোগাযোগ করতে হতো ইলেক্টিশিয়ানের সঙ্গে। ইলেক্টিশিয়ান প্রতিটি আবেদনের জন্য ৩ থেকে ৫ হাজার টাকায় ভোগান্তি ছাড়া মিটার এনে দেবে এমন প্রস্তাব দিতো। গ্রাহক ভোগান্তি থেকে বাঁচতে ইলেক্টিশিয়ানের দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করতে হতো।


তবে বর্তমানে এমন নীতিমালার পরিবর্তন এনেছে পল্লি বিদ্যুৎ। এখন ইলেক্ট্রিশিয়ানের ওয়ারিং রির্পোটের পরিবর্তে গ্রাহককে জমা দিতে হয় গ্রাউন্ডিং রডের মেমো নম্বর। এসব নীতিমালাকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র। অনলাইনে আবেদন করা গেলেও এসব নীতিমালার কারণে গ্রাহক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অপরদিকে সিন্ডিকেট চক্রের মাধ্যমে বিদ্যুতের অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারিরা হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের টাকা।
কয়েক মাস আগে নতুন মিটারের আবেদন জটিলতায় পড়ে সুনামগঞ্জ পল্লি বিদ্যুৎ অফিসের তাহিরপুর সাব জোনাল অফিসে যান উত্তরশ্রীপুর ইউনিয়নের সাহাব উদ্দিন। সেখানেও ইলেক্ট্রিশিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয় তাকে। পরে এক ইলেক্ট্রিশিয়ানকে মোটা অংকের টাকা দিলে কয়েক মাস পর মিটার পান। তবে কয়েকদিন পরেই ঝড়ে মিটার নষ্ট হলে বিদ্যুৎ অফিসকে জানালে নষ্ট মিটার জমা নেয় তারা। এর পরে কয়েকবার অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করেও সে মিটারের হদিস পান নি তিনি।


সাহাব উদ্দিন বলেন, আমরা দুই ভাই। একসঙ্গে থাকাকালীন সময়ে মিটার আনা হয়। পৃথক হওয়ার ঘর আলাদা হলেও একমিটার দিয়ে চলছিলাম এতো বছর। সম্প্রতি নতুন মিটার  পেতে অনলাইনে চেষ্টা করি। সেখানে ইলেক্টিশিয়ানের ওয়ারিং রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়। ঘরে অনেক আগেই ওয়ারিং করা, ওয়ারিং রিপোর্ট কোথায় পাবো? এমতাবস্থায় বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করার পর তারা পরামর্শ দেয় ইলেক্টিশিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তাদের কথা মতো এলাকার এক ইলেক্ট্রিশিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা দিই। এর কয়েকমাস পরে মিটার আসে। ১০ থেকে ১২ দিন পরেই ঝড়ে গাছ পড়ে মিটার নষ্ট হয়ে যায়। বিদ্যুৎ অফিসকে জানালে তারা মিটার নিয়ে যায়। যেহেতু বিলের কাগজ পাইনি তাই বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করি মিটার দেবার জন্য। একবার অফিসে গিয়েও চেষ্টা করি। তারা বলে মিটার অফিসে জমা হয়নি। 
তিনি বলেন, অনেক ভোগান্তির পরে ৫ জুলাই মিটার পুন:সংযোগ করে দিয়েছে পল্লি বিদ্যুৎ অফিস।


একই গ্রামের বাসিন্দা মো. আলীনুর বললেন, বিদ্যুতের সমস্যা হলে টাকা ছাড়া কাজ হয় না। দুই থেকে তিন হাজার টাকা, যার কাছ থেকে যতো নিতে পারে। পরে কাজ হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের ২০২৪ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আবাসিক এলাকায় নতুন সংযোগের জন্য এক ফেজে আবেদন ফিস ১২০, তিন ফেজে ৩৬০ টাকা। ২ কিলোওয়াট পর্যন্ত জামানত ফিস ৪৮০ টাকা। ২ কিলোওয়াটের বেশি হলে ৭২০ টাকা জামানত ফিস দিতে হবে। তবে এসব সিন্ডিকেটের কাছে প্রজ্ঞাপনের কোন বালাই নেই। তাদের কাছে অসহায় সাধারণ মানুষ। কয়েকগুণ বেশি টাকা না দিলে ভোগান্তির শেষ থাকে না।
অভিযোগের কথা অস্বীকার করলেন- সুনামগঞ্জ পল্লি বিদ্যুৎ অফিসের তাহিরপুর সাব জোনাল অফিসের এজিএম মো. আলাউর হক সরকার। তার অফিসের কেউ এমন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নয়, তবুও অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানালেন তিনি।


সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলামের নতুন মিটারের সংযোগ আনতে খরচ হয়েছে প্রায় নয় হাজার টাকা। এরপরেও অফিসের সিন্ডিকেট চক্রের কোটকৌশলের কারণে মিটার পান নি তিনি। অফিসের জেনারেল ম্যানাজারের স্মরনাপন্ন হলে র্দুব্যবহারের শিকার হতে হয় তাকে।
সাইফুল ইসলাম বললেন, সুনামগঞ্জ পল্লি বিদ্যুৎ অফিসে যেকোনো প্রয়োজনে কথা বলতেই টাকা লাগে। আমি সাধারণ গ্রাহক হিসেবে সেবা নিতে গিয়ে কোনো মূল্যায়ন পাইনি। নতুন মিটারের জন্য নয় থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ করেছি। পরে তারা পুরাতন একটি মিটার লাগিয়ে দিতে চেয়েছে। আমি বলেছি, আমাকে নতুন মিটার দিতে হবে। কয়েকদিন পরে শুনলাম আমার আবেদন বাতিল হয়েছে। অভিযোগ নিয়ে জিএম স্যারের রুমে গেছি। যে টাকা নিয়েছে তাকেও দেখিয়ে দিয়েছি। কোনো লাভ হয় নি।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক এক ইলেক্ট্রিশিয়ান বলেন, গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেবার বিদ্যুৎ অফিসের নির্ধারিত কিছু লোক আছে। যারা সরাসরি অফিসের কেউ নয়। তাদের কাছে টাকা দিতে হয়। পরে গ্রাহক তার কাঙ্খিত সেবা পায়।


এবিষয়ে সুনামগঞ্জ পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানাজার মিলন কুমার কুন্ডু বললেন, অফিসের সামনে সিটিজেন চার্টারে কোথায় কতো ফি দিতে হবে বিস্তারিত লিখা আছে। গ্রাহকের অতিরিক্ত টাকা দেবার প্রয়োজন নেই। অফিসে আসারও প্রয়োজন নেই। সকল সেবা অনলাইনে পাওয়া যায়। 
তিনি বলেন, পুরো দেশেই সিন্ডিকেট চক্র রয়েছে। গ্রাহক সেখানে গেলে আমার কিছু করার নেই। সিন্ডিকেট ভাঙার ক্ষমতাও আমার নেই। তবে আমার অফিসের কোনো লোকের যদি এর সাথে সম্পৃক্ততা পান, আমাকে জানান, আমি ব্যবস্থা নেবো।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার